রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়ছে অরুণাচলে


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
| ফটো কার্ড

চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়ছে অরুণাচলে
চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়ছে অরুণাচলে

চীনের সামরিক তৎপরতা ও অবকাঠামো নির্মাণ ভারত-চীন সীমান্তের বিতর্কিত অরুণাচল প্রদেশ এলাকায় দ্রুত বেড়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট। ঠিক এই সময়েই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লি সফরে গেছেন।

ভান্টর স্যাটেলাইট সংস্থার সরবরাহ করা ছবি বিশ্লেষণ করে দ্য ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, অরুণাচলের আপার সুবনসিরি উপত্যকা সংলগ্ন একাধিক স্থানে নতুন ভবন, পাকা সড়ক ও একাধিক হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। তিব্বতের লুনজে কাউন্টির উত্তরে ঝারি শহরের কাছাকাছি দুটি এলাকায় সবচেয়ে বেশি নির্মাণকাজ দেখা গেছে বলে জানিয়েছে ওপেন সোর্স গোয়েন্দা সংস্থা জেনস। তারা আরও জানায়, দুই দেশের দাবি করা সীমান্তরেখা মিলিয়ে দেখলে এসব স্থাপনার একাংশ বিতর্কিত এলাকার ভেতরেই পড়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঝারি শহরের দক্ষিণে ২০১৯ সালে শুরু হওয়া একটি নির্মাণকাজ এখনও চলছে, যেখানে জমি সমতলীকরণ, প্রকৌশল যন্ত্রপাতি ও কংক্রিট মিশ্রণ প্ল্যান্ট দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এটির সামরিক ব্যবহারও হতে পারে। এছাড়া লুনজের দক্ষিণে দুটি ছোট হেলিপ্যাডের জায়গায় একটি বড় হেলিপ্যাড এবং আরও দক্ষিণে নতুন আরেকটি হেলিপ্যাড তৈরি হয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এর সর্বশেষ ছবিতে অন্তত একটি ভবনের ছাদ নির্মাণ সম্পন্ন দেখা গেছে, যা থেকে বোঝা যায় নির্মাণকাজ পূর্ণ গতিতে এগোচ্ছে।

সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম গেলেমোর একজন বাসিন্দা দ্য ইনডিপেনডেন্টকে জানান, চীনা বাহিনী তাদের পূর্বপুরুষের জমি দখল করে নিচ্ছে এবং কত দূর পর্যন্ত তারা ঢুকে পড়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়, তবে অনেকটা এলাকা তাদের দখলে চলে গেছে।

অল তাগিন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি তাদক পাকবার নেতৃত্বে আটজনের একটি প্রতিনিধিদল গত ১১-১৩ আগস্ট গেলেমো ও তাকসিং এলাকায় সরেজমিন তদন্ত চালায়। পাকবা জানান, চীনা অনুপ্রবেশের বর্তমান গতি "নজিরবিহীন", আর ভারতীয় বাহিনী পিছু হটছে অথচ চীনা বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে। তার দলের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাস থেকে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়েছে এবং গ্রামবাসীদের চিরাচরিত শিকার ও পশুচারণ এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি অভিযোগ করে, যে চীনা সেনাবাহিনী চারণভূমি ও বনভূমিতে সড়ক, সেতু ও সেনাশিবির তৈরি করেছে।

ক্ষমতাসীন বিজেপির জোটসঙ্গী পিপলস পার্টি অব অরুণাচলের একটি পৃথক প্রতিনিধিদলও তাকসিং, গেলেমো ও মাজা এলাকা ঘুরে দেখে। দলের সদস্য ও সাবেক রাজ্য মন্ত্রী কাপা বেংগিয়া জানান, চীনা সেনারা ইতিমধ্যে এগিয়ে এসেছে এবং ভারতীয় টহল দলকে নিজেদের এলাকাতেও যেতে দেওয়া হচ্ছে না।

ভারতীয় সেনাবাহিনী এসব অনুপ্রবেশের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে এগুলোকে "ভুল ও ভিত্তিহীন" বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, সীমান্ত পরিস্থিতির ওপরই দুই দেশের সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও চিয়াকুন জানিয়েছেন, চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি সার্বিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর জানান, সিংহ বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সহায়তা দেওয়া হবে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লির মতে, এটি চীনের পরিচিত "সালামি স্লাইসিং" কৌশলের অংশ — ধীরে ধীরে ছোট ছোট এলাকা দখল করে সংহত করা, একবারে বড় আক্রমণের বদলে। তিনি বলেন, প্রথমে কিছু ইয়াক সীমান্ত পার করে ছেড়ে দিয়ে ভারতীয় বাহিনীর প্রতিক্রিয়া যাচাই করা হয়; মাসের পর মাস বাধা না পেলে একটি ছোট কুঁড়েঘর তৈরি হয়, পরে তা স্থায়ী কাঠামোয় রূপ নেয়, শেষে পুরোদস্তুর সেনাশিবির গড়ে ওঠে। ভারতের নিয়ন্ত্রণরেখা পর্যন্ত নিয়মিত পৌঁছাতে না পারার কারণেই চীন এই সুযোগ পাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকা সংঘর্ষের পর এটিই শি জিনপিংয়ের প্রথম দিল্লি সফর, যে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছিলেন। প্রায় ৪০০ কর্মকর্তার বিশাল প্রতিনিধিদল নিয়ে তিনি দিল্লি পৌঁছান, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধিদল। দুই দেশই সীমান্তে কোনো সক্রিয় উত্তেজনা নেই বলে বিষয়টি খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছে।

বিষয় : ভারত চীন উত্তেজনা

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়ছে অরুণাচলে

প্রকাশের তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

চীনের সামরিক তৎপরতা ও অবকাঠামো নির্মাণ ভারত-চীন সীমান্তের বিতর্কিত অরুণাচল প্রদেশ এলাকায় দ্রুত বেড়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট। ঠিক এই সময়েই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লি সফরে গেছেন।

ভান্টর স্যাটেলাইট সংস্থার সরবরাহ করা ছবি বিশ্লেষণ করে দ্য ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, অরুণাচলের আপার সুবনসিরি উপত্যকা সংলগ্ন একাধিক স্থানে নতুন ভবন, পাকা সড়ক ও একাধিক হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। তিব্বতের লুনজে কাউন্টির উত্তরে ঝারি শহরের কাছাকাছি দুটি এলাকায় সবচেয়ে বেশি নির্মাণকাজ দেখা গেছে বলে জানিয়েছে ওপেন সোর্স গোয়েন্দা সংস্থা জেনস। তারা আরও জানায়, দুই দেশের দাবি করা সীমান্তরেখা মিলিয়ে দেখলে এসব স্থাপনার একাংশ বিতর্কিত এলাকার ভেতরেই পড়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঝারি শহরের দক্ষিণে ২০১৯ সালে শুরু হওয়া একটি নির্মাণকাজ এখনও চলছে, যেখানে জমি সমতলীকরণ, প্রকৌশল যন্ত্রপাতি ও কংক্রিট মিশ্রণ প্ল্যান্ট দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এটির সামরিক ব্যবহারও হতে পারে। এছাড়া লুনজের দক্ষিণে দুটি ছোট হেলিপ্যাডের জায়গায় একটি বড় হেলিপ্যাড এবং আরও দক্ষিণে নতুন আরেকটি হেলিপ্যাড তৈরি হয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এর সর্বশেষ ছবিতে অন্তত একটি ভবনের ছাদ নির্মাণ সম্পন্ন দেখা গেছে, যা থেকে বোঝা যায় নির্মাণকাজ পূর্ণ গতিতে এগোচ্ছে।

সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম গেলেমোর একজন বাসিন্দা দ্য ইনডিপেনডেন্টকে জানান, চীনা বাহিনী তাদের পূর্বপুরুষের জমি দখল করে নিচ্ছে এবং কত দূর পর্যন্ত তারা ঢুকে পড়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়, তবে অনেকটা এলাকা তাদের দখলে চলে গেছে।

অল তাগিন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি তাদক পাকবার নেতৃত্বে আটজনের একটি প্রতিনিধিদল গত ১১-১৩ আগস্ট গেলেমো ও তাকসিং এলাকায় সরেজমিন তদন্ত চালায়। পাকবা জানান, চীনা অনুপ্রবেশের বর্তমান গতি "নজিরবিহীন", আর ভারতীয় বাহিনী পিছু হটছে অথচ চীনা বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে। তার দলের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাস থেকে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়েছে এবং গ্রামবাসীদের চিরাচরিত শিকার ও পশুচারণ এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি অভিযোগ করে, যে চীনা সেনাবাহিনী চারণভূমি ও বনভূমিতে সড়ক, সেতু ও সেনাশিবির তৈরি করেছে।

ক্ষমতাসীন বিজেপির জোটসঙ্গী পিপলস পার্টি অব অরুণাচলের একটি পৃথক প্রতিনিধিদলও তাকসিং, গেলেমো ও মাজা এলাকা ঘুরে দেখে। দলের সদস্য ও সাবেক রাজ্য মন্ত্রী কাপা বেংগিয়া জানান, চীনা সেনারা ইতিমধ্যে এগিয়ে এসেছে এবং ভারতীয় টহল দলকে নিজেদের এলাকাতেও যেতে দেওয়া হচ্ছে না।

ভারতীয় সেনাবাহিনী এসব অনুপ্রবেশের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে এগুলোকে "ভুল ও ভিত্তিহীন" বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, সীমান্ত পরিস্থিতির ওপরই দুই দেশের সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও চিয়াকুন জানিয়েছেন, চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি সার্বিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর জানান, সিংহ বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সহায়তা দেওয়া হবে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লির মতে, এটি চীনের পরিচিত "সালামি স্লাইসিং" কৌশলের অংশ — ধীরে ধীরে ছোট ছোট এলাকা দখল করে সংহত করা, একবারে বড় আক্রমণের বদলে। তিনি বলেন, প্রথমে কিছু ইয়াক সীমান্ত পার করে ছেড়ে দিয়ে ভারতীয় বাহিনীর প্রতিক্রিয়া যাচাই করা হয়; মাসের পর মাস বাধা না পেলে একটি ছোট কুঁড়েঘর তৈরি হয়, পরে তা স্থায়ী কাঠামোয় রূপ নেয়, শেষে পুরোদস্তুর সেনাশিবির গড়ে ওঠে। ভারতের নিয়ন্ত্রণরেখা পর্যন্ত নিয়মিত পৌঁছাতে না পারার কারণেই চীন এই সুযোগ পাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকা সংঘর্ষের পর এটিই শি জিনপিংয়ের প্রথম দিল্লি সফর, যে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছিলেন। প্রায় ৪০০ কর্মকর্তার বিশাল প্রতিনিধিদল নিয়ে তিনি দিল্লি পৌঁছান, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধিদল। দুই দেশই সীমান্তে কোনো সক্রিয় উত্তেজনা নেই বলে বিষয়টি খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছে।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream