শ্রমিক নেতা শেখ বাদশার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ ও তার মুক্তির দাবিতে দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার সামনে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শ্রমিক, বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও পুলিশের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগষ্ট) দুপুরে সংঘর্ষের সময় দুইটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং আরও কয়েকটি বাস ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়েছে । এ ঘটনায় অন্তত ১০ থেকে ১৪ জন আহত হয়েছেন বলে শ্রমিক নেতারা দাবি করেছেন। আহতদের কয়েকজনকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সংঘর্ষের সময় সাংবাদিকদের মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। মাছরাঙা টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসন রুবেল হোসেনের অভিযোগ, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কোতোয়ালি থানার পাশে রাখা তার মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়।
পরে কঠোর পুলিশি পাহারায় শেখ বাদশাকে আদালতে পাঠানো হয়। পুলিশ শেখ বাদশা কে আদালতে পৌঁছে দেওয়ার পর শ্রমিকদের রাস্তার অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। পরে বিকাল সাড়ে চারটার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর দিনাজপুরের সাথে যান চলাচল অন্যান্য জেলার স্বাভাবিক হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাস-মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা শেখ বাদশার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সাধারণ শ্রমিকেরা কোতোয়ালি থানার প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন। তারা শেখ বাদশার মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শ্রমিকদের কথা-কাটাকাটি ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। একপর্যায়ে শ্রমিক, বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও পুলিশের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের মধ্যে কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। পরে দুইটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। আরও কয়েকটি বাস ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দিনাজপুর পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব ফরহাদ প্লাবনের নেতৃত্বে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দেন। পরে শ্রমিকদের সাথে তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিক মারাত্মকভাবে আহত হয় এবং বিএনপির অঙ্গ সংগঠনেরও কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছে।
দুপুর দুইটার দিকে পুনরায় আবার দ্বিতীয়বারের মতো সংঘর্ষের সময় সংবাদ সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক বাধার মুখে পড়েন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে উপস্থিত সংবাদকর্মীরা জানান।
এদিকে দিনাজপুর মোটর বাস শ্রমিক ইউনিয়নের একাংশের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ও বিএনপি সমর্থিত হিসেবে পরিচিত হাফিজুর রহমান হিরো শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টা করলে শেখ বাদশার অনুসারীরা তাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে তার মাথা ফেটে যায়। পরে তাকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শ্রমিক নেতা জাকির হোসেন বলেন, দিনাজপুর বাস-মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী শেখ বাদশাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসন্ন ইউনিয়ন নির্বাচনে তাকে প্রার্থী হতে না দেওয়ার উদ্দেশ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
আরেক শ্রমিক নেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, তারা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। হঠাৎ হামলা ও সংঘর্ষের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছেন।
সংঘর্ষের পর শ্রমিকেরা কোতোয়ালি থানার আশপাশের সড়কে বাস ও ট্রাক আড়াআড়ি রেখে অবরোধ সৃষ্টি করেন। এতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থানার আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এর আগে শেখ বাদশার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বুধবার রাত থেকেই দিনাজপুর-ঢাকা রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেন শ্রমিকেরা। জেলার বিভিন্ন প্রবেশপথে দূরপাল্লার বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন সড়কে রেখে অবরোধ সৃষ্টি করা হয়। এতে দিনাজপুরের সঙ্গে ঢাকার সড়ক যোগাযোগও বিঘ্নিত হয়।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্দিষ্ট মামলার ভিত্তিতেই শেখ বাদশাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর শ্রমিকদের একটি অংশ শহরের বিভিন্ন স্থানে বাস রেখে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং কোতোয়ালি থানার সামনে অবস্থান নিয়ে পুলিশের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনায় শেখ বাদশার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এসব মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মতামত