রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ বিস্তারকে এখন আর কেবল একটা বিচ্ছিন্ন ট্রাফিক জ্যাম বা যানবাহনের সংকট হিসেবে দেখার উপায় নেই। এটি একই সঙ্গে সড়কনিরাপত্তা, জনপরিবহন ব্যবস্থা, নগর পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং শহরের এক বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির জটিল সমীকরণ।
সবচেয়ে বড় ভুলটি ঘটে তখন, যখন আমরা অটোরিকশাকে কেবল যানজটের একমাত্র খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করি। কারণ মূল বাস্তবতা হলো—ঢাকার বিদ্যমান গণপরিবহন ব্যবস্থা শহরের বিপুল জনগোষ্ঠীর স্বল্পদূরত্বের যাতায়াতের চাহিদা মেটাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নগর পরিবহনবিষয়ক সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, মূলত দুই কিলোমিটারের ভেতরের যাত্রায় সাধারণ মানুষের কাছে এই ব্যাটারিচালিত রিকশা একরকম অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। দ্রুত পৌঁছানোর সুযোগ এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে যাত্রীদের বড় অংশ এই মাধ্যমটিকে বেছে নিচ্ছেন। এমনকি সরকারি নথিপত্রেও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হতে হচ্ছে যে, নগরের বাস বা মেট্রো নেটওয়ার্কের সঙ্গে মানুষের ঘরের দোরগোড়া যুক্ত করতে, অর্থাৎ ‘লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি’ বা শেষ-মাইল সংযোগ হিসেবে রিকশার ভূমিকা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।
কাজেই, অটোরিকশা সমস্যার সমাধান মানে কেবল রাস্তা থেকে হুট করে এদের তাড়িয়ে দেওয়া কিংবা নিষিদ্ধ করা হতে পারে না। বরং আসল প্রশ্নটি হওয়া উচিত—এই পরিবহনের প্রয়োজনীয় অংশকে কীভাবে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং প্রধান জনপরিবহনের সঙ্গে সমন্বিত ও নিয়ন্ত্রিত করা সম্ভব?
দায় আসলে কার?
কোনো একটা অবৈধ বা অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন যদি বছরের পর বছর রাজধানীর ধমনীতুল্য রাস্তাগুলোতে রাজত্ব করে, দিনে দিনে তার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে, লাখো মানুষ সেটির ওপর ভিত্তি করে পেট চালায়, আর সেটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে মোটর, ব্যাটারি, স্পেয়ার পার্টস আমদানি, সংযোজন, মেরামত ও চার্জিংয়ের শত শত কোটি টাকার বাজার—তাহলে হঠাৎ একদিন রাজপথে নেমে শুধু একজন চুনোপুঁটি চালককে ধরে কেস ঝুলিয়ে দিলে বা গাড়ি উল্টে দিলে সমস্যার সমাধান হয় না।
এখানে রাষ্ট্রের নীতিগত ও প্রশাসনিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আসল গোড়ায় হাত দিতে হলে কয়েকটি শক্ত প্রশ্ন তোলা জরুরি:
কারা এসব অনিরাপদ যান প্রকাশ্যে তৈরি করছে?
হাজার হাজার শক্তিশালী মোটর, ব্যাটারি ও নিম্নমানের যন্ত্রাংশ কোন সীমান্ত দিয়ে বা কোন বন্দরে খালাস হয়ে দেশে আসছে?
শহরের অলিতে-গলিতে গড়ে ওঠা গ্যারেজগুলোতে কারা এসব গাড়ি অবাধে সংযোজন করছে?
ফিটনেস এবং নিরাপত্তা পরীক্ষা ছাড়া এসব ঝুঁকিপূর্ণ যান কীভাবে রাজপথে নেমে আসছে?
কারা গড়ে তুলেছে শত শত অটোরিকশার বিশাল বহর এবং এগুলোর প্রকৃত মালিকই বা কে?
অবৈধ বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের চোখের সামনে কারা এই বিপুল চার্জিং ব্যবসা চালাচ্ছে?
অটোরিকশার নির্দিষ্ট রুট ও চাঁদা তোলার সিন্ডিকেট কারা নিয়ন্ত্রণ করছে?
এই প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর না খুঁজে, নেপথ্যের কুশীলবদের না ধরে কেবল সড়কের ট্রাফিক মোড়ে চালককে লাঠিপেটা করা বা জরিমানা করা মূল সমস্যাকে স্পর্শই করতে পারবে না।
অবশ্য আশার কথা হলো, সরকার সম্প্রতি ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন, ফিটনেস যাচাই, চালকের লাইসেন্স, জোনভিত্তিক চলাচল ও একটি সমন্বিত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দিকে যাওয়ার কিছু নীতিগত উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। নগর ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক শৃঙ্খলা ও সড়কনিরাপত্তাকে সামনে রেখে গঠিত এই নীতিমালার বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি। নীতি যেন কেবল ফাইলে বন্দি না থাকে, তাকে রাস্তায় রূপ দিতে হবে।
নিরাপত্তা: এখানে বিন্দুমাত্র আপসের সুযোগ নেই
ব্যাটারিচালিত রিকশার সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি হলো নিরাপত্তা।
ঢাকার সড়কে কোনো শৃঙ্খলা নেই—এখানে একদিকে বেপরোয়া বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি, অন্যদিকে চালকবিহীন পথচারী ও মোটরসাইকেলের সহাবস্থান। এমন এক চরম বিশৃঙ্খল পরিবেশে যদি কোনো যানবাহনের গতি, ব্রেকিং সক্ষমতা, কাঠামোগত ভারসাম্য বা চালকের কারিগরি দক্ষতা না থাকে, তবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন যে, একটি সাধারণ প্যাডেল রিকশার মূল কাঠামোর ওপর কেবল একটি ব্যাটারি ও মোটর বসিয়ে দিলে সেটির গতি হয়তো বাড়ে, কিন্তু তার হুক, স্পোক এবং ব্রেকিং ব্যবস্থা ওই বাড়তি গতির ধাক্কা সামলানোর জন্য তৈরি নয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার বাহন জড়িত দুর্ঘটনার বড় অংশই ঘটে উল্টে গিয়ে বা ব্রেক করতে না পেরে সংঘর্ষের কারণে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মারাত্মক শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়।
আরও আশঙ্কাজনক হলো চালকদের পূর্বঅভিজ্ঞতা ও দক্ষতার অভাব। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার অটোরিকশাচালকদের বড় অংশই এই পেশায় একদম নতুন। আগে কখনো সাধারণ প্যাডেল রিকশা চালানোর অভিজ্ঞতাও তাঁদের ছিল না। গ্রামীণ অর্থনীতি বা অন্য পেশা থেকে আসা একজন ব্যক্তি যখন কোনো ট্রাফিক জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ ছাড়া সরাসরি মোটরচালিত যানের হ্যান্ডেল ধরেন, তখন তিনি নিজের পাশাপাশি অন্যের জীবনকেও চরম ঝুঁকিতে ফেলে দেন।
এই জায়গায় রাষ্ট্রকে কঠোর ও স্পষ্ট নীতি গ্রহণ করতে হবে:
১. লাইসেন্স ছাড়া কোনো চালক রাস্তায় নামবেন না। ২. প্রশিক্ষণ ছাড়া কাউকেই লাইসেন্স দেওয়া হবে না। ৩. অনুমোদিত ফিটনেস ও নিরাপদ কাঠামো ছাড়া যান নামানো যাবে না। ৪. পরীক্ষিত ও আধুনিক ব্রেকিং ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক।
এই চার শর্তে কোনো রাজনৈতিক তোষণ, স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাপ বা সামাজিক অজুহাতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া যাবে না। কারণ দিনশেষে এটি শুধুই চালকের বিষয় নয়; রাস্তায় থাকা সাধারণ যাত্রী, পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের আরোহীদের জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
একজন যাত্রীর নিরাপত্তার মূল্য কত?
অটোরিকশার সবচেয়ে বড় জনপ্রিয়তা এসেছে তার সহজলভ্যতা থেকে। মেট্রো স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ডে নেমে কিংবা কাঁচাবাজারের সামনে দাঁড়িয়েই হুট করে একটি অটোরিকশা পাওয়া যায়, যা একদম গলির ভেতর দরজার সামনে পৌঁছে দেয়।
কিন্তু এই সামান্য সুবিধার বিনিময়ে যাত্রীদেরকে প্রতিদিন মৃত্যুকূপে ঠেলে দেওয়া যায় না। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় চলাচলকারী যাত্রীদের এক বড় অংশই কোনো না কোনো ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বা অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন, যা সাধারণ প্যাডেল রিকশার তুলনায় অনেক বেশি। দ্রুত গতি, চালকের অনভিজ্ঞতা, ওভারটেক করার প্রবণতা এবং যানবাহনের দুর্বল কাঠামোর কারণেই এসব ঘটে।
তাই বিষয়টি কেবল যানজটের নয়, এটি নাগরিক অধিকার ও জননিরাপত্তার মৌলিক বিষয়। একজন যাত্রী যখন পকেটের টাকা খরচ করে ভাড়ায় চালিত যানে ওঠেন, তখন ন্যূনতম নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর অধিকার তাঁর সংবিধিবদ্ধ।
একটি নিয়ন্ত্রিত ও আধুনিক ই-রিকশা ব্যবস্থার মধ্যে যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য যা থাকা জরুরি:
সুনির্দিষ্ট ও নির্ধারিত আসনসংখ্যা (যাত্রী ধারণক্ষমতা)।
যান্ত্রিকভাবে পরীক্ষিত ও কার্যকর ব্রেকিং এবং ব্যালেন্সিং সিস্টেম।
গতিসীমা নিয়ন্ত্রক (স্পিড গভর্নর) প্রযুক্তি।
রাতে চলাচলের জন্য হেডলাইট, ইন্ডিকেটর ও ব্যাকলাইট।
মানসম্মত ব্যাটারি ও নিরাপদ বৈদ্যুতিক ওয়ারিং।
চালকের দৃশ্যমান পরিচয়পত্র ও কিউআর কোড।
প্রতিটি বাহনের দৃশ্যমান ইউনিক রেজিস্ট্রেশন নম্বর।
কোনো অন্যায় বা হয়রানির শিকার হলে তাৎক্ষণিক অভিযোগ করার জন্য হটলাইন।
দুর্ঘটনা ঘটলে যাত্রী ও চালকের ক্ষতিপূরণ ও দায় নির্ধারণের আইনি কাঠামো।
সহজ কথায়, অটোরিকশাকে কোনো 'অনানুষ্ঠানিক ও অভিভাবকহীন বাহন' হিসেবে না রেখে একটি জবাবদিহিমূলক নগর পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।
জনপরিবহনের বিশাল ঘাটতিই অটোরিকশার জন্ম দিয়েছে
ঢাকার পরিবহন সংকটকে যদি কেবল অটোরিকশার ওপর চাপিয়ে আমরা খালাস পেতে চাই, তবে সমস্যার গোড়ায় পৌঁছানো যাবে না।
মেগাসিটি ঢাকার বিশাল জনগোষ্ঠীকে সার্ভিস দেওয়ার মতো সময়নিষ্ঠ, সাশ্রয়ী, আরামদায়ক ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি। ফলে বাস সার্ভিসের নৈরাজ্য, নির্দিষ্ট বাসস্টপ না থাকা এবং মেট্রোর সীমিত রুটের কারণে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেখানেই অটোরিকশা নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
সরকারের নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত কৌশলগত দলিলেও স্বীকার করা হয়েছে যে, বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে রিকশা বা অটোরিকশা উঠিয়ে দেওয়া সামাজিকভাবে যেমন গ্রহণযোগ্য হবে না, তেমনি শহরের মানুষের স্বাভাবিক চলাচলকে স্থবির করে দেবে।
তাই সমাধান হতে হবে গণপরিবহনকে ধ্বংস করে নয়, বরং গণপরিবহনের মূল কাঠামোর সঙ্গে অটোরিকশাকে বুদ্ধিদীপ্তভাবে সমন্বিত করে।
বাস ও মেট্রোর প্রতিযোগী নয়, সহযোগী
অটোরিকশাকে কখনোই প্রধান সড়কের মূল গণপরিবহন হিসেবে চিন্তা করা ভুল। একটি সুস্থ নগর পরিকল্পনায় যাত্রী পরিবহনের স্তরবিন্যাস বা 'ট্রান্সপোর্ট হায়ারার্কি' থাকা উচিত:
[দীর্ঘ দূরত্ব] ➔ মেট্রোরেল ও বিআরটি / নগর বাস
[মাঝারি দূরত্ব] ➔ নির্ধারিত রুটের আধুনিক বাস
[স্বল্প দূরত্ব] ➔ নির্ধারিত জোনভিত্তিক ই-রিকশা বা রিকশা
[শেষ-মাইল সংযোগ] ➔ মেট্রো/বাস স্টেশন থেকে আবাসিক এলাকার অলিগলি
যদি অটোরিকশাকে মূল সড়ক দখল করতে না দিয়ে মেট্রো স্টেশন, ট্রেন স্টেশন বা বাস টার্মিনাল থেকে পাড়া-মহল্লার গলিতে চলাচলের সংযোগকারী বাহন হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবে এটি নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থার জন্য অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হতে পারে।
সরকারের সাম্প্রতিক চিন্তাভাবনায়ও এই বিষয়টি স্থান পাচ্ছে—যেখানে প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কেবল অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে নিবন্ধিত ও সুনির্দিষ্ট জোনভিত্তিক ই-রিকশা চালানোর কথা বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে জিওফেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে রিকশাগুলো যেন নির্ধারিত জোন ছেড়ে মূল সড়কে বা হাইওয়েতে উঠতে না পারে, সেই ব্যবস্থার কথাও ভাবা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই মূল বিষয়।
মূল সড়ক দখল করলে ক্ষতি শুধু যানজটের নয়
একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা যখন কোনো সিগন্যাল না মেনে হঠাৎ প্রধান ভিআইপি সড়কে উঠে পড়ে, উল্টো পথে চলতে শুরু করে কিংবা বাসের সামনে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়—তখন ক্ষতিটি কেবল ওই একটি মোড়ের যানজটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এর ধাক্কায় পেছনের সারিবদ্ধ বাসের গতি থেমে যায়, দ্রুতগতির মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কার চালক দুর্ঘটনার মুখোমুখি হন, আর পথচারীদের পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মোড়ের সামান্য একটা বাধা পুরো সড়কের কয়েক কিলোমিটার জুড়ে ট্রাফিক জ্যামের শৃঙ্খল তৈরি করে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় গণপরিবহনের ওপর মানুষের আস্থার। অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে বাস যদি নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারে, তবে মানুষ বাসে ওঠার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বাধ্য হয়ে যাঁরা পারেন তাঁরা ব্যক্তিগত গাড়ি বা রাইড শেয়ারিংয়ের দিকে ছোটেন, যা রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা এবং যানজট আরও বাড়িয়ে দেয়।
সুতরাং, অটোরিকশাকে মূল সড়ক থেকে সরিয়ে রাখা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মূল গণপরিবহনকে সচল রাখার পূর্বশর্ত।
বিকল্প না বানিয়ে উচ্ছেদ করলে সমস্যা আবার ফিরবে
আমরা অতীতেও দেখেছি—হুট করে নির্দেশ জারি করে মূল সড়ক থেকে রিকশা তুলে দেওয়া হয়, কয়েকদিন পুলিশি অভিযান চলে, আর তার কিছুদিন পর সব আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে।
কেন এমন হয়? কারণ, নগরবাসীকে বিকল্প যাতায়াত মাধ্যম না দিয়ে কেবল পেটুয়া বাহিনী বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থা চালানো যায় না।
অটোরিকশা বন্ধ করার আগে কিংবা মূল সড়ক থেকে সরানোর আগে নিশ্চিত করতে হবে—
সাধারণ মানুষ কি গন্তব্যে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত বাস পাচ্ছেন?
নির্ধারিত দূরত্বের ভেতর হাঁটার মতো নিরাপদ ও দখলমুক্ত ফুটপাত আছে কি?
ফিডার রোড বা গলির মুখ থেকে প্রধান সড়কে আসার মতো কোনো বৈধ ও সুসংগঠিত শাটল ব্যবস্থা রাখা হয়েছে কি?
যদি এই উত্তরগুলো 'না' হয়, তবে অটোরিকশার সমাগম ঠেকানো যাবে না। মানুষের চলাচলের চাহিদা নদীজলের মতো—সোজা পথ বন্ধ করলে সে অন্য আঁকাবাঁকা পথে বের হবেই। তাই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের নীতি এবং গণপরিবহন বাড়ানোর নীতিকে দুটি ভিন্ন খাত না ভেবে একই পরিকল্পনার অংশ বানাতে হবে।
চালকের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা
যে কোনো টেকসই পরিবহন সংস্কারে চালকদের জীবনযাত্রার দিকটি বিবেচনায় রাখা অত্যাবশ্যক।
একজন চালক প্রতিদিন জমানো টাকায় ব্যাটারি চার্জ দেন, গ্যারেজ মালিককে দৈনিক জমার টাকা দেন, এনজিও বা দাদানের কিস্তি শোধ করেন—তারপর দিনশেষে যা থাকে, তা নিয়ে ঘরে ফেরেন। হঠাৎ করে কোনো প্রকার সামাজিক সুরক্ষা বা বিকল্প ব্যবস্থা না করে তাঁর আয়ের একমাত্র মাধ্যমটি কেড়ে নিলে একটি পরিবার সরাসরি অনাহারে পড়বে।
অনেকে মনে করেন অটোরিকশাচালকরা অনেক টাকা আয় করেন। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চমাত্রার দৈনিক জমা, ব্যাটারি ক্ষয়, চড়া দামে বিদ্যুৎ চার্জিং এবং পথে পথে চাঁদাবাজির কারণে চালকের হাতে দিনশেষে খুব সামান্য অর্থই অবশিষ্ট থাকে।
তাই সরকারকে চালক-নিবন্ধন এবং যান-নিবন্ধনকে আলাদা কাঠামোয় আনতে হবে:
প্রকৃত চালককে সরাসরি লাইসেন্স ও ডাটাবেজের আওতায় আনতে হবে।
একজন বেनामी মালিকের অধীনে শত শত অটোরিকশা থাকার সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে।
গ্যারেজ মালিকদের দৈনিক জমার হার নির্দিষ্ট করে দিতে হবে, যাতে চালক শোষিত না হন।
চালকদের জন্য চিকিৎসা ও দুর্ঘটনাজনিত সামাজিক বীমা বা কল্যাণ তহবিল গঠন করতে হবে।
যেকোনো মানবিক ও সভ্য রাষ্ট্রে শ্রমিকের অধিকার সুসংগঠিত করা ছাড়া পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা আনা অসম্ভব।
সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে রক্তের বদলে অর্থের পথ অনুসরণ করতে হবে
ঢাকার রাজপথে অটোরিকশার যে অবাধ রাজত্ব, তার পেছনে রয়েছে এক বিশাল অদৃশ্য অর্থপ্রবাহ ও শক্তিশালী ক্ষমতার বলয়। কেবল রাজপথে চালককে ধরে এই অদৃশ্য দৈত্যকে পরাস্ত করা যাবে না।
যদি সত্যিই সরকার এই নৈরাজ্য বন্ধ করতে চায়, তবে ফাইন্যান্সিয়াল ট্রেইল বা অর্থের উৎস সন্ধান করতে হবে:
বিদেশ থেকে কোন আমদানিকারকরা নিম্নমানের পার্টস ও মোটর আনছেন?
কোন কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক বা স্থানীয় নেতা গ্যারেজগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছেন?
প্রতিদিন রিকশাপ্রতি যে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা ওঠে, সেই বিশাল অঙ্কের টাকা কাদের পকেটে যাচ্ছে?
অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের সুবিধা দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ভেতরের কোন গোষ্ঠী নিজেদের পকেট ভারী করছে?
স্বচ্ছ রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংকিং লেনদেন ও ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমেই কেবল এই অবৈধ টাকার বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব। প্রভাবশালী মালিকদের করের আওতায় আনা এবং অবৈধ চাঁদা তোলার সিন্ডিকেট উচ্ছেদ করতে না পারলে রাজপথের এই নৈরাজ্য চিরকাল বহাল থাকবে।
সুনির্দিষ্ট আট দফা রোডম্যাপ
বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সামনে এখন সুনির্দিষ্ট কিছু অগ্রাধিকার থাকা জরুরি:
১. কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড: প্রতিটি অনুমোদিত ই-রিকশার ব্রেকিং, বডি ব্যালেন্স, ব্যাটারি ও মোটর নিরাপত্তা ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে সার্টিফাইড করতে হবে। ২. চালক প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল লাইসেন্সিং: সড়ক আইন ও ট্রাফিক ট্রেইনিং ছাড়া কাউকেই চালকের আসনে বসার অনুমতি দেওয়া যাবে না। ৩. করিডোর সুরক্ষা: জাতীয় মহাসড়ক ও নগরীর প্রধান আর্টেরিয়াল রোডগুলোতে অটোরিকশা চলাচল শতভাগ নিষিদ্ধ করতে হবে। ৪. জোনভিত্তিক ডিজিটাল জিওফেন্সিং: এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট রঙের ই-রিকশা থাকবে, যা নিজ জোন ছেড়ে অন্য জোনে যেতে পারবে না। ৫. মাল্টিমোডাল হাব ও স্ট্যান্ড: মেট্রো ও বাস স্টেশনের সাথে সমন্বিত ই-রিকশা স্ট্যান্ড রাখতে হবে, যাতে রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলার অভ্যাস বন্ধ হয়। ৬. মালিকানা ও সিন্ডিকেট বিরোধী তদন্ত: বেনামী রিকশা বহরের প্রকৃত মালিকদের চিহ্নিত করে কর ও অর্থ খাতের আওতায় আনতে হবে। ৭. বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনঃপ্রশিক্ষণ: অতিরিক্ত বা অনুপযোগী রিকশা হঠানোর প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত চালকদের কারিগরি প্রশিক্ষণ বা বিকল্প কাজের সুযোগ দিতে হবে। ৮. গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার: বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ত্বরান্বিত করা, বাসের সংখ্যা বাড়ানো এবং হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
‘রিকশা বনাম জনপরিবহন’ এই ভুল বিতর্ক বন্ধ হোক
আমাদের নীতি নির্ধারকদের একটি ভুল ধারণা ভাঙা দরকার—অটোরিকশা এবং আধুনিক গণপরিবহন একে অপরের শত্রু নয়।
একদিকে অটোরিকশাকে শত্রু ভেবে চোখ বন্ধ করে তাড়িয়ে দেওয়ার চিন্তা যেমন অবাস্তব, তেমনি অটোরিকশার এই বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিত রূপ শহরের জন্য ক্ষতিকর নয়—এমন দাবিও চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
অটোরিকশা নগরবাসীর যাতায়াতের একটি বাস্তব প্রয়োজন থেকে জন্ম নিয়েছে। কিন্তু সঠিক অভিভাবকত্ব না পাওয়ায় এটি আজ দানবে পরিণত হয়েছে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত এটাকে ধ্বংস করা নয়, একে শৃঙ্খলায় আনা।
কোন রাস্তায় অটোরিকশা চলবে না—সেটা যেমন স্পষ্ট করতে হবে, তেমনি কোন রাস্তায় স্বাচ্ছন্দ্যে চলবে—তাও ঠিক করে দিতে হবে। কতগুলো রিকশা একটি শহরের জন্য প্রয়োজন—তার সুনির্দিষ্ট হিসাব থাকতে হবে। ভাড়ার তালিকা ঝুলতে হবে, চালকের সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা
ঢাকার আড়াই কোটি মানুষ প্রতিদিন রাজপথে নামেন কেবল একটু শান্তিতে, নিরাপদে এবং নির্দিষ্ট সময়ে নিজের কর্মস্থলে বা স্বজনদের কাছে পৌঁছানোর আশায়।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সেই সাধারণ মানুষের স্বল্পদূরত্বের যাতায়াতের একটা বড় ভরসা হয়ে উঠেছে সত্য, কিন্তু ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অনভিজ্ঞ চালক আর অদৃশ্য সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি এই ব্যবস্থা কখনোই একটি আধুনিক মেগাসিটির স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনো সামাজিক বাস্তবতাকে মুছে ফেলা যায় না, প্রয়োজন 'নিয়ন্ত্রিত ও আধুনিক রূপান্তর'।
প্রধান সড়ক থাকবে দ্রুতগতির বাস ও মেট্রোরেলের জন্য। পাড়ার অলিগলি ও সংযোগ সড়কে থাকবে নিবন্ধিত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ই-রিকশা। প্রতিটি যান হবে পরীক্ষিত, প্রতিটি চালক হবেন প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত, আর প্রতিটি মালিকানা হবে স্বচ্ছ।
নিরাপদ সড়ক কেবল পথ থেকে গাড়ি কমিয়ে তৈরি করা যায় না; বরং সঠিক যান, প্রশিক্ষিত চালক, সুনির্দিষ্ট রুট ও সুসংগঠিত গণপরিবহন কাঠামোর সম্মিলিত প্রয়াসেই একটি সচল ও নিরাপদ ঢাকা গড়ে তোলা সম্ভব। সরকার কি পারবে এই সাহসী ও সমন্বিত সংস্কারের দিকে এগোতে? নগরবাসীর চোখ এখন সেদিকেই।
প্রফেসর ডক্টর দিপু সিদ্দিকী
অধ্যাপক, কবি ও প্রাবন্ধিক
ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ
রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলা এফএমের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
মতামত