সিলেটে থামছে না হামের প্রকোপ। প্রতিদিনই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে বিপুলসংখ্যক শিশু। বাড়ছে মৃত্যুও। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত ১২৬ জন ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে জৈন্তাপুরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর বিভাগে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৬ জনে।
শিশু মৃত্যুর এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেও হাম নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম অনেকটা টিকা দেওয়া ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের খুঁজে বের করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগকে অনেকটা ‘ঘণ্টাকর্ণের’ ভূমিকায় দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত ৩২০ জন চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৩০ জন এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১৮ জন ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতাল দুটিতে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এক শয্যায় একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৪৯ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬১ জন, নর্থ ইস্ট মেডিকেল হাসপাতালে দুজন, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজন, জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন এবং মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নয়জন সন্দেহজনক হাম রোগী ভর্তি হয়েছে।
বর্তমানে রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩, নর্থ ইস্ট মেডিকেল হাসপাতালে পাঁচ, বিয়ানীবাজারে চার, জকিগঞ্জে একজন, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ২০, জামালগঞ্জে দুই, হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে আট এবং মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ১৯ জন সন্দেহজনক হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামে মারা যাওয়া শিশুটির বাড়ি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায়। সে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল।
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২৫ জন। এর মধ্যে সিলেটে ৩৫৭, হবিগঞ্জে ১৫৩, মৌলভীবাজারে ১৫৮ এবং সুনামগঞ্জে ৩৫৭ জন আক্রান্ত হয়েছে।
মৃত্যুর চিত্রও ভয়াবহ। এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে সিলেটে ৫৩, হবিগঞ্জে ১৫, মৌলভীবাজারে ১২ এবং সুনামগঞ্জে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে সিলেটে চার, হবিগঞ্জে চার, মৌলভীবাজারে একজন এবং সুনামগঞ্জে একজন। সব মিলিয়ে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১৪৬ জন।
এর আগের দিন মঙ্গলবার (২৫ আগষ্ট) পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৪৫। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে সিলেটে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। মে মাস থেকে সংক্রমণ বাড়তে থাকে এবং জুনে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। অথচ ব্যাপক টিকা ক্যাম্পেইনের পরও সংক্রমণ কমেনি।
হাম মোকাবিলায় সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের ১০০ শয্যা এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৮ শয্যার ৩২ নম্বর ওয়ার্ড ডেডিকেটেড করা হয়েছে। কিন্তু রোগীর চাপ নির্ধারিত সক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে গত ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত টিকা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে স্বাস্থ্য বিভাগ। তখন প্রায় শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি পরিদর্শনে বেরিয়ে আসে ভিন্ন চিত্র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,প্রত্যন্ত অঞ্চলের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ শিশু এখনও টিকার আওতার বাইরে রয়েছে।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন,দেশের অন্যান্য এলাকায় হামের প্রকোপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও সিলেটে এখনো সংক্রমণ চলছে। প্রতিদিনই শিশু মারা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়ার পাশাপাশি টিকার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করছেন।
তিনি জানান,প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতি ২০ জন শিশুর মধ্যে চার থেকে পাঁচজনকে টিকার আওতার বাইরে পাচ্ছেন। শিশুদের নয় ও ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু নয় মাস বয়সের আগেই অনেক শিশু আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে।
সিভিল সার্জন বলেন,নয় মাসের আগে শিশুদের মায়ের কাছ থেকে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পাওয়ার কথা। কিন্তু তারা কেন সেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পাচ্ছে না,তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে,দীর্ঘদিন ধরে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও শুধু টিকা ক্যাম্পেইন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা,নিয়মিত নজরদারি জোরদার,দ্রুত আক্রান্তদের শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি মায়েদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতিকে অবহেলা করে স্বাস্থ্য বিভাগ যদি ‘ঘণ্টাকর্ণের’ মতো বসে থাকে,তাহলে সিলেটে হাম আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
মতামত