১৯৪১ সালের জনগণনা অনুযায়ী অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫৪.৭ শতাংশ। অর্থাৎ গোটা বাংলা ছিল মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ। কিন্তু ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের সময় শুধু ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়নি। র্যাডক্লিফ কমিশনকে জনসংখ্যার পাশাপাশি প্রশাসনিক, ভৌগোলিক, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়েছিল।
এই কারণেই দেশভাগের মানচিত্রে তৈরি হয় বেশ কিছু আপাত-বৈপরীত্য।
মুর্শিদাবাদ ছিল মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা। তবুও সেটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত হয়। মালদহের ক্ষেত্রেও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রশ্ন ছিল। দিনাজপুর ভাগ হয়ে একাংশ ভারত ও অন্যাংশ পূর্ববঙ্গে যায়। নদিয়া ও যশোরের ক্ষেত্রেও সীমান্ত পুনর্নির্ধারণের ফলে জেলার অংশবিশেষ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়।
অন্যদিকে খুলনা ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সেটি পূর্ববঙ্গের অংশ হয়। আরও বিতর্কিত উদাহরণ পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল খুবই কম, কিন্তু অঞ্চলটি পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
তাহলে কি ১৯৪৭ সালের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল?
এক কথায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন।
কারণ, যদি শুধু ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে একমাত্র মানদণ্ড ধরা হতো, তাহলে সীমান্ত আরও অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু সেক্ষেত্রেও নতুন সমস্যা তৈরি হতো। একটি জেলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তার কোনো মহকুমায় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে পারত; আবার একই জেলার অন্য অংশে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি হতে পারত। নদী, রেলপথ, বন্দর, বাজার ও প্রশাসনিক কেন্দ্রের অবস্থানও তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কলকাতা ছিল অবিভক্ত বাংলার প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র। পূর্ববঙ্গের পাট উৎপাদন, নদীপথ ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের সঙ্গে কলকাতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ফলে শুধু ধর্মীয় জনসংখ্যার হিসাব দিয়ে সীমানা টানা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন ছিল।
তবে র্যাডক্লিফ কমিশনের সিদ্ধান্ত যে বিতর্কমুক্ত ছিল না, সেটিও সত্য। সীমান্ত নির্ধারণের সময় অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যা, প্রশাসনিক কাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও ভূগোল বিবেচনা করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত যে সীমারেখা তৈরি হলো, তা লাখ লাখ মানুষের জীবনকে রাতারাতি বদলে দেয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই—দেশভাগের সময় কি জনগণের মতামত নেওয়ার আরও কার্যকর ব্যবস্থা করা যেত? স্থানীয় পর্যায়ে গণভোট বা মহকুমাভিত্তিক জনসংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলে কি সীমান্ত আরও গ্রহণযোগ্য হতো?
সম্ভবত কিছু ক্ষেত্রে হতো, আবার কিছু ক্ষেত্রে নতুন বিরোধও তৈরি হতে পারত।
কারণ দেশভাগের বাস্তবতা ছিল এমন—যে কোনো সীমারেখাই কাউকে না কাউকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করত। একটি সীমান্ত এক সম্প্রদায়ের জন্য ন্যায্য মনে হলেও অন্য সম্প্রদায়ের কাছে তা অন্যায্য হতে পারত।
তাই ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগকে শুধু “কোন জেলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল” এই প্রশ্নে বিচার করা যথেষ্ট নয়। বরং দেখতে হবে—তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনিক কাঠামো, অর্থনীতি, যোগাযোগ ও মানুষের নিরাপত্তা—সবকিছুর সমন্বয়ে সীমান্তটি কতটা কার্যকর ছিল।
আজকের দৃষ্টিতে ১৯৪৭ সালের মানচিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। ইতিহাসকে প্রশ্ন করা ইতিহাসকে অস্বীকার করা নয়। বরং প্রশ্নগুলোই আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কীভাবে কয়েকটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কোটি মানুষের জীবন, পরিচয় ও ভবিষ্যৎকে বদলে দিয়েছিল।
দেশভাগের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটিই—মানচিত্রের একটি দাগ কখনো শুধু একটি দাগ নয়; তার ওপারে থাকে মানুষের ঘর, স্মৃতি, পরিচয় এবং প্রজন্মের ইতিহাস।
মতামত