সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত রেলপথটি ছিল দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহাসিক যোগাযোগব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৫৪ সালে সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হয়। এই রেলপথ দিয়ে ছাতক থেকে চুনাপাথরসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হতো। পাশাপাশি সুনামগঞ্জের মানুষও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ পেতেন।
তবে ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় রেলপথটির বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে প্রায় চার বছর ধরে এই পথে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের রেল চলাচল। দীর্ঘদিন রেল চলাচল বন্ধ থাকায় রেলপথের মূল্যবান স্লিপার ও লোহার পাত চুরি হয়েছে। এ অবস্থায় রেলপথটি পুনর্বাসনে ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নেওয়া হলেও নির্ধারিত মেয়াদে কাজ হয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়,‘২০২২ সালের বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের (মিটারগেজ ট্র্যাক) পুনর্বাসন প্রকল্প’ নামে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। জিওবি ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ সংস্কারের জন্য ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের (এমএএইচএল) সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে। ২১৭ কোটি টাকার প্রকল্প হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয় ১৯৯ কোটি টাকায়।
প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত। নির্ধারিত সময় শেষ হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ বলে জানিয়েছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক। তবে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দাবি করেছেন,এ পর্যন্ত প্রকল্পের ২৫ শতাংশ কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় থাকা ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ সংস্কার,মাটি ভরাট,কালভার্ট ও সেতু মেরামত,নতুন স্লিপার স্থাপন এবং নতুন রেললাইন বসানোর কাজ রয়েছে। ইতোমধ্যে ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে। তবে ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ,হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর, ছৈলা-আফজলাবাদ, সৎপুর এবং সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংস্কারকাজ বন্ধ রয়েছে। নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনও বাকি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ,প্রকল্প শুরুর পর থেকেই কাজ চলছে ধীরগতিতে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথের উচ্চতা নির্ধারণ ও সমন্বয় নিয়ে জটিলতার কারণে কিছু এলাকায় কাজ পিছিয়েছে। সড়কের মাটি ভরাটের পর রেলপথের উচ্চতা যথাযথভাবে নির্ধারণ না হওয়ায়ও কাজ ব্যাহত হয়েছে বলে জানান তাঁরা।
গোবিন্দগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা সুজন তালুকদার বলেন,বন্যায় রেলপথের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সংস্কারকাজ শুরু হলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। কিছুদিন বিভিন্ন স্থানে কাজ চললেও পরে হঠাৎ তা বন্ধ হয়ে যায়। কাজ কেন বন্ধ,সে বিষয়ে স্থানীয়দের কাছে কোনো তথ্য নেই। এতে রেলপথটি কবে চালু হবে,তা নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।
ছাতক প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও আলমপুর গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন রনি বলেন,রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ছাতকের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই রেলপথ যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। সময়মতো সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
ছাতক পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী আবুল হাসান বলেন,ছাতকের সিমেন্ট,চুনাপাথর,বালি ও পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে রেলপথটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কম খরচে নিরাপদে সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতও করা যেত। রেলপথ বন্ধ থাকায় এখন সড়কপথে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে। তাঁর দাবি, সংস্কারকাজ শুরু হলেও মাটি ভরাট ছাড়া তেমন কোনো কাজ তাঁদের নজরে আসছে না।
সিলেট-ছাতক রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সিলেট রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ বলেন,৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটি ভরাট ও কালভার্টের কাজও চলছে। প্রকল্পের প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ হয়েছে এবং ৭৫ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদ ২৩ আগস্ট শেষ হয়েছে। ২১৭ কোটি টাকার প্রকল্প হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১৯৯ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ৩০ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো ও পরবর্তী বাস্তবায়নের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের প্রকল্প এলাকার প্রকৌশলী সজিবুর রহমান বলেন,প্রকল্পের সব কাজ চলমান রয়েছে। ৫১ হাজার স্লিপার তৈরির কাজ চলছে। মাটির কাজও অব্যাহত আছে। আগামী মাসে ১০টি কালভার্ট নির্মাণের কাজ শেষ হবে। ছাতকের তিনটি রেলস্টেশন নির্মাণসহ অন্যান্য কাজও চলছে।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন,সুনামগঞ্জ অঞ্চলের আবহাওয়া ও ঝড়বৃষ্টির কারণে বছরের প্রায় অর্ধেক সময় কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা কঠিন হয়েছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন,বৃষ্টি ও বর্ষার কারণে সময়মতো মাটির কাজ করা যায়নি। দেড় বছরের প্রকল্প মেয়াদে দুটি বর্ষাকাল পড়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানি করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের কাজ শেষ করতে আরও এক বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। তাঁর আশা,সময় বাড়ানো হলে আগামী এক বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই রেলপথটি পুনর্বাসনের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বিশেষ করে ছাতকের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই রেল যোগাযোগ কবে নাগাদ চালু হবে,তা এখনো অনিশ্চিত। ফলে দ্রুত প্রকল্পের কাজ শেষ করে সিলেট-ছাতক রেলপথে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মতামত