বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর খাগড়াছড়ি জেলা শাখার আমির সৈয়দ মো. আবদুল মোমেন। ১৯৯৮ সাল থেকে টানা প্রায় ২৮ বছর ধরে তিনি জেলা জামায়াতের আমিরের পদে আছেন। সারা দেশে জেলা ও মহানগর মিলে জামায়াতের ৭৯টি সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩টি ইউনিটের খোঁজ নিয়েছে প্রথম আলো। খাগড়াছড়ির মতো অনেক সাংগঠনিক ইউনিটে বছরের পর বছর শীর্ষ নেতা হিসেবে একই ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করছেন।
জামায়াত নেতা ও প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা তথ্যে দেখা গেছে, একনাগাড়ে ১০ বছর বা এরও বেশি সময় ধরে আমির পদে কোনো পরিবর্তন নেই, এমন ইউনিটের সংখ্যা ১৯। ৫ থেকে ৯ বছর পর্যন্ত আমির পদে আছেন আরও ১১টি ইউনিটে। একটি জেলায় বিরতি দিয়ে ২২ বছর আমির পদ সামলাচ্ছেন এক নেতা।
১৪ অক্টোবর কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর কুমিল্লা মহানগর কার্যালয় চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানের ব্যক্তিগত গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির হিসেবে কাজী দ্বীন মোহাম্মদ ২৮ বছর দায়িত্ব পালন করেন। কমিটি নিয়ে সংঘর্ষের পর ১৬ অক্টোবর তাঁকে আমির পদ থেকে অব্যাহতি এবং কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লার এই ঘটনাকে জামায়াতের সাংগঠনিক রাজনীতিতে চাপা অসন্তোষের একটা বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন দলের কেউ কেউ। এ ঘটনার পর জামায়াতের অপর একটি জেলার সাবেক এক প্রচার সম্পাদক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কু’ এর “লু” হাওয়া কত দূর ছড়ায় আল্লাহ ভালো জানেন। অধস্তনের অসন্তোষ কেন্দ্রে আমলে নেওয়া জরুরি।’ জামায়াতের ভেতর কেউ কেউ এমন প্রশ্নও তুলেছেন যে দল কি নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারছে না? নাকি পুরোনো নেতাদের একটি অংশ পদ আঁকড়ে থাকছেন।
জামায়াতের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, একই ব্যক্তির দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষ পদে থাকা নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে আলোচনা আছে।
কুমিল্লার সংঘর্ষের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল।
জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমিটি ও আমিরের পদ তিন বছর মেয়াদি। আর জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ দুই বছর। দুই ক্ষেত্রেই রুকনদের গোপন ভোটে আমির নির্বাচিত হন। সে কারণে জামায়াত তাদের নেতা নির্বাচনপদ্ধতিকে ‘সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক’ বলে অভিহিত করে। তবে ভোটারদের সংখ্যা, প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে না দলটি। ফলে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির নেতৃত্বে থাকার কারণ ও নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রতিযোগিতা কতটা কার্যকর, তা স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশের মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোতে শীর্ষ পদে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির দায়িত্ব পালন করা নতুন কিছু নয়। তবে অন্য দলগুলোতে শীর্ষ পদের বাইরে অন্য পদে পরিবর্তন আসে। কিন্তু জামায়াতে দ্বিতীয় শীর্ষ পদেও একই ব্যক্তির দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের নজির দেখা যায়।
জামায়াতের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় কমিটি এবং জেলা ও মহানগর কমিটির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যাঁরা সার্বক্ষণিক দলকে সময় দেন, তাঁদের খরচও দল চালায়। ক্ষেত্রবিশেষে গাড়িসহ প্রয়োজনীয় অন্য সুবিধা দেওয়া হয়। তাঁরা জামায়াতের মধ্যে ‘ফুল টাইমার’ (বেতনভুক্ত) হিসেবে পরিচিত। ফুল টাইমারদের মধ্যে কাউকে কাউকে দলের অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে বসানো হয়। সেখান থেকে বেতন পেয়ে থাকেন তাঁরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের একাধিক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ফুল টাইমারদের অনেকের মধ্যে পদ আঁকড়ে থাকার একটা প্রবণতা দেখা যায়। আবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে জেলা ও মহানগরের আমিরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এ জন্যও শীর্ষ পদ ধরে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ফলে নতুনদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ সীমিত হচ্ছে।
অবশ্য জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তাঁদের দাবি, যোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও ইসলামি আন্দোলনের প্রতি একনিষ্ঠতার ভিত্তিতেই আমির নির্বাচিত হন। কারও চাওয়া-পাওয়া মুখ্য বিষয় নয়।
জামায়াতের বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক মুয়াযযম হোসাইন হেলাল দলের বিভিন্ন ইউনিটের নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলে দাবি করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রুকনেরা (শপথধারী কর্মী) পছন্দ করে ভোট দিয়ে আমির নির্বাচিত করেন। দল প্রয়োজন মনে করলে কাউকে সরিয়েও দেয়।
জামায়াতের দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরে রুহুল আমীন ভূঁইয়া ২৩ বছর, ঝালকাঠিতে হাফিজুর রহমান ২২ বছর এবং জয়পুরহাটে ফজলুর রহমান সাঈদ ২০ বছর ধরে জেলা আমির পদে আছেন।
রাজবাড়ীর আমির নুরুল ইসলাম ২০০৯ সালে দায়িত্ব পান। এর আগে দুই বছর ভারপ্রাপ্ত আমির এবং তিন বছর জেলা সেক্রেটারি ছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে আমির পদে তিনি আছেন ১৯ বছর ধরে। খুলনা জেলা জামায়াতের আমির এমরান হুসাইন ১৮ বছর ও বরিশালের আবদুল জব্বার ১৭ বছর একই পদে আছেন। বান্দরবানের এস এম আবদুস সালাম আজাদ ও রাঙামাটির আবদুল আলিম জেলা আমির পদে আছেন ১৬ বছর ধরে।
সিরাজগঞ্জে শাহীনুর আলম ১৪ বছর এবং গাজীপুরে জাহাঙ্গীর আলম ১৩ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। বগুড়া জেলা ও মহানগর এবং ময়মনসিংহ জেলা ও মহানগর আমির পদে একই ব্যক্তিরা আছেন ১১ বছর ধরে। টাঙ্গাইল, মেহেরপুর ও পাবনার বর্তমান আমিরদের দায়িত্বকাল ১০ বছর চলছে।
কুড়িগ্রামের মো. আজিজুর রহমান ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর আমির ছিলেন। তিনি ভূরুঙ্গামারী ডিগ্রি কলেজের (বর্তমান ভূরুঙ্গামারী সরকারি কলেজ) অধ্যক্ষ ছিলেন। কলেজটি সরকারীকরণের বিষয় সামনে এলে তিনি আমিরের পদ ছাড়েন। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি আবার জেলা আমিরের দায়িত্ব পেয়েছেন।
জেলা আমিরদের মধ্যে পাঁচজন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হয়েছেন। তাঁরা হলেন নড়াইলের আতাউর রহমান, চুয়াডাঙ্গার মো. রুহুল আমিন, মেহেরপুরের মো. তাজউদ্দীন খান, ঝিনাইদহের আলী আজম মো. আবুবকর ও পাবনার অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর ছাত্র সংসদ নির্বাচিত প্রতিনিধি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির বলেছিলেন, ‘তরুণেরা ককপিটে বসে দেশ পরিচালনা করবে। আমরা পেছন থেকে শক্তি জোগাব।’ কিন্তু জেলা পর্যায়ে অনেকের পদ আঁকড়ে থাকার প্রবণতার কারণে তরুণেরা সেভাবে নেতৃত্বে এগোতে পারছে না বলে ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন।
তবে জামায়াতের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মুহাম্মদ শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, জেলা আমির যাঁদের নেতা হিসেবে তৈরি করেন, তাঁদের হাতেই নেতৃত্বের ভার ওঠে। তাই নতুন নেতৃত্ব গড়ে ওঠে না, এই কথা ঠিক নয়।
বর্তমান সংসদে ৭৬টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে জামায়াতে ইসলামী। সংসদীয় রাজনীতিতে এটিই দলটির সেরা সাফল্য। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রভাব এবং রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে দলটির। নতুন নতুন নেতা, সমর্থক যুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান জামায়াতে যোগ দেন। সব মিলিয়ে দলের পদ ও প্রভাব নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতাও বেড়েছে বলে দলটির নেতারা মনে করছেন।
১২ অক্টোবর চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজেকে চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘোষণা করেন জামায়াতের যুব বিভাগের ইউনিয়ন শাখার সভাপতি আহাদ আলী। দল অন্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার পরই দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন আহাদ আলী। পরে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
জামায়াতকে সুশৃঙ্খল দল এবং দলের নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রের নির্দেশনার বাইরে কিছু করেন না—এমন বক্তব্য দিয়ে থাকেন দলটির শীর্ষ নেতারা। তবে গত সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে দল থেকে প্রার্থী ঘোষণার পর স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি, পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল।
গত নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম সারোয়ার ওরফে সারোয়ার তুষারকে নরসিংদী-২ আসনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু দল ও জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আমজাদ হোসাইন ভোটে অংশ নেন।
চট্টগ্রাম-৮ আসনও জামায়াত ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এনসিপির জুবাইরুল হাসানকে ছেড়ে দিয়েছিল। তবে জামায়াতের আবু নাছের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি, নির্বাচন থেকেও সরে দাঁড়াননি।
জামায়াতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এভাবে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করা কিংবা পদের জন্য সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া আগামী দিনে দলটির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। এ জন্য কুমিল্লার ঘটনা গুরুত্বসহকারে নিয়েছে দলটি।
অবশ্য জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম মনে করেন, কুমিল্লার মতো ঘটনা আর কোথাও ঘটবে না।
মতামত