শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপদাহ ও দাবানল: চরম আবহাওয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন


আনোয়ার মুরাদ
আনোয়ার মুরাদ প্রকাশক
| ফটো কার্ড

ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপদাহ ও দাবানল: চরম আবহাওয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন


ইউরোপ, ২১ আগস্ট ২০২৬: ইউরোপজুড়ে চলতি গ্রীষ্মে একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহ আঘাত হানছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, গ্রিস, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রার পাশাপাশি খরা ও দাবানল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নাসার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে ইউরোপে ধারাবাহিক তাপপ্রবাহ রেকর্ড ভাঙছে এবং এর প্রভাব মানুষের জীবন ও পরিবেশে পড়ছে।

১৩৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ তীব্র গরমের মুখে

আগস্টের মাঝামাঝি ইউরোপের নতুন তাপপ্রবাহে ১৩৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে তাপমাত্রার মুখোমুখি হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে প্রায় ৩৪ কোটি মানুষের এলাকায় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ফ্রান্সের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠেছে; প্যারিসেও ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়।

স্পেন ও ইতালির বিস্তীর্ণ এলাকাতেও তীব্র গরম অব্যাহত ছিল। ইতালিতে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এবং স্পেনে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তাপপ্রবাহের প্রভাবে পড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

যুক্তরাজ্যেও রেকর্ড তাপমাত্রা

তাপপ্রবাহের প্রভাব থেকে বাদ যায়নি যুক্তরাজ্য। আগস্টের মাঝামাঝি দেশটির ৪০টি স্থানে তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি উঠেছিল। লন্ডনের কিউ গার্ডেনে ১৩ আগস্ট ৩৮.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা ২০২৬ সালের তখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এবং দেশটির ইতিহাসে অন্যতম উষ্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়।

মেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তীব্র গরমের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবহন এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে চাপ বাড়ছে।

দাবানলে বিপর্যস্ত দক্ষিণ ইউরোপ

তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও গ্রিসে আগুন নিয়ন্ত্রণে দমকল বাহিনীকে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হচ্ছে।

গ্রিসে উত্তরাঞ্চলের দাবানলের কারণে পর্যটকদের নৌপথে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকাতেও দাবানলে বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জার্মানির নর্থ রাইন-ভেস্টফালিয়া রাজ্যে আগস্টে একটি বড় দাবানল ৩০০ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়িয়ে দেয় এবং আগুনের কাছাকাছি থাকা একটি গ্রামের ২ হাজারের বেশি বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় ১,৫০০ জরুরি কর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন।

নদীর পানি কমে বিপাকে অর্থনীতি

তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু মানুষের স্বাস্থ্য ও বনাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘস্থায়ী খরা ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানির স্তরও কমিয়ে দিয়েছে।

জার্মানির রাইন নদীতে পানির গভীরতা কিছু এলাকায় এতটাই কমে গেছে যে পণ্যবাহী জাহাজগুলো স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পণ্য বহন করতে পারছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং শিল্প খাতের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।

ডানিউব নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরিতেও নৌপরিবহন এবং শিল্প কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিয়েছে। হাঙ্গেরির একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের শীতলীকরণ ব্যবস্থার ওপরও নদীর নিম্ন পানিস্তরের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা থাকলে বয়স্ক মানুষ, শিশু, বাইরে কাজ করা শ্রমিক এবং হৃদ্‌রোগ বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এবারের ইউরোপীয় তাপপ্রবাহে মৃত্যুহার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জুনের এক সপ্তাহের চরম তাপপ্রবাহের সময় ইউরোপে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৬ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও জার্মানির মতো তুলনামূলকভাবে কম গরমের সঙ্গে অভ্যস্ত দেশগুলোও এতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) বলছে, চরম তাপপ্রবাহ ক্রমেই বেশি ঘন ঘন, বেশি তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। ইউরোপে ২০২৬ সালের ধারাবাহিক তাপপ্রবাহের সঙ্গে খরা, দাবানল এবং অস্বাভাবিক উষ্ণ ভূমি ও সমুদ্রের সম্পর্ক রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপ দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। ফলে আগে যে ধরনের তাপমাত্রা বিরল ছিল, তা এখন আরও ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী গরমের কারণে কৃষি উৎপাদন, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ, পরিবহন, পর্যটন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।

ব্যবসা ও পর্যটনেও প্রভাব

তীব্র গরমে ইউরোপের পর্যটননির্ভর অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ছে। ইতালির কিছু শহরে মানুষ দিনের বেলা বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দেওয়ায় রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আয় কমেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতালির পাদুয়ায় জরিপ করা ৮০ শতাংশের বেশি ব্যবসা সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের সময় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি কমার কথা জানিয়েছে।

সামনে আরও কঠিন সময়ের আশঙ্কা

ইউরোপে এবারের গ্রীষ্মে একাধিক তাপপ্রবাহ ইতোমধ্যে আঘাত হেনেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে। শুধু দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নয়, রাতের তাপমাত্রাও দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকায় মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ কমছে।

ইতালির সিসিলির ফ্লোরিডিয়া শহর, যেখানে ২০২১ সালে ইউরোপের সর্বোচ্চ ৪৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল, সেখানকার বাসিন্দারাও এখন দীর্ঘস্থায়ী গরমকে দৈনন্দিন জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। কৃষি ও মৌমাছি পালনের মতো স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়ছে।

ইউরোপের চলমান তাপদাহ তাই শুধু একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়; এটি স্বাস্থ্য, পরিবেশ, কৃষি, অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ওপর একই সঙ্গে চাপ সৃষ্টি করা একটি বড় আঞ্চলিক সংকট। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের চরম তাপ মোকাবিলায় নগর পরিকল্পনা, পানি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, দাবানল প্রতিরোধ এবং জলবায়ু অভিযোজন নীতিতে আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

রেফারেন্স: NASA Earth Observatory, Euronews/AFP, Reuters, WMO, AP ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদ ও সরকারি আবহাওয়া-সংক্রান্ত সূত্র।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬


ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপদাহ ও দাবানল: চরম আবহাওয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন

প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬

featured Image


ইউরোপ, ২১ আগস্ট ২০২৬: ইউরোপজুড়ে চলতি গ্রীষ্মে একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহ আঘাত হানছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, গ্রিস, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রার পাশাপাশি খরা ও দাবানল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নাসার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে ইউরোপে ধারাবাহিক তাপপ্রবাহ রেকর্ড ভাঙছে এবং এর প্রভাব মানুষের জীবন ও পরিবেশে পড়ছে।

১৩৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ তীব্র গরমের মুখে

আগস্টের মাঝামাঝি ইউরোপের নতুন তাপপ্রবাহে ১৩৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে তাপমাত্রার মুখোমুখি হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে প্রায় ৩৪ কোটি মানুষের এলাকায় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ফ্রান্সের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠেছে; প্যারিসেও ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়।

স্পেন ও ইতালির বিস্তীর্ণ এলাকাতেও তীব্র গরম অব্যাহত ছিল। ইতালিতে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এবং স্পেনে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তাপপ্রবাহের প্রভাবে পড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

যুক্তরাজ্যেও রেকর্ড তাপমাত্রা

তাপপ্রবাহের প্রভাব থেকে বাদ যায়নি যুক্তরাজ্য। আগস্টের মাঝামাঝি দেশটির ৪০টি স্থানে তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি উঠেছিল। লন্ডনের কিউ গার্ডেনে ১৩ আগস্ট ৩৮.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা ২০২৬ সালের তখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এবং দেশটির ইতিহাসে অন্যতম উষ্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়।

মেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তীব্র গরমের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবহন এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে চাপ বাড়ছে।

দাবানলে বিপর্যস্ত দক্ষিণ ইউরোপ

তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও গ্রিসে আগুন নিয়ন্ত্রণে দমকল বাহিনীকে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হচ্ছে।

গ্রিসে উত্তরাঞ্চলের দাবানলের কারণে পর্যটকদের নৌপথে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকাতেও দাবানলে বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জার্মানির নর্থ রাইন-ভেস্টফালিয়া রাজ্যে আগস্টে একটি বড় দাবানল ৩০০ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়িয়ে দেয় এবং আগুনের কাছাকাছি থাকা একটি গ্রামের ২ হাজারের বেশি বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় ১,৫০০ জরুরি কর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন।

নদীর পানি কমে বিপাকে অর্থনীতি

তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু মানুষের স্বাস্থ্য ও বনাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘস্থায়ী খরা ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানির স্তরও কমিয়ে দিয়েছে।

জার্মানির রাইন নদীতে পানির গভীরতা কিছু এলাকায় এতটাই কমে গেছে যে পণ্যবাহী জাহাজগুলো স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পণ্য বহন করতে পারছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং শিল্প খাতের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।

ডানিউব নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরিতেও নৌপরিবহন এবং শিল্প কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিয়েছে। হাঙ্গেরির একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের শীতলীকরণ ব্যবস্থার ওপরও নদীর নিম্ন পানিস্তরের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা থাকলে বয়স্ক মানুষ, শিশু, বাইরে কাজ করা শ্রমিক এবং হৃদ্‌রোগ বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এবারের ইউরোপীয় তাপপ্রবাহে মৃত্যুহার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জুনের এক সপ্তাহের চরম তাপপ্রবাহের সময় ইউরোপে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৬ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও জার্মানির মতো তুলনামূলকভাবে কম গরমের সঙ্গে অভ্যস্ত দেশগুলোও এতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) বলছে, চরম তাপপ্রবাহ ক্রমেই বেশি ঘন ঘন, বেশি তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। ইউরোপে ২০২৬ সালের ধারাবাহিক তাপপ্রবাহের সঙ্গে খরা, দাবানল এবং অস্বাভাবিক উষ্ণ ভূমি ও সমুদ্রের সম্পর্ক রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপ দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। ফলে আগে যে ধরনের তাপমাত্রা বিরল ছিল, তা এখন আরও ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী গরমের কারণে কৃষি উৎপাদন, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ, পরিবহন, পর্যটন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।

ব্যবসা ও পর্যটনেও প্রভাব

তীব্র গরমে ইউরোপের পর্যটননির্ভর অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ছে। ইতালির কিছু শহরে মানুষ দিনের বেলা বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দেওয়ায় রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আয় কমেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতালির পাদুয়ায় জরিপ করা ৮০ শতাংশের বেশি ব্যবসা সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের সময় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি কমার কথা জানিয়েছে।

সামনে আরও কঠিন সময়ের আশঙ্কা

ইউরোপে এবারের গ্রীষ্মে একাধিক তাপপ্রবাহ ইতোমধ্যে আঘাত হেনেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে। শুধু দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নয়, রাতের তাপমাত্রাও দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকায় মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ কমছে।

ইতালির সিসিলির ফ্লোরিডিয়া শহর, যেখানে ২০২১ সালে ইউরোপের সর্বোচ্চ ৪৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল, সেখানকার বাসিন্দারাও এখন দীর্ঘস্থায়ী গরমকে দৈনন্দিন জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। কৃষি ও মৌমাছি পালনের মতো স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়ছে।

ইউরোপের চলমান তাপদাহ তাই শুধু একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়; এটি স্বাস্থ্য, পরিবেশ, কৃষি, অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ওপর একই সঙ্গে চাপ সৃষ্টি করা একটি বড় আঞ্চলিক সংকট। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের চরম তাপ মোকাবিলায় নগর পরিকল্পনা, পানি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, দাবানল প্রতিরোধ এবং জলবায়ু অভিযোজন নীতিতে আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

রেফারেন্স: NASA Earth Observatory, Euronews/AFP, Reuters, WMO, AP ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদ ও সরকারি আবহাওয়া-সংক্রান্ত সূত্র।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream