মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

ক্ষুদে গবেষক সম্মেলন ও চ্যাম্পিয়ন হওয়া তিন শিক্ষার্থীর প্রশ্ন



ক্ষুদে গবেষক সম্মেলন ও চ্যাম্পিয়ন হওয়া তিন শিক্ষার্থীর প্রশ্ন

‘পথচলা, আলোর সাথে’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল স্বেচ্ছাসেবী গবেষণা সংগঠন ‘চিন্তার চাষ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ১১তম চিন্তার চাষ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলন ২০২৬। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত দিনব্যাপী এ সম্মেলনে উঠে এসেছে নতুন প্রজন্মের অনুসন্ধিৎসু মন, যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও গবেষণামুখী মানসিকতার নানা দৃষ্টান্ত।

এবারের সম্মেলনে ৩১৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তারা মোট ১২৮টি গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টার উপস্থাপন করে। শিক্ষার্থীদের গবেষণার বিষয়বৈচিত্র্য, সমস্যা শনাক্তকরণ, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য সমাধান উপস্থাপনের প্রচেষ্টা সম্মেলনটিকে শুধু একটি প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং এটি হয়ে উঠেছে স্কুলপর্যায়ে গবেষণাচর্চা ও জ্ঞানসৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।

এ সম্মেলনের ‘খ’ গ্রুপ বা শিক্ষা বিভাগে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী—স্বর্ণদ্বীপ পাল, শুভাদিত্য বিশ্বাস ও বিবেক রায় রুদ্র। নিজেদের গবেষণার জন্য তারা জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি পদকও অর্জন করেছে।

তাদের এ সাফল্য শুধু তিন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি শ্রীমঙ্গল তথা মৌলভীবাজারের শিক্ষাঙ্গনের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দেশের রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের একটি গবেষণা প্রতিযোগিতায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া প্রমাণ করে—সুযোগ, দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় পরিবেশ পেলে দেশের যেকোনো অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাই গবেষণা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখতে পারে।

গবেষণার বিষয়—আমাদের দশম শ্রেণির পাঠ্যবই কতটা উপযুক্ত?

নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন শিক্ষার্থীর গবেষণার বিষয়টি ছিল সময়োপযোগী ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের গবেষণার শিরোনাম—‘SYL_17, নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইকে শিক্ষার্থীদের জন্য যথোপযুক্ত?’

একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি গঠন এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আর শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো পাঠ্যবই। শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমেই জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও চিন্তার প্রাথমিক কাঠামো অর্জন করে।

এই বাস্তবতা সামনে রেখে তিন শিক্ষার্থী বাংলাদেশের দশম শ্রেণির পাঠ্যবইকে ভারত, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাঠ্যবই ও শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে দেখার চেষ্টা করেছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ের শক্তিশালী দিক, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যতে উন্নয়নের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা।

গবেষণায় তারা পরিমাণগত ও গুণগত—দুই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং সেন্ট মার্থাস হাই স্কুলের মোট ২৫০ জন শিক্ষার্থীর ওপর কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নমালা জরিপ পরিচালনা করা হয়। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও শিক্ষকদের পর্যবেক্ষণ সংগ্রহ করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্যভিত্তি আরও সমৃদ্ধ করতে ন্যাশনাল কারিকুলাম অ্যান্ড টেক্সটবুক বোর্ড (NCTB), ভারতের NCERT, UNESCO, OECD এবং World Bank-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণায় বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ের যে চিত্র উঠে এসেছে

গবেষণায় শিক্ষার্থীরা দেখতে পেয়েছে, বাংলাদেশের দশম শ্রেণির পাঠ্যবই মৌলিক জ্ঞান প্রদানের ক্ষেত্রে মোটামুটি কার্যকর হলেও ব্যবহারিক শিক্ষা, গবেষণাভিত্তিক কাজ, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।

তাদের তুলনামূলক বিশ্লেষণে বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার পৃথক বৈশিষ্ট্যও উঠে এসেছে।

ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি বা NEP 2020-এ দক্ষতা ও যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইরানের শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত ও বিজ্ঞানের কাঠামোগত শক্তির বিষয়টি শিক্ষার্থীদের গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, দলগত কাজ, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিখনকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করেছে।

এই তুলনামূলক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তিন শিক্ষার্থী বাংলাদেশের দশম শ্রেণির পাঠ্যবইকে আরও আধুনিক, গবেষণামুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার জন্য কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরেছে।

তাদের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তারা শুধু পাঠ্যবইয়ের ভালো-মন্দ নিয়ে মতামত দেয়নি; বরং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে একটি তুলনামূলক চিত্র দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে।

এ বয়সে শিক্ষার্থীদের এমন গবেষণামুখী উদ্যোগ তাদের অনুসন্ধিৎসা ও বিশ্লেষণী সক্ষমতার পরিচয় বহন করে।

৩১৮ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ, ১২৮টি গবেষণা

৩ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার ঢাকায় দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় ১১তম চিন্তার চাষ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনের বিভিন্ন কার্যক্রম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)সহ মোট আটটি স্থানে সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তাদের গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টার উপস্থাপন করে। ৩১৮ জন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে মোট ১২৮টি গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টার উপস্থাপিত হয়।

দিনব্যাপী বিভিন্ন পর্বে শিক্ষার্থীরা নিজেদের গবেষণার বিষয়, গবেষণাপদ্ধতি, সংগৃহীত তথ্য, ফলাফল ও সম্ভাব্য প্রয়োগ সম্পর্কে বিচারকদের সামনে উপস্থাপন করে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব গবেষণার অনেকগুলোই শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চারপাশের সমস্যা, সামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষা, পরিবেশ ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে সম্মেলনটি শুধু গবেষণাপত্র উপস্থাপনের একটি আয়োজন নয়; বরং শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবন পর্যবেক্ষণ, প্রশ্ন তৈরি এবং সমস্যার সমাধান অনুসন্ধানের একটি কার্যকর ক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।

‘গবেষণা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হবে’—এ ধারণা সঠিক নয়

সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, নিজের চারপাশের সমস্যা চিহ্নিত করে হাতের কাছে থাকা উপকরণ দিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা থেকেই গবেষণার শুরু হতে পারে। গবেষণা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই শুরু হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহ তৈরি এবং তাদের অনুসন্ধিৎসু মনকে বিকশিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই প্রশ্ন করতে, সমস্যা শনাক্ত করতে এবং তার সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

তার বক্তব্যে যে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তা হলো—গবেষণার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। বরং প্রশ্ন করার অভ্যাস, নতুন কিছু জানার আগ্রহ এবং নিজের চারপাশের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতের গবেষক, বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের ভিত তৈরি হতে পারে।

সম্মেলনে ছিলেন শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্টজনেরা

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. উপমা কবির এবং দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের পরিকল্পনা সম্পাদক আসজাদুল কিবরিয়া।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ‘চিন্তার চাষ’-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমান। সম্মেলনের আহ্বায়ক ও সংগঠনটির পরিচালক জাহিদুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্যে ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনের ধারাবাহিকতা, উদ্দেশ্য ও বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন।

সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের ইউজিসি অধ্যাপক ড. জেবা আই সেরাজ, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোবারক আহমেদ খান এবং প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ।

সাত ক্যাটাগরিতে ২৭ গবেষক দলকে পদক

দিনব্যাপী গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টার উপস্থাপনের পর বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।

জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে সাতটি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ হিসেবে মোট ২৭টি গবেষক দলকে পদক দেওয়া হয়। অতিথিরা বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পদক ও পুরস্কার তুলে দেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার ফলাফল ও পাঠ্যবইকেন্দ্রিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, সৃজনশীলতা, যুক্তি ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।

তিন শিক্ষার্থীর সাফল্যে শ্রীমঙ্গলে আনন্দ

নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বর্ণদ্বীপ পাল, শুভাদিত্য বিশ্বাস ও বিবেক রায় রুদ্রের জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খবরে শ্রীমঙ্গলের শিক্ষাঙ্গনে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।

তাদের এই অর্জন দেখিয়েছে, ঢাকাকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধার বাইরে থেকেও মেধাবী ও আগ্রহী শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে।

বিশেষ করে গবেষণার মতো একটি ক্ষেত্রে স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জন একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে গবেষণামুখী শিক্ষার প্রতি আরও গুরুত্ব দেওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে।

‘জ্ঞান সৃষ্টিতে গবেষণার বিকল্প নেই’

চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য শুভাদিত্য বিশ্বাসের পিতা শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও গণিত বিভাগের প্রধান সুদর্শন শীল তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘চিন্তার চাষ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলন শিশু শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে অনন্য ভূমিকা রাখছে বলে মনে করি। জ্ঞান সৃষ্টিতে গবেষণার বিকল্প নেই। অংশগ্রহণকারী সকল শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-মণ্ডলীকে অভিনন্দন ও শুভকামনা জানাই।’

একজন শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে তাঁর এই মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্কুলপর্যায়ে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও অভিভাবকদের ইতিবাচক ভূমিকা প্রয়োজন।

গবেষণার বয়স নেই

প্রচলিত ধারণায় গবেষণাকে অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার কিংবা উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। কিন্তু ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনের মতো আয়োজন সেই ধারণাকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে।

একজন সপ্তম, অষ্টম, নবম কিংবা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকের মতো বিশদ গবেষণা পরিচালনা করতে পারবে না। কিন্তু সে প্রশ্ন করতে পারে, তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, পর্যবেক্ষণ করতে পারে, তুলনা করতে পারে এবং নিজের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে একটি সম্ভাব্য সমাধান বা সুপারিশ দিতে পারে। গবেষণার প্রাথমিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে মূলত এসব অভ্যাস থেকেই।

শিশু-কিশোর বয়সে প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি হলে ভবিষ্যতে সেই শিক্ষার্থী মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বাইরে গিয়ে বিষয়কে বোঝার চেষ্টা করে। সে তথ্য যাচাই করতে শেখে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে শেখে এবং নিজের চিন্তাকে প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে শেখে।

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনীতির মতো জটিল বিষয় সামনে রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে হলে এই গবেষণামুখী ও অনুসন্ধিৎসু মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পাঠ্যবইয়ের বাইরে বাস্তব জ্ঞানচর্চার প্রয়োজন

নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন শিক্ষার্থীর গবেষণার বিষয়টি এ জায়গাতেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তারা শুধু একটি পাঠ্যবই ভালো কি খারাপ—সে প্রশ্ন করেনি। বরং পাঠ্যবই কীভাবে শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও গবেষণার সক্ষমতা তৈরি করছে—তা বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে দেখার চেষ্টা করেছে।

এ ধরনের গবেষণা শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করার পরিবর্তে তথ্যকে প্রশ্ন করতে শেখায়। একটি তথ্য কোথা থেকে এসেছে, তার প্রমাণ কী, অন্য দেশের বাস্তবতা কী, আমাদের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে তার পার্থক্য কোথায় এবং কীভাবে উন্নতি করা সম্ভব—এসব প্রশ্নের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় গবেষণামুখী চিন্তা।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন চর্চা যত বাড়বে, ততই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার নম্বরের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের সমস্যা বুঝতে এবং সমাধান খুঁজতে সক্ষম হবে।

২৭টি দল, একটি বড় সম্ভাবনার বার্তা

জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে সাতটি ক্যাটাগরিতে ২৭টি গবেষক দলের পদক অর্জনকে শুধু একটি প্রতিযোগিতার ফলাফল হিসেবে দেখলে এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যটি হয়তো পুরোপুরি ধরা পড়বে না।

এর বড় অর্জন হলো—দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৩১৮ জন শিক্ষার্থীকে গবেষণার একটি অভিজ্ঞতার মধ্যে নিয়ে আসা। ১২৮টি গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টারের মাধ্যমে তারা নিজেদের চিন্তা ও অনুসন্ধানের ফলাফল প্রকাশ করেছে।

এদের প্রত্যেকের গবেষণা হয়তো পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক গবেষণার সব মানদণ্ড পূরণ করে না। কিন্তু তারা প্রশ্ন করেছে, তথ্য খুঁজেছে, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে, তথ্য বিশ্লেষণ করেছে এবং নিজেদের চিন্তা অন্যের সামনে উপস্থাপন করেছে। শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য পূরণে এই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে মূল্যবান।

প্রয়োজন ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতা

স্কুলপর্যায়ে গবেষণাচর্চাকে আরও এগিয়ে নিতে শুধু একটি বার্ষিক সম্মেলন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক গবেষণা ক্লাব, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ছোট গবেষণা অনুদান, তথ্য ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণাকাজকে মূল্যায়নের সুযোগ।

একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে—গবেষণায় সময় দেওয়া মানে পরীক্ষার প্রস্তুতি থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং গবেষণা শিক্ষার্থীর পড়াশোনাকে আরও অর্থবহ করতে পারে। কারণ গবেষণার মাধ্যমে সে বইয়ের তথ্য বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে শেখে।

শিক্ষকদেরও ‘সঠিক উত্তর’ দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ‘সঠিক প্রশ্ন’ করতে উৎসাহিত করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করলে তাকে নিরুৎসাহিত করা হবে না; বরং প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ দেওয়া হবে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশে গবেষণামুখী প্রজন্ম

বাংলাদেশের উন্নয়ন এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপান্তর করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষ, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী মানবসম্পদ তৈরি করা।

সেই মানবসম্পদের ভিত্তি তৈরি হয় স্কুলপর্যায় থেকেই। একটি শিশু যখন নিজের চারপাশের সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করে, তথ্য সংগ্রহ করে এবং সম্ভাব্য সমাধান খোঁজে, তখন তার মধ্যে কেবল একটি গবেষণার দক্ষতাই তৈরি হয় না; একই সঙ্গে তৈরি হয় দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার মানসিকতা।

‘চিন্তার চাষ’ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনের মতো উদ্যোগ তাই একটি প্রতিযোগিতার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, অনুসন্ধান করতে এবং নিজেদের ভাবনাকে যুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে প্রকাশ করতে শেখায়।

শ্রীমঙ্গলের নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন শিক্ষার্থী—স্বর্ণদ্বীপ পাল, শুভাদিত্য বিশ্বাস ও বিবেক রায় রুদ্রের জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সাফল্য সেই সম্ভাবনারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

তাদের গবেষণার প্রশ্ন—‘নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইকে শিক্ষার্থীদের জন্য যথোপযুক্ত?’—শুধু তিন শিক্ষার্থীর গবেষণার বিষয় নয়; এটি আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও ছুড়ে দেয়।

আমরা কি এমন একটি শিক্ষা চাই, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু বইয়ের উত্তর মুখস্থ করবে? নাকি এমন একটি শিক্ষা চাই, যেখানে সে প্রশ্ন করবে, উত্তর খুঁজবে, ভুল থেকে শিখবে, তথ্য যাচাই করবে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থার পথ নির্ধারণ করবে।

নতুন প্রজন্মের হাতে গবেষণার আলো

১১তম চিন্তার চাষ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৩১৮ জন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ এবং ১২৮টি গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টার উপস্থাপন একটি আশাব্যঞ্জক বাস্তবতার কথা বলে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানচর্চা, অনুসন্ধান ও গবেষণার আগ্রহ রয়েছে।

এ আগ্রহকে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক, নীতিনির্ধারক ও গবেষণা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও বেশি গবেষক, উদ্ভাবক ও জ্ঞানসৃষ্টিকারী তরুণ পেতে পারে।

শ্রীমঙ্গলের তিন ক্ষুদে গবেষকের জাতীয় পর্যায়ের চ্যাম্পিয়ন হওয়া তাই কেবল একটি পুরস্কার পাওয়ার গল্প নয়। এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনার গল্প; এটি প্রশ্ন করার সাহসের গল্প; এটি গবেষণার মাধ্যমে নতুন কিছু জানার আকাঙ্ক্ষার গল্প।

আর সবচেয়ে বড় কথা—এটি মনে করিয়ে দেয়, গবেষণার জন্য বয়স বড় কথা নয়; প্রয়োজন কৌতূহল, প্রশ্ন করার সাহস, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সুযোগ।

এই সুযোগ যত বেশি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাবে, ততই শক্তিশালী হবে বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যতের ভিত।

#

সৈয়দ আমিরুজ্জামান, এলএল.বি

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;

বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;

সম্পাদক, আরপি নিউজ;

কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;

‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।

সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।

সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।

প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।

E-mail : syedzaman.62@gmail.com

WhatsApp : 01716599589

মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯

Bikash number : +8801716599589 (personal)

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬


ক্ষুদে গবেষক সম্মেলন ও চ্যাম্পিয়ন হওয়া তিন শিক্ষার্থীর প্রশ্ন

প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

‘পথচলা, আলোর সাথে’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল স্বেচ্ছাসেবী গবেষণা সংগঠন ‘চিন্তার চাষ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ১১তম চিন্তার চাষ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলন ২০২৬। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত দিনব্যাপী এ সম্মেলনে উঠে এসেছে নতুন প্রজন্মের অনুসন্ধিৎসু মন, যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও গবেষণামুখী মানসিকতার নানা দৃষ্টান্ত।

এবারের সম্মেলনে ৩১৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তারা মোট ১২৮টি গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টার উপস্থাপন করে। শিক্ষার্থীদের গবেষণার বিষয়বৈচিত্র্য, সমস্যা শনাক্তকরণ, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য সমাধান উপস্থাপনের প্রচেষ্টা সম্মেলনটিকে শুধু একটি প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং এটি হয়ে উঠেছে স্কুলপর্যায়ে গবেষণাচর্চা ও জ্ঞানসৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।

এ সম্মেলনের ‘খ’ গ্রুপ বা শিক্ষা বিভাগে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী—স্বর্ণদ্বীপ পাল, শুভাদিত্য বিশ্বাস ও বিবেক রায় রুদ্র। নিজেদের গবেষণার জন্য তারা জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি পদকও অর্জন করেছে।


তাদের এ সাফল্য শুধু তিন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি শ্রীমঙ্গল তথা মৌলভীবাজারের শিক্ষাঙ্গনের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দেশের রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের একটি গবেষণা প্রতিযোগিতায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া প্রমাণ করে—সুযোগ, দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় পরিবেশ পেলে দেশের যেকোনো অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাই গবেষণা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখতে পারে।


গবেষণার বিষয়—আমাদের দশম শ্রেণির পাঠ্যবই কতটা উপযুক্ত?


নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন শিক্ষার্থীর গবেষণার বিষয়টি ছিল সময়োপযোগী ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের গবেষণার শিরোনাম—‘SYL_17, নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইকে শিক্ষার্থীদের জন্য যথোপযুক্ত?’


একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি গঠন এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আর শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো পাঠ্যবই। শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমেই জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও চিন্তার প্রাথমিক কাঠামো অর্জন করে।


এই বাস্তবতা সামনে রেখে তিন শিক্ষার্থী বাংলাদেশের দশম শ্রেণির পাঠ্যবইকে ভারত, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাঠ্যবই ও শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে দেখার চেষ্টা করেছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ের শক্তিশালী দিক, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যতে উন্নয়নের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা।


গবেষণায় তারা পরিমাণগত ও গুণগত—দুই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং সেন্ট মার্থাস হাই স্কুলের মোট ২৫০ জন শিক্ষার্থীর ওপর কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নমালা জরিপ পরিচালনা করা হয়। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও শিক্ষকদের পর্যবেক্ষণ সংগ্রহ করা হয়েছে।


গবেষণার তথ্যভিত্তি আরও সমৃদ্ধ করতে ন্যাশনাল কারিকুলাম অ্যান্ড টেক্সটবুক বোর্ড (NCTB), ভারতের NCERT, UNESCO, OECD এবং World Bank-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।


গবেষণায় বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ের যে চিত্র উঠে এসেছে


গবেষণায় শিক্ষার্থীরা দেখতে পেয়েছে, বাংলাদেশের দশম শ্রেণির পাঠ্যবই মৌলিক জ্ঞান প্রদানের ক্ষেত্রে মোটামুটি কার্যকর হলেও ব্যবহারিক শিক্ষা, গবেষণাভিত্তিক কাজ, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।


তাদের তুলনামূলক বিশ্লেষণে বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার পৃথক বৈশিষ্ট্যও উঠে এসেছে।


ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি বা NEP 2020-এ দক্ষতা ও যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইরানের শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত ও বিজ্ঞানের কাঠামোগত শক্তির বিষয়টি শিক্ষার্থীদের গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, দলগত কাজ, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিখনকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করেছে।


এই তুলনামূলক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তিন শিক্ষার্থী বাংলাদেশের দশম শ্রেণির পাঠ্যবইকে আরও আধুনিক, গবেষণামুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার জন্য কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরেছে।


তাদের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তারা শুধু পাঠ্যবইয়ের ভালো-মন্দ নিয়ে মতামত দেয়নি; বরং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে একটি তুলনামূলক চিত্র দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে।


এ বয়সে শিক্ষার্থীদের এমন গবেষণামুখী উদ্যোগ তাদের অনুসন্ধিৎসা ও বিশ্লেষণী সক্ষমতার পরিচয় বহন করে।


৩১৮ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ, ১২৮টি গবেষণা


৩ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার ঢাকায় দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় ১১তম চিন্তার চাষ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনের বিভিন্ন কার্যক্রম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)সহ মোট আটটি স্থানে সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।


দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তাদের গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টার উপস্থাপন করে। ৩১৮ জন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে মোট ১২৮টি গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টার উপস্থাপিত হয়।


দিনব্যাপী বিভিন্ন পর্বে শিক্ষার্থীরা নিজেদের গবেষণার বিষয়, গবেষণাপদ্ধতি, সংগৃহীত তথ্য, ফলাফল ও সম্ভাব্য প্রয়োগ সম্পর্কে বিচারকদের সামনে উপস্থাপন করে।


বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব গবেষণার অনেকগুলোই শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চারপাশের সমস্যা, সামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষা, পরিবেশ ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে সম্মেলনটি শুধু গবেষণাপত্র উপস্থাপনের একটি আয়োজন নয়; বরং শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবন পর্যবেক্ষণ, প্রশ্ন তৈরি এবং সমস্যার সমাধান অনুসন্ধানের একটি কার্যকর ক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।


‘গবেষণা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হবে’—এ ধারণা সঠিক নয়


সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, নিজের চারপাশের সমস্যা চিহ্নিত করে হাতের কাছে থাকা উপকরণ দিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা থেকেই গবেষণার শুরু হতে পারে। গবেষণা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই শুরু হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।


ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহ তৈরি এবং তাদের অনুসন্ধিৎসু মনকে বিকশিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই প্রশ্ন করতে, সমস্যা শনাক্ত করতে এবং তার সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।


তার বক্তব্যে যে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তা হলো—গবেষণার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। বরং প্রশ্ন করার অভ্যাস, নতুন কিছু জানার আগ্রহ এবং নিজের চারপাশের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতের গবেষক, বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের ভিত তৈরি হতে পারে।


সম্মেলনে ছিলেন শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্টজনেরা


উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. উপমা কবির এবং দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের পরিকল্পনা সম্পাদক আসজাদুল কিবরিয়া।


অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ‘চিন্তার চাষ’-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমান। সম্মেলনের আহ্বায়ক ও সংগঠনটির পরিচালক জাহিদুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্যে ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনের ধারাবাহিকতা, উদ্দেশ্য ও বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন।


সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের ইউজিসি অধ্যাপক ড. জেবা আই সেরাজ, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোবারক আহমেদ খান এবং প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ।


সাত ক্যাটাগরিতে ২৭ গবেষক দলকে পদক


দিনব্যাপী গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টার উপস্থাপনের পর বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।


জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে সাতটি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ হিসেবে মোট ২৭টি গবেষক দলকে পদক দেওয়া হয়। অতিথিরা বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পদক ও পুরস্কার তুলে দেন।


অনুষ্ঠানে বক্তারা ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার ফলাফল ও পাঠ্যবইকেন্দ্রিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, সৃজনশীলতা, যুক্তি ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।


তিন শিক্ষার্থীর সাফল্যে শ্রীমঙ্গলে আনন্দ


নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বর্ণদ্বীপ পাল, শুভাদিত্য বিশ্বাস ও বিবেক রায় রুদ্রের জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খবরে শ্রীমঙ্গলের শিক্ষাঙ্গনে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।


তাদের এই অর্জন দেখিয়েছে, ঢাকাকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধার বাইরে থেকেও মেধাবী ও আগ্রহী শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে।


বিশেষ করে গবেষণার মতো একটি ক্ষেত্রে স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জন একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে গবেষণামুখী শিক্ষার প্রতি আরও গুরুত্ব দেওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে।


‘জ্ঞান সৃষ্টিতে গবেষণার বিকল্প নেই’


চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য শুভাদিত্য বিশ্বাসের পিতা শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও গণিত বিভাগের প্রধান সুদর্শন শীল তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘চিন্তার চাষ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলন শিশু শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে অনন্য ভূমিকা রাখছে বলে মনে করি। জ্ঞান সৃষ্টিতে গবেষণার বিকল্প নেই। অংশগ্রহণকারী সকল শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-মণ্ডলীকে অভিনন্দন ও শুভকামনা জানাই।’


একজন শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে তাঁর এই মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্কুলপর্যায়ে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও অভিভাবকদের ইতিবাচক ভূমিকা প্রয়োজন।


গবেষণার বয়স নেই


প্রচলিত ধারণায় গবেষণাকে অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার কিংবা উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। কিন্তু ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনের মতো আয়োজন সেই ধারণাকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে।


একজন সপ্তম, অষ্টম, নবম কিংবা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকের মতো বিশদ গবেষণা পরিচালনা করতে পারবে না। কিন্তু সে প্রশ্ন করতে পারে, তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, পর্যবেক্ষণ করতে পারে, তুলনা করতে পারে এবং নিজের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে একটি সম্ভাব্য সমাধান বা সুপারিশ দিতে পারে। গবেষণার প্রাথমিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে মূলত এসব অভ্যাস থেকেই।


শিশু-কিশোর বয়সে প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি হলে ভবিষ্যতে সেই শিক্ষার্থী মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বাইরে গিয়ে বিষয়কে বোঝার চেষ্টা করে। সে তথ্য যাচাই করতে শেখে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে শেখে এবং নিজের চিন্তাকে প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে শেখে।


বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনীতির মতো জটিল বিষয় সামনে রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে হলে এই গবেষণামুখী ও অনুসন্ধিৎসু মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


পাঠ্যবইয়ের বাইরে বাস্তব জ্ঞানচর্চার প্রয়োজন


নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন শিক্ষার্থীর গবেষণার বিষয়টি এ জায়গাতেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তারা শুধু একটি পাঠ্যবই ভালো কি খারাপ—সে প্রশ্ন করেনি। বরং পাঠ্যবই কীভাবে শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও গবেষণার সক্ষমতা তৈরি করছে—তা বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে দেখার চেষ্টা করেছে।


এ ধরনের গবেষণা শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করার পরিবর্তে তথ্যকে প্রশ্ন করতে শেখায়। একটি তথ্য কোথা থেকে এসেছে, তার প্রমাণ কী, অন্য দেশের বাস্তবতা কী, আমাদের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে তার পার্থক্য কোথায় এবং কীভাবে উন্নতি করা সম্ভব—এসব প্রশ্নের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় গবেষণামুখী চিন্তা।


বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন চর্চা যত বাড়বে, ততই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার নম্বরের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের সমস্যা বুঝতে এবং সমাধান খুঁজতে সক্ষম হবে।


২৭টি দল, একটি বড় সম্ভাবনার বার্তা


জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে সাতটি ক্যাটাগরিতে ২৭টি গবেষক দলের পদক অর্জনকে শুধু একটি প্রতিযোগিতার ফলাফল হিসেবে দেখলে এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যটি হয়তো পুরোপুরি ধরা পড়বে না।


এর বড় অর্জন হলো—দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৩১৮ জন শিক্ষার্থীকে গবেষণার একটি অভিজ্ঞতার মধ্যে নিয়ে আসা। ১২৮টি গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টারের মাধ্যমে তারা নিজেদের চিন্তা ও অনুসন্ধানের ফলাফল প্রকাশ করেছে।


এদের প্রত্যেকের গবেষণা হয়তো পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক গবেষণার সব মানদণ্ড পূরণ করে না। কিন্তু তারা প্রশ্ন করেছে, তথ্য খুঁজেছে, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে, তথ্য বিশ্লেষণ করেছে এবং নিজেদের চিন্তা অন্যের সামনে উপস্থাপন করেছে। শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য পূরণে এই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে মূল্যবান।


প্রয়োজন ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতা


স্কুলপর্যায়ে গবেষণাচর্চাকে আরও এগিয়ে নিতে শুধু একটি বার্ষিক সম্মেলন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক গবেষণা ক্লাব, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ছোট গবেষণা অনুদান, তথ্য ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণাকাজকে মূল্যায়নের সুযোগ।


একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে—গবেষণায় সময় দেওয়া মানে পরীক্ষার প্রস্তুতি থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং গবেষণা শিক্ষার্থীর পড়াশোনাকে আরও অর্থবহ করতে পারে। কারণ গবেষণার মাধ্যমে সে বইয়ের তথ্য বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে শেখে।


শিক্ষকদেরও ‘সঠিক উত্তর’ দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ‘সঠিক প্রশ্ন’ করতে উৎসাহিত করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করলে তাকে নিরুৎসাহিত করা হবে না; বরং প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ দেওয়া হবে।


ভবিষ্যতের বাংলাদেশে গবেষণামুখী প্রজন্ম


বাংলাদেশের উন্নয়ন এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপান্তর করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষ, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী মানবসম্পদ তৈরি করা।


সেই মানবসম্পদের ভিত্তি তৈরি হয় স্কুলপর্যায় থেকেই। একটি শিশু যখন নিজের চারপাশের সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করে, তথ্য সংগ্রহ করে এবং সম্ভাব্য সমাধান খোঁজে, তখন তার মধ্যে কেবল একটি গবেষণার দক্ষতাই তৈরি হয় না; একই সঙ্গে তৈরি হয় দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার মানসিকতা।


‘চিন্তার চাষ’ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনের মতো উদ্যোগ তাই একটি প্রতিযোগিতার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, অনুসন্ধান করতে এবং নিজেদের ভাবনাকে যুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে প্রকাশ করতে শেখায়।


শ্রীমঙ্গলের নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন শিক্ষার্থী—স্বর্ণদ্বীপ পাল, শুভাদিত্য বিশ্বাস ও বিবেক রায় রুদ্রের জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সাফল্য সেই সম্ভাবনারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।


তাদের গবেষণার প্রশ্ন—‘নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইকে শিক্ষার্থীদের জন্য যথোপযুক্ত?’—শুধু তিন শিক্ষার্থীর গবেষণার বিষয় নয়; এটি আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও ছুড়ে দেয়।


আমরা কি এমন একটি শিক্ষা চাই, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু বইয়ের উত্তর মুখস্থ করবে? নাকি এমন একটি শিক্ষা চাই, যেখানে সে প্রশ্ন করবে, উত্তর খুঁজবে, ভুল থেকে শিখবে, তথ্য যাচাই করবে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে?


এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থার পথ নির্ধারণ করবে।


নতুন প্রজন্মের হাতে গবেষণার আলো


১১তম চিন্তার চাষ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৩১৮ জন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ এবং ১২৮টি গবেষণাপত্র, ধারণাপত্র ও পোস্টার উপস্থাপন একটি আশাব্যঞ্জক বাস্তবতার কথা বলে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানচর্চা, অনুসন্ধান ও গবেষণার আগ্রহ রয়েছে।


এ আগ্রহকে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক, নীতিনির্ধারক ও গবেষণা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও বেশি গবেষক, উদ্ভাবক ও জ্ঞানসৃষ্টিকারী তরুণ পেতে পারে।


শ্রীমঙ্গলের তিন ক্ষুদে গবেষকের জাতীয় পর্যায়ের চ্যাম্পিয়ন হওয়া তাই কেবল একটি পুরস্কার পাওয়ার গল্প নয়। এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনার গল্প; এটি প্রশ্ন করার সাহসের গল্প; এটি গবেষণার মাধ্যমে নতুন কিছু জানার আকাঙ্ক্ষার গল্প।


আর সবচেয়ে বড় কথা—এটি মনে করিয়ে দেয়, গবেষণার জন্য বয়স বড় কথা নয়; প্রয়োজন কৌতূহল, প্রশ্ন করার সাহস, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সুযোগ।


এই সুযোগ যত বেশি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাবে, ততই শক্তিশালী হবে বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যতের ভিত।

#

সৈয়দ আমিরুজ্জামান, এলএল.বি

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;

বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;

সম্পাদক, আরপি নিউজ;

কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;

‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।

সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।

সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।

প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।

E-mail : syedzaman.62@gmail.com

WhatsApp : 01716599589

মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯

Bikash number : +8801716599589 (personal)


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream