কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একসময় জায়গাটি ছিল ময়লা-আবর্জনায় ভরা। শিক্ষার্থীদের চলাচলও ছিল সীমিত। সেখানে একদিন রং-তুলির ছোঁয়া লাগল। তৈরি হলো বসার জায়গা, আঁকা হলো দেয়ালজুড়ে নানা ছবি, স্থাপন করা হলো একটি ডাকবাক্স। নাম দেওয়া হলো ‘চিঠি চত্বর’।
চিঠি লেখার পুরোনো সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন বৃত্ত কুবির উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল এই চত্বর। উদ্দেশ্য ছিল, মুঠোফোনের বার্তা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা হাতে লেখা চিঠির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
শুধু ডাকবাক্স বসিয়েই থেমে থাকেনি উদ্যোগটি। ক্যাম্পাসের ভেতরে চিঠি আদান-প্রদানের জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী দল। প্রেরকের চিঠি যত্ন করে পৌঁছে দেওয়া হতো প্রাপকের হাতে। চিঠি চত্বর উদ্বোধনের আগেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আসতে শুরু চিঠি। আয়োজনটি ঘিরে তৈরি হয়েছিল আলাদা আগ্রহও। কিন্তু কয়েক বছর পর বদলে গিয়েছে সেই চিত্র।
চিঠি দিবসে এসে চিঠি চত্বরের দিকে তাকালে এখন চোখে পড়ে অনেকটাই ভিন্ন দৃশ্য। যে জায়গাটি একসময় শিক্ষার্থীদের আড্ডা, চিঠি লেখা ও সাংস্কৃতিক চর্চার একটি আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠেছিল, সেখানে এখন আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই। অবহেলা আর অযত্নে হারিয়েছে সেই শুরুর জৌলুশ। কোথাও জমেছে ময়লা, কোথাও বিবর্ণ হয়ে গেছে দেয়ালের আঁকা ছবি, নেই সেই ডাকবাক্সও।
যে ভাবনা থেকে কুবির চিঠি চত্বর:
চিঠি চত্বরের ভাবনাটি এসেছিলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিঠি লেখার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার তাগিদ থেকেই। বৃত্ত কুবির উদ্যোগে ক্যাম্পাসের একটি অব্যবহৃত ও অপরিচ্ছন্ন স্থানকে সাজিয়ে সেখানে স্থাপন করা হয় ডাকবাক্স।
তখন সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এই চত্বর শুধু চিঠি আদান-প্রদানের জায়গা নয়; এটি হবে শিক্ষার্থীদের বসার, গল্প করার এবং নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের একটি জায়গা। ক্যাম্পাসের ভেতরে চিঠি পৌঁছে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল আলাদা একটি দল। শিক্ষার্থীদের উৎসাহও কম ছিল না। কেউ বন্ধুদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, কেউ পরিবারের, কেউ আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সমস্যা নিয়ে লিখেছিলেন প্রশাসনের কাছেও।
এখন কোথায় সেই চিঠির ব্যস্ততা?
চিঠি চত্বরের বর্তমান চিত্র অবশ্য শুরুর সময়ের সঙ্গে মেলে না। ডাকবাক্সের সাথে, আগের সেই কৌতূহল কিংবা চিঠি লেখার ব্যস্ততা সবই হারিয়েছে। জায়গাটির বিভিন্ন অংশেও দেখা যায় অযত্নের ছাপ।
একসময় যে স্থানটি শিক্ষার্থীদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছিল, এখন সেটি অনেকের কাছেই কেবল ক্যাম্পাসের আরেকটি জায়গা। নিয়মিত কার্যক্রম না থাকায় চিঠি চত্বরের মূল উদ্দেশ্যও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে আড়ালে। এনিয়ে আক্ষেপ জানান শিক্ষার্থীরাও।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আনিকা ইসলাম সুমাইয়া বলেন, "চিঠি চত্বর মানেই তো আমাদের স্মৃতি আর আড্ডার ঠিকানা, কিন্তু আজ চিঠি দিবসেও এটার বাজে অবস্থা দেখে খুব খারাপ লাগছে। যে জায়গাটা ক্যাম্পাসের প্রাণ হওয়ার কথা, সেটা আজ অবহেলায় পড়ে আছে। আমাদের এই প্রিয় চত্বরটাকে আগের মতো সুন্দর করতে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।"
সিএসই ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সেলিনা পারভীন মিম বলেন, "ক্যাম্পাসে এসে চিঠি চত্বরের কথা শুনে আমি খুব আগ্রহী হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এটি শিক্ষার্থীদের অনুভূতি ও না বলা কথা প্রকাশের একটি সুন্দর স্থান হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখেছি, দীর্ঘদিনের অবহেলায় চিঠি চত্বরটি প্রায় হারিয়ে গেছে। আজ চিঠি দিবসেও জায়গাটি যে চিঠি চত্বর, তা বোঝার উপায় নেই। আমার মনে হয়, যথাযথ পরিচর্যা ও নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমে চিঠি চত্বরকে আবার শিক্ষার্থীদের অনুভূতি প্রকাশের প্রাণবন্ত মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।"
আবার কি ফিরবে কুবিতে চিঠির দিন?
প্রযুক্তির এই সময়ে মুহূর্তেই পৌঁছে যায় বার্তা। তাও হাতে লেখা চিঠির আবেদন আলাদা। কাগজের ভাঁজে লুকিয়ে থাকে অনুভূতি, স্মৃতি আর অপেক্ষার গল্প যেন অন্যরকম অনুভূতি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি চত্বর ছিল সেই অনুভূতিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার এক সুন্দর উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের রং-তুলির ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা এই জায়গাটি একসময় ছিল চিঠি আর আবেগের মিলনস্থল।
মতামত