সৈয়দ আমিরুজ্জামান:
১৭৮৯ সালের ৫ অক্টোবর—ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে এক গৌরবময় ও বেদনাবিধুর দিন। সকল যুগে ও সকল বিপ্লবের মূল বিষয় শ্রেণিসংগ্রাম। যুগে যুগে বিপ্লবীদের নেতৃত্বে জনগণই ইতিহাস সৃষ্টি করে।
ফরাসি, ইউরোপ এবং পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে শ্রেণিগত রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এবং বৈষম্য নিরসনের সামাজিক ন্যায্যতার লড়াই এই বিপ্লবের মধ্য দিয়েই নতুন মাত্রা পেয়েছিল। আজও ফরাসি বিপ্লব শুধু ইতিহাসের দলিল নয়, বরং সমকালীন লড়াই সংগ্রামে সমাজ-অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন অভিমুখী নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এক অনন্ত প্রেরণা।
ফরাসি বিপ্লব সূচনার ২৩৭ বছর পূর্ণ হচ্ছে এবার। ক্রান্তিকালের শ্রেষ্ঠ মত বিপ্লবীরা ধারণ করে। বিপ্লব ধ্বংসের তান্ডবলীলা নয়, প্রসববেদনা মাত্র। সকল যুগে ও সকল বিপ্লবের মূল বিষয় শ্রেণিসংগ্রাম। যুগে যুগে বিপ্লবীদের নেতৃত্বে জনগণই ইতিহাস সৃষ্টি করে। তাঁদের প্রতি বিপ্লবী অভিবাদন!
ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯–১৭৯৯) ফরাসি, ইউরোপ এবং পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিপ্লবের সময় ফ্রান্সে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের অগ্রযাত্রা শুরু হয় এবং একই সাথে দেশের রোমান ক্যাথলিক চার্চ সকল গোঁড়ামী ত্যাগ করে নিজেকে পুনর্গঠন করতে বাধ্য হয়। ফরাসি বিপ্লবকে পশ্চিমা গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি জটিল সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যার মাধ্যমে পশ্চিমা সভ্যতা নিরঙ্কুশ রাজনীতি এবং অভিজাততন্ত্র থেকে নাগরিকত্বের যুগে পদার্পণ করে।
ফরাসি বিপ্লবের মূলনীতি ছিল “স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব, অথবা মৃত্যু”। এই শ্লোগানটিই বিপ্লবের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিলো যার মাধ্যমে সামরিক এবং অহিংস উভয়বিধ পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শ্লোগানটি তখন সকল কর্মীর প্রাণের কথায় পরিণত হয়েছিলো।
ফরাসি বিপ্লবের কারণ
ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক এবং আর্থসামাজিক প্রকৃতিকে ইতিহাসবিদরা স্বীকার করেননা। কারণ সম্বন্ধে একটি ধারণায় বলা হয়: অ্যানসিয়েন সরকারের প্রাচীন অভিজাত নীতি ও আইনসমূহ একটি উদীয়মান বুর্জোয়াতন্ত্রের উচ্চাভিলাষের খোরাক যোগাতে শুরু করে যা আলোকসম্পাতের দ্বারা ছিলো ব্যাপকভাবে আক্রান্ত। এই বুর্জোয়ারা শহরের বিশেষত প্যারিস এবং লিওনের চাকুরিজীবী এবং অত্যাচারিত চাষী শ্রেণির সাথে মিত্রতা সৃষ্টি করে। আরেকটি ধারণা অনুসারে অনেক বুর্জোয়া এবং অভিজাত মহল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের চেষ্টা করতে থাকে যা পরবর্তীতে চাকুরিজীবী শ্রেণির আন্দোলনগুলোর সাথে একাত্ম হয়ে যায়। এর সাথে এক হয় প্রাদেশিক চাষীদের আন্দোলন। এই ধারণা অনুসারে তাদের মধ্যে কোন মেলবন্ধন কেবল ঘটনাক্রমে হয়েছে, তা পরিকল্পিত ছিলোনা।
যে ধারণাকেই ধরা হোক না কেন, অ্যানসিয়েন সরকারের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিলো যা বিপ্লবের মূল হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। একদিক দিয়ে সেগুলো ছিলো অর্থনৈতিক কারণ:
নিম্নমানের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং বল্গাহীন জাতীয় ঋণ। এর মূল কারণ ছিল অসম করারোপণ যার বোঝা মোটেই বহনযোগ্য ছিলনা, সম্রাট লুই ১৬-এর অত্যধিক খরচ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর বিভিন্ন যুদ্ধসমূহ।
বেকারত্বের উচ্চহার এবং খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্য। বিপ্লবের ঠিক আগের মাসগুলোতে বিরাজমান খাদ্য সংকট।
অপর দিকে এর পিছনে কিছু সামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণ ছিল। আলোকিত সমাজ এই কারণগুলোকে কেন্দ্র করেই তাদের আন্দোলন শুরু করে যারা ছিল আলোকসম্পাতের যুগ দ্বারা প্রভাবিত।
এই কারণগুলো হল:
নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের পুনঃস্থাপন যা রাজত্বের পক্ষে ছিল ক্ষতিকর।
সমাজের একটি বিশেষ পেশাদার শ্রেণি এবং উঁচুশ্রেণির লোকদের ব্যাপক সুবিধা দেয়া হচ্ছিলো যা জনসাধারণের জীবনকে নিজের প্রভাবাধীনে রাখতে শুরু করেছিলো।
কৃষক, চাকুরিজীবী শ্রেণি এবং কিছু পরিমাণ বুর্জোয়া কর্তৃক জমিদারতন্ত্রের উচ্ছেদের পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়।
বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য, যাজকশ্রেণির ভোগ-বিলাস চরমে উঠে। অপরদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে একটি জোয়ার সৃষ্টি হয়।
স্বাধীনতা এবং প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের অনুপ্রেরণা।
সবশেষে যে কারণ সম্বন্ধে বলতে হয় তা হল এই সমস্যাগুলোর যেকোনটির সমাধানে সম্রাট লুই ১৬-এর চূড়ান্ত ব্যর্থতা।
রাজকীয় অর্থ সংকট
ফ্রান্সের সম্রাট লুই ১৬ (রাজত্বকাল: ১৭৭৪ – ১৭৯২) যখন রাজকীয় অর্থের সংকটে পড়েন তখনই বৈপ্লবিক সংকটকাল শুরু হয়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে বলতে হয় ফরাসি রাজের শোধক্ষমতা (solvency) ছিল ফরাসি রাষ্ট্রের শোধক্ষমতার সমমানের। ফরাসি রাজ বিপুল পরিমাণ ঋণের ফাঁদে পড়েছিলো যা তদানীন্তন অর্থ সংকটের সৃষ্টি করে।
লুই ১৫ (রাজত্বকাল: ১৭১৫ – ১৭৭৪) এবং লুই ১৬-এর শাসনকালে মূলত অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সিদ্ধান্ত রাজকীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য গৃহীত হয়েছিলো। মন্ত্রীদের মধ্যে মূল হিসেবে বলা যায় Baron de Laune Anne Robert Jacques Turgot (অর্থ বিভাগের মহানিয়ন্ত্রক: ১৭৭৪ – ১৭৭৬) এবং জ্যাক নেকারের (অর্থ বিভাগের মহানিয়ন্ত্রক: ১৭৭৭ – ১৭৮১) নাম। তারা বারবার অর্থ সমস্যার সমাধানের জন্য ফরাসি করারোপণ পদ্ধতিকে ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করেন যা কোন সফলতার মুখ দেখেনি। আর এ ধরনের উদ্যোগ সংসদ থেকে ব্যাপক বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। সংসদ তখন ছিলো Robe Nobility-দের করায়ত্তে যারা নিজেদেরকে জাতির অভিভাবক জ্ঞান করতেন। এর ফলশ্রুতিতে দুজন মন্ত্রীই পদচ্যুত হন। চার্লস আলেকজান্ডার দ্য ক্যালোঁ, যিনি ১৭৮৩ সালে অর্থ বিভাগের মহানিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পান, বিশিষ্ট ব্যয়সমূহের জন্য একটি নতুন নীতিমালা হাতে নেন যার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের প্রধান ঋণদাতাদের বুঝানোর চেষ্টা চালান।
রাজ্যসভা
জুন ১০, ১৭৮৯ তারিখে Abbé Sieyès প্রস্তাব করে যে তৃতীয় এস্টেট তার নিজস্ব ক্ষমতাবলে এগুবে এবং অন্য দুইটি এস্টেটকে আমন্ত্রণ জানাবে, কিন্তু উক্ত এস্টেটদ্বয় তৃতীয় এস্টেটের জন্য অপেক্ষা করবেনা।
বাস্তিল দুর্গ
রাজপ্রাসাদের বিলাস ব্যসন ও রাজপরিবারের অমিতব্যয়িতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা ফরাসি জনগণকে রাজতন্ত্রের প্রতি ক্রমেই বিদ্বিষ্ট করে তুলছিল। ভার্সাই রাজপ্রাসাদ ছিল বিলাস ব্যসন ও ঐশ্বর্যের ইন্দ্রপুরী। ১৮ হাজার কর্মচারী রাজপরিবারের সেবায় সদাসর্বদা নিযুক্ত থাকত এবং সভাসদদের মধ্যে কোটি কোটি মুদ্রা পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হতো।
একটি হিসাব থেকে জানা যায়, ১৭৮৯ সালে ভার্সাই রাজপ্রাসাদে বিলাসী কর্মকাণ্ডে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। রাজা, রানি ও তাঁদের সন্তান-সন্ততি এবং অগণিত আত্মীয়স্বজন সবার জন্য পৃথক পৃথক সুরম্য অট্টালিকা ছিল। এক হিসাবে রানি মেরি অ্যান্টয়নেটের নিজস্ব সহচরীসংখ্যা ছিল ৫০০। রাজা, রানি, রাজকুমার ও রাজকুমারীদের প্রমোদভ্রমণের জন্য রাজদরবারে প্রায় দুই হাজার ঘোড়া ও ২০০ অশ্বশকট সব সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকত।
এসব বিষয় ফরাসি জনগণের মধ্যে দারুণ ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। এতে রাজতন্ত্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি একেবারেই বিনষ্ট হয়ে যায়। অবস্থা এমন হয়েছিল যে ৫ অক্টোবর প্যারিস থেকে মহিলাদের ভুখা মিছিল বা হাঙ্গার মার্চ অব দ্য ওমেন ভার্সাই রাজপ্রাসাদের কাছে পৌঁছে রুটির দাম কমানোর দাবি জানায়।
তখন রানি মেরি অ্যান্টয়নেট অবাক হয়ে মিছিলের দিকে তাকিয়ে জানতে চান, এরা কী চায়? তাঁর সহচরী উত্তর দেন, এরা রুটির দাম কমাতে বলছে, রুটি চায়। রানি অবাক হয়ে বললেন, রুটি কেন? এরা কেক খেতে পারে না! প্রকৃতপক্ষে রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে বিলাস ব্যসনে জীবনযাপন করে রানি অ্যান্টয়নেট নিজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেননি।
ফ্রান্সের সমাজ প্রধানত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, যেমন-সুবিধাভোগী শ্রেণি ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি। অভিজাত সম্প্রদায় ও যাজক সম্প্রদায় প্রথম শ্রেণিভুক্ত ছিল। যাজক সম্প্রদায়কে ফার্স্ট এস্টেট ও অভিজাত সম্প্রদায়কে সেকেন্ড এস্টেট বলা হতো। মধ্যবিত্ত ও সাধারণ জনগণ ছিল সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি, তাদের বলা হতো থার্ড এস্টেট।
যাজকদের নিজস্ব প্রাসাদ, দুর্গ ও গির্জা ছিল। যাজকদের দুর্নীতি ও ধর্মীয় অনাচার লক্ষ করে রাজা ষোড়শ লুই নিজে একসময় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, অন্তত একজন আর্চবিশপকে চাই, যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন। তাঁর ভাষায়-লেট আস অ্যাটলিস্ট হ্যাভ এ আর্চবিশপ অব প্যারিস, হু বিলিভস ইন গড।
ফরাসি সমাজে দ্বিতীয় শ্রেণি ছিল অভিজাত সম্প্রদায়। তারা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একচেটিয়া অধিকার ভোগ করত এবং রাষ্ট্রের করভার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। দরবারি অভিজাতরা বৃত্তি, পুরস্কার ও পেনশন ভোগ করত। অভিজাতদের শ্রেণিগত সুযোগ-সুবিধা, ভোগ-বিলাস এবং কৃষকদের ওপর শোষণ ও নিষ্পেষণে প্রকৃতপক্ষে ফরাসি সমাজে শ্রেণিসংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে, যা সর্বাত্মক বিপ্লবের পরিণতি লাভ করে।
বিপ্লব শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই ফরাসিদের মনোজগতে পরিবর্তন শুরু হয়। আঠারো শতকের শেষভাগে ফ্রান্সে এমন কয়েকজন দার্শনিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তানায়কের আবির্ভাব হয়, যাঁদের অবদানে মধ্যযুগীয় সমাজ কাঠামোতে পরিবর্তন আসে। চিন্তানায়কদের পুরোভাগে ছিলেন মন্টেস্কু। দীর্ঘ ২০ বছর পরিশ্রম করে তিনি ‘দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ’ নামের বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনা করেন।
আরেকজন দার্শনিক ছিলেন ভলতেয়ার। ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক ভলতেয়ার লিখলেন-দ্য পেন ইজ মাইটার দ্যান দ্য সোর্ড-অর্থাৎ অসির চেয়ে মসি বেশি শক্তিশালী। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রাক-বিপ্লব ফ্রান্সের শোষণনীতি, চার্চের গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের তীব্র নিন্দা করেন।
স্বাধীনচেতা ভলতেয়ার সোজাসাপ্টা ভাষায় তাঁর মত প্রকাশ করে ফরাসি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি লিখলেন-তুমি যা বলছ তা আমি অস্বীকার করতে পারি; কিন্তু আমি আমার মৃত্যু দিয়ে হলেও এ কথা প্রতিষ্ঠা করব যে তোমার বলার অধিকার আছে। কেউ কেউ তাঁকে মানবজাতির বিবেক আখ্যা দিয়েছেন।
রাজা সাধারণ মানুষের ওপর দমননীতি শুরু করেন। রাজকীয় বাহিনী অতর্কিত হামলার প্রস্তুতি নেয়। জার্মান ও সুইস সৈন্যদের ভার্সাইয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়। রাজার এই দমননীতির বিরোধিতা করে তৃতীয় শ্রেণির সমর্থক সাধারণ জনতা ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্রাচীন যুগের অত্যাচারের প্রতীক বাস্তিল কারাদুর্গ আক্রমণ করে বন্দিদের মুক্ত করে আনে। রাজকীয় শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য লাফায়েতের নেতৃত্বে জাতীয় গার্ডবাহিনী গঠন করা হয়।
জাতীয় পরিষদ ২৭ আগস্ট ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। যেখানে মানুষের স্বাধীনতা, বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা, অবাধ গ্রেপ্তারের অবসান, বিবেকের স্বাধীনতা, আইন মানে জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ, সার্বভৌমত্ব জাতির ওপর ন্যস্ত-এ সব কিছু ম্যাগনাকার্টা হিসেবে ঘোষিত হয়।
সংবিধানের বিরোধিতা ও দেশদ্রোহের কারণে ১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি রাজা ষোড়শ লুইকে এবং পরে রানি মেরিকেও গিলোটিনে হত্যা করা হয়। তারপরও ফরাসি বিপ্লবের গতি থেমে যায়নি। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী ছড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়ায়। শুরু হয় আরেক যুগ, যা শুধু নেপোলিয়ন বোনাপার্টের।
"বাস্তিলের আগুন"
সেই যে সেদিন প্যারিস জুড়ে উঠেছিল যে ঢেউ,
ক্ষুধার্ত মুখে জেগেছিল প্রতিরোধেরই স্রোত।
রুটির দাবির মিছিল নেমে রাজপথের বুকে,
জনতার কণ্ঠ উঠেছিল বজ্রনিনাদ হয়ে।
ভার্সাই জুড়ে ঐশ্বর্যের যে প্রাসাদ ছিল গড়া,
বাইরে তখন ক্ষুধার্ত জন—চোখে অশ্রুধারা।
একদিকে রঙিন উৎসব, সোনার মুকুট ঝলক,
অন্যদিকে শূন্য হাঁড়ি, অনাহারের হাহাকার।
রাজদণ্ড আর অভিজাতের শত বছরের দম্ভ,
কৃষকের ঘাম, শ্রমিকের রক্ত—অমূল্য তার দাম।
যাজক-সামন্ত ভোগের মাঝে বন্দী ছিল দেশ,
তৃতীয় শ্রেণির বুকে জমে ক্ষোভের অবশেষ।
হঠাৎ যেন বজ্র নেমে এলো চৌদ্দ জুলাই রাতে,
বাস্তিলের সেই পাথর কাঁপে জনতারই ঘাতে।
কারাগারের লৌহদ্বারে উঠল মুক্তির গান,
ভেঙে গেল ভয়ের প্রাচীর, জাগল ফ্রান্সের প্রাণ।
মন্টেস্কুর চিন্তার আলো, ভলতেয়ারের বাণী,
রুশোর স্বপ্ন ছড়িয়ে গেল মানুষেরই প্রাণে।
প্রশ্ন উঠল—কেন মানুষ মানুষ থেকে হীন?
কেন কারও জন্মেই মেলে ক্ষমতার অধীন?
স্বাধীনতা চাই, সমতা চাই, চাই ভ্রাতৃত্বের দেশ,
মানুষ হবে মানুষের সমান—থাকবে না আর রেশ।
আইন হবে সবার জন্য, জন্ম নয় পরিচয়,
জনতারই সার্বভৌম শক্তি—এই হোক সত্যময়।
নারীর পদধ্বনি শুনে কেঁপে উঠল রাজপ্রাসাদ,
ক্ষুধার আগুন জানিয়ে দিল কত গভীর অবসাদ।
রুটির জন্য পথে নামা সেই সাহসী জনতা
ইতিহাসের পাতায় লিখল সংগ্রামের মহাকথা।
রাজমুকুটও রক্ষা পেল না জনতার সেই ঢেউয়ে,
ক্ষমতার সিংহাসন কাঁপল সময়ের প্রবল বেগে।
ষোড়শ লুইয়ের পতন হলো, বদলে গেল কাল,
পুরোনো দিনের প্রাচীর ভেঙে খুলল নতুন দ্বার।
তবু বিপ্লব মানে শুধু রক্তের নদী নয়,
ধ্বংসের মাঝে নতুন দিনের বীজও লুকায় রয়।
ভুল-ত্রুটি আর রক্তপাতের কঠিন ইতিহাস,
তবু মানুষের অধিকারের সংগ্রাম অম্লান আজ।
দুই শতাব্দী পেরিয়ে আজও প্রশ্ন জাগে মনে—
বৈষম্যের দেয়াল কেন দাঁড়িয়ে আছে জীবনে?
কোথাও ক্ষুধা, কোথাও প্রাসাদ—অসমতার ক্ষত,
কোথাও শ্রমের মূল্যহীন, কোথাও সম্পদের রথ।
তাই তো আজও প্যারিস থেকে আসে সেই ডাক—
মানুষ যেন মানুষ হয়, ভাঙুক শোষণের ফাঁক।
স্বাধীনতার সূর্য যেন সকল ঘরে ওঠে,
সমতার অধিকার যেন প্রতিটি প্রাণে ফোটে।
বাংলার মাটিও দেখেছে রক্তে লেখা ইতিহাস,
মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিশপথ, জনতারই বিশ্বাস।
অন্যায় যখন মাথা তোলে, জাগে মানুষের দল,
জনতার হাতেই ইতিহাস বদলের অনল।
ফরাসি বিপ্লব তাই শুধু অতীতের কোনো কথা নয়,
মানবমুক্তির দীর্ঘ পথে আজও তার প্রতিধ্বনি রয়।
যতদিন ক্ষুধা, যতদিন শোষণ, যতদিন বৈষম্য,
ততদিন জাগবে মানুষের সমতারই মন্ত্র।
বাস্তিল ভাঙার সেই আগুন নিভে যায়নি আজ,
মানুষ যখন অধিকার চায়, জেগে ওঠে তারই সাজ।
স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব—মানবতার অমর গান,
জনতার সংগ্রামেই গড়ে ন্যায়ভিত্তিক নতুন প্রাণ।
এসো তবে ইতিহাস থেকে শিখি নতুন করে—
মানুষ যেন না হারায় মানুষ মানুষের ভিড়ে।
শ্রমের মর্যাদা, ন্যায়ের আলো, বৈষম্যহীন ভোর,
সেই স্বপ্নেই এগিয়ে যাক পৃথিবী—আরও দূর।
যাঁরা পথে প্রাণ দিয়েছেন মানুষের মুক্তির তরে,
শ্রদ্ধা তাঁদের—যুগের পরে যুগের অন্তরে।
ইতিহাসের নির্মাতা যারা—সাধারণ সেই জন,
তাঁদের হাতেই ভবিষ্যতের নতুন আয়োজন।
বাস্তিল আজ ইট-পাথর নয়—একটি প্রতীক মাত্র,
অন্যায়েরই দুর্গ যেখানে, সেখানেই তার ভাঙন।
জনতার জাগরণে একদিন বদলাবে সব রাত,
সমতার সূর্য উঠবে আবার—জয় হোক মানবজাতি।
—(বাস্তিলের আগুন,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)
সুপ্রিয় পাঠক, ফরাসি বিপ্লবের ২৩৭তম বার্ষিকী উপলক্ষ করে এই নিবন্ধটি লেখা হলেও মহান ও কীর্তিমান বিপ্লবীদের নিয়ে সব সময়ই লেখা যায়। পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই জনগণের নতুন ধারার এক আর্থসামাজিক বৈপ্লবিক ব্যবস্থা প্রবর্তনে বিশ্বজনীন মহান ও কীর্তিমান বিপ্লবীদের রাজনীতি, আত্মোৎসর্গ, জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস, তত্ত্ব ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী। কিংবদন্তী সকল বিপ্লবীসহ ইতিহাসের নির্মাতা ও চালিকাশক্তি জনগণের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিবাদন!
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com

মতামত