শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

কোটিপতির সিলেট,গরিবের ঘরে দুর্গাপূজার বিষাদ



কোটিপতির সিলেট,গরিবের ঘরে দুর্গাপূজার বিষাদ
ছবি: প্রতীকী

শরতের নীল আকাশ,সাদা কাশফুল আর শিউলি ফুলের সুবাস জানান দেয় দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি,আলোকসজ্জা আর পূজামণ্ডপের বর্ণিল আয়োজন ঘিরে শুরু হয় বাঙালির অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। চারদিকে উৎসবের আমেজ,নতুন পোশাক কেনার ব্যস্ততা, প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি আর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর উচ্ছ্বাস। কিন্তু এই আনন্দের ছবির বাইরে থেকে যায় আরেকটি বাস্তবতা। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার,হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার চা-বাগান এবং প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদের অনেক দরিদ্র সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের কাছে দুর্গাপূজা এলেও উৎসবের আনন্দ অধরাই থেকে যায়। পূজা আসে,কিন্তু সবার ঘরে উৎসব আসে না।

চা-বাগানের শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবারের জীবন কাটে প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালানোর সংগ্রামে। সীমিত মজুরি,নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য,চিকিৎসা ব্যয়,সন্তানের পড়াশোনা এবং বাসস্থানের খরচ মেটাতে গিয়ে সারা বছরই তাদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে দুর্গাপূজার সময় পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কেনা কিংবা একটু ভালো খাবারের আয়োজন করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না।

যে উৎসবকে ঘিরে চারদিকে এত আয়োজন,সেই উৎসবের দিনেও কোনো কোনো পরিবারের চিন্তা থাকে,কীভাবে সংসারের প্রয়োজন মেটানো যাবে। অন্যদের নতুন পোশাক আর আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখে তাদের সন্তানদের মনেও হয়তো নতুন কিছু পাওয়ার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু অভাবের সংসারে সেই ইচ্ছা পূরণ হয় না।

এখানেই উৎসবের আনন্দের সঙ্গে জীবনের বাস্তবতার ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রতি বছর দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে মণ্ডপ সাজানো হয়। কোথাও থাকে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা,কোথাও থাকে ব্যতিক্রমী প্রতিমা ও নান্দনিক আয়োজন। পূজামণ্ডপের সৌন্দর্য বাড়াতে আয়োজকেরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করেন। সরকারি অনুদান ও বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায়ও অনেক পূজামণ্ডপে আয়োজন করা হয়।

এসব উদ্যোগ উৎসবকে প্রাণবন্ত করে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু উৎসবের এই আয়োজনের পাশাপাশি সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর কথা কতটা ভাবা হয়?

শহরের আলোকোজ্জ্বল মণ্ডপের বাইরে চা-বাগানের শ্রমিক কলোনি কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক পরিবার হয়তো নীরবে পূজার দিনগুলো পার করে। তাদের কাছে উৎসবের অর্থ বড় আয়োজন নয়,বরং পরিবারের সদস্যদের মুখে একটু হাসি ফোটানো,সন্তানকে একটি নতুন পোশাক কিনে দেওয়া কিংবা সাধ্যমতো ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা।

অথচ এসব সামান্য চাওয়াও অনেক পরিবারের কাছে বড় প্রাপ্তি।

পূজামণ্ডপের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করা গেলে উৎসবের তাৎপর্য বাড়বে। কারণ,প্রতিমার সামনে আলো জ্বালানোর পাশাপাশি মানুষের ঘরের অন্ধকার দূর করার চেষ্টাও মানবিকতার অংশ।

সিলেট অঞ্চল প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। এ অঞ্চলে যেমন অনেক সচ্ছল ও বিত্তবান পরিবার রয়েছে, তেমনি রয়েছে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অসংখ্য মানুষ। একই জনপদে কারও জীবনে প্রাচুর্য,আবার কারও জীবনে নিত্যদিনের অভাব। এই বৈপরীত্য উৎসবের সময় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অবশ্য সব বিত্তবান মানুষ দরিদ্রদের প্রতি উদাসীন,এমন কথা বলা ঠিক হবে না। অনেক ব্যক্তি,প্রবাসী,সামাজিক সংগঠন ও মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত মানুষ প্রতিবছর অসহায় পরিবারকে সহযোগিতা করেন। তাঁদের এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

তবে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হলে অনেক দরিদ্র পরিবারের পূজার আনন্দ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নিজেদের এলাকায় পূজার আয়োজন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয় করেন,তাঁরা চাইলে সেই উদ্যোগের একটি অংশ দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য রাখতে পারেন।

একটি নতুন পোশাক,কিছু খাদ্যসামগ্রী কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার খরচ বহন করা কোনো সচ্ছল পরিবারের কাছে হয়তো খুব বড় বিষয় নয়। কিন্তু একজন দরিদ্র মানুষের কাছে তা হয়ে উঠতে পারে অনেক বড় স্বস্তি।

এখানে দান দেখানোর বিষয়টি মুখ্য নয়। মুখ্য হলো,সমাজের একজন মানুষ যেন উৎসবের আনন্দ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মনে না করেন।

দুর্গাপূজার আগে কোথাও কোথাও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয় এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু উৎসবকেন্দ্রিক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়।

চা-বাগানের শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ন্যায্য মজুরি,মানসম্মত শিক্ষা, সহজলভ্য চিকিৎসা,নিরাপদ বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না,তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।

শুধু উৎসবের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সারা বছর তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নয়নে কাজ করতে হবে। দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যেন শিক্ষা ও সুযোগের অভাবে পিছিয়ে না পড়ে,অসুস্থ মানুষ যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন এবং শ্রমজীবী মানুষ যেন মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন,সেই পরিবেশ তৈরি করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আনন্দ,সম্প্রীতি, মানবিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতারও উপলক্ষ। এই উৎসব মানুষকে কাছাকাছি আনার কথা বলে,বিভেদ ভুলে আনন্দ ভাগাভাগি করার শিক্ষা দেয়।

কিন্তু সমাজের একটি অংশ যখন নতুন পোশাক,আলোকসজ্জা আর আনন্দের আয়োজনে ব্যস্ত থাকে,তখন অন্য একটি অংশ যদি নিত্যদিনের অভাব নিয়ে নীরবে দিন কাটায়,সেই বৈপরীত্য আমাদের ভাবিয়ে তোলা উচিত।

উৎসবের সার্থকতা শুধু কতটি মণ্ডপ তৈরি হলো,কত সুন্দর প্রতিমা নির্মিত হলো কিংবা কত বর্ণিল আলোকসজ্জা করা হলো,তার ওপর নির্ভর করে না। বরং উৎসবের আনন্দ কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাল,কতজন অসহায় মানুষ স্বস্তি পেলেন এবং কতটি পরিবারের মুখে হাসি ফুটল,সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মৌলভীবাজার,হবিগঞ্জ ও সিলেটের চা-বাগান এবং প্রত্যন্ত জনপদের দরিদ্র সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোর কথাও আমাদের ভাবতে হবে। তাঁদের জন্য পূজার আনন্দ নিশ্চিত করতে ব্যক্তি,সমাজ,পূজা উদযাপন কমিটি,সামাজিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

দুর্গাপূজার আলো শুধু মণ্ডপে সীমাবদ্ধ থাকুক,তা আমরা চাই না। সেই আলো পৌঁছে যাক অভাবের অন্ধকারে থাকা প্রতিটি ঘরে।

যেদিন একটি দরিদ্র পরিবারের শিশুও নতুন পোশাক পরে আনন্দে পূজামণ্ডপে যেতে পারবে,যেদিন কোনো মা সন্তানকে ভালো খাবার দিতে না পারার কষ্টে নীরবে চোখের জল ফেলবেন না,যেদিন সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ নিজেদের আনন্দের পাশাপাশি অসহায় প্রতিবেশীর কথাও ভাববেন,সেদিনই দুর্গোৎসব আরও বেশি মানবিক হয়ে উঠবে।

দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে আমরা শক্তি,শুভবোধ ও কল্যাণের প্রত্যাশা করি। সেই প্রত্যাশা বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হোক মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধে। উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সমাজের প্রতিটি স্তরে।

কারণ,সবার ঘরে আনন্দ না পৌঁছালে উৎসবের পূর্ণতা আসে না।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


কোটিপতির সিলেট,গরিবের ঘরে দুর্গাপূজার বিষাদ

প্রকাশের তারিখ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

শরতের নীল আকাশ,সাদা কাশফুল আর শিউলি ফুলের সুবাস জানান দেয় দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি,আলোকসজ্জা আর পূজামণ্ডপের বর্ণিল আয়োজন ঘিরে শুরু হয় বাঙালির অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। চারদিকে উৎসবের আমেজ,নতুন পোশাক কেনার ব্যস্ততা, প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি আর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর উচ্ছ্বাস। কিন্তু এই আনন্দের ছবির বাইরে থেকে যায় আরেকটি বাস্তবতা। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার,হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার চা-বাগান এবং প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদের অনেক দরিদ্র সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের কাছে দুর্গাপূজা এলেও উৎসবের আনন্দ অধরাই থেকে যায়। পূজা আসে,কিন্তু সবার ঘরে উৎসব আসে না।

চা-বাগানের শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবারের জীবন কাটে প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালানোর সংগ্রামে। সীমিত মজুরি,নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য,চিকিৎসা ব্যয়,সন্তানের পড়াশোনা এবং বাসস্থানের খরচ মেটাতে গিয়ে সারা বছরই তাদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে দুর্গাপূজার সময় পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কেনা কিংবা একটু ভালো খাবারের আয়োজন করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না।

যে উৎসবকে ঘিরে চারদিকে এত আয়োজন,সেই উৎসবের দিনেও কোনো কোনো পরিবারের চিন্তা থাকে,কীভাবে সংসারের প্রয়োজন মেটানো যাবে। অন্যদের নতুন পোশাক আর আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখে তাদের সন্তানদের মনেও হয়তো নতুন কিছু পাওয়ার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু অভাবের সংসারে সেই ইচ্ছা পূরণ হয় না।

এখানেই উৎসবের আনন্দের সঙ্গে জীবনের বাস্তবতার ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রতি বছর দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে মণ্ডপ সাজানো হয়। কোথাও থাকে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা,কোথাও থাকে ব্যতিক্রমী প্রতিমা ও নান্দনিক আয়োজন। পূজামণ্ডপের সৌন্দর্য বাড়াতে আয়োজকেরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করেন। সরকারি অনুদান ও বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায়ও অনেক পূজামণ্ডপে আয়োজন করা হয়।

এসব উদ্যোগ উৎসবকে প্রাণবন্ত করে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু উৎসবের এই আয়োজনের পাশাপাশি সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর কথা কতটা ভাবা হয়?

শহরের আলোকোজ্জ্বল মণ্ডপের বাইরে চা-বাগানের শ্রমিক কলোনি কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক পরিবার হয়তো নীরবে পূজার দিনগুলো পার করে। তাদের কাছে উৎসবের অর্থ বড় আয়োজন নয়,বরং পরিবারের সদস্যদের মুখে একটু হাসি ফোটানো,সন্তানকে একটি নতুন পোশাক কিনে দেওয়া কিংবা সাধ্যমতো ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা।

অথচ এসব সামান্য চাওয়াও অনেক পরিবারের কাছে বড় প্রাপ্তি।

পূজামণ্ডপের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করা গেলে উৎসবের তাৎপর্য বাড়বে। কারণ,প্রতিমার সামনে আলো জ্বালানোর পাশাপাশি মানুষের ঘরের অন্ধকার দূর করার চেষ্টাও মানবিকতার অংশ।

সিলেট অঞ্চল প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। এ অঞ্চলে যেমন অনেক সচ্ছল ও বিত্তবান পরিবার রয়েছে, তেমনি রয়েছে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অসংখ্য মানুষ। একই জনপদে কারও জীবনে প্রাচুর্য,আবার কারও জীবনে নিত্যদিনের অভাব। এই বৈপরীত্য উৎসবের সময় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অবশ্য সব বিত্তবান মানুষ দরিদ্রদের প্রতি উদাসীন,এমন কথা বলা ঠিক হবে না। অনেক ব্যক্তি,প্রবাসী,সামাজিক সংগঠন ও মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত মানুষ প্রতিবছর অসহায় পরিবারকে সহযোগিতা করেন। তাঁদের এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

তবে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হলে অনেক দরিদ্র পরিবারের পূজার আনন্দ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নিজেদের এলাকায় পূজার আয়োজন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয় করেন,তাঁরা চাইলে সেই উদ্যোগের একটি অংশ দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য রাখতে পারেন।

একটি নতুন পোশাক,কিছু খাদ্যসামগ্রী কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার খরচ বহন করা কোনো সচ্ছল পরিবারের কাছে হয়তো খুব বড় বিষয় নয়। কিন্তু একজন দরিদ্র মানুষের কাছে তা হয়ে উঠতে পারে অনেক বড় স্বস্তি।

এখানে দান দেখানোর বিষয়টি মুখ্য নয়। মুখ্য হলো,সমাজের একজন মানুষ যেন উৎসবের আনন্দ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মনে না করেন।

দুর্গাপূজার আগে কোথাও কোথাও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয় এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু উৎসবকেন্দ্রিক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়।

চা-বাগানের শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ন্যায্য মজুরি,মানসম্মত শিক্ষা, সহজলভ্য চিকিৎসা,নিরাপদ বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না,তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।

শুধু উৎসবের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সারা বছর তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নয়নে কাজ করতে হবে। দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যেন শিক্ষা ও সুযোগের অভাবে পিছিয়ে না পড়ে,অসুস্থ মানুষ যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন এবং শ্রমজীবী মানুষ যেন মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন,সেই পরিবেশ তৈরি করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আনন্দ,সম্প্রীতি, মানবিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতারও উপলক্ষ। এই উৎসব মানুষকে কাছাকাছি আনার কথা বলে,বিভেদ ভুলে আনন্দ ভাগাভাগি করার শিক্ষা দেয়।

কিন্তু সমাজের একটি অংশ যখন নতুন পোশাক,আলোকসজ্জা আর আনন্দের আয়োজনে ব্যস্ত থাকে,তখন অন্য একটি অংশ যদি নিত্যদিনের অভাব নিয়ে নীরবে দিন কাটায়,সেই বৈপরীত্য আমাদের ভাবিয়ে তোলা উচিত।

উৎসবের সার্থকতা শুধু কতটি মণ্ডপ তৈরি হলো,কত সুন্দর প্রতিমা নির্মিত হলো কিংবা কত বর্ণিল আলোকসজ্জা করা হলো,তার ওপর নির্ভর করে না। বরং উৎসবের আনন্দ কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাল,কতজন অসহায় মানুষ স্বস্তি পেলেন এবং কতটি পরিবারের মুখে হাসি ফুটল,সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মৌলভীবাজার,হবিগঞ্জ ও সিলেটের চা-বাগান এবং প্রত্যন্ত জনপদের দরিদ্র সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোর কথাও আমাদের ভাবতে হবে। তাঁদের জন্য পূজার আনন্দ নিশ্চিত করতে ব্যক্তি,সমাজ,পূজা উদযাপন কমিটি,সামাজিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

দুর্গাপূজার আলো শুধু মণ্ডপে সীমাবদ্ধ থাকুক,তা আমরা চাই না। সেই আলো পৌঁছে যাক অভাবের অন্ধকারে থাকা প্রতিটি ঘরে।

যেদিন একটি দরিদ্র পরিবারের শিশুও নতুন পোশাক পরে আনন্দে পূজামণ্ডপে যেতে পারবে,যেদিন কোনো মা সন্তানকে ভালো খাবার দিতে না পারার কষ্টে নীরবে চোখের জল ফেলবেন না,যেদিন সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ নিজেদের আনন্দের পাশাপাশি অসহায় প্রতিবেশীর কথাও ভাববেন,সেদিনই দুর্গোৎসব আরও বেশি মানবিক হয়ে উঠবে।

দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে আমরা শক্তি,শুভবোধ ও কল্যাণের প্রত্যাশা করি। সেই প্রত্যাশা বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হোক মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধে। উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সমাজের প্রতিটি স্তরে।

কারণ,সবার ঘরে আনন্দ না পৌঁছালে উৎসবের পূর্ণতা আসে না।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream