বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি ক্রমেই একটি গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো সড়কে ঝরে যাচ্ছে মানুষের প্রাণ। কোনো পরিবার হারাচ্ছে উপার্জনক্ষম সদস্য, কোনো শিশু হারাচ্ছে তার বাবা-মাকে, কোনো মা-বাবার বুক খালি হয়ে যাচ্ছে সন্তানের অকালমৃত্যুতে। দুর্ঘটনার পর কয়েকদিন সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হলেও কিছুদিন পর সেই ঘটনা হারিয়ে যায় নতুন কোনো দুর্ঘটনার খবরের আড়ালে। অথচ এই মৃত্যুগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্বল তদারকি, অদক্ষতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি এবং আইন প্রয়োগের ঘাটতি।
সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান সেই নির্মম বাস্তবতারই আরেকটি ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী এবং ৬১ জন শিশু। অর্থাৎ, দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ এমন মানুষ, যারা নিজেরা হয়তো যানবাহন চালাচ্ছিলেন না; তারা ছিলেন সাধারণ পথচারী, যাত্রী কিংবা শিশু।
শুধু সড়ক দুর্ঘটনা নয়, একই সময়ে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ৭ জন আহত এবং ৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন। এছাড়া ২৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ সড়ক, নৌ ও রেল—তিন ক্ষেত্রেই নিরাপত্তার ঘাটতি আমাদের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
প্রতিদিন গড়ে ১৪টি প্রাণ ঝরে যাচ্ছে
সেপ্টেম্বর মাসের হিসাব বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। একটি দেশের জন্য এটি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রতিদিন ১৪টি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার হিসাব।
নিহতের তালিকায় রয়েছে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, পুলিশ ও সেনা সদস্য, ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা-কর্মচারী, এনজিও কর্মী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, শিক্ষার্থীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৫৮ জন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। শিক্ষক নিহত হয়েছেন ১৩ জন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ২৪ জন, স্থানীয় ব্যবসায়ী ২৫ জন, ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর বিক্রয় প্রতিনিধি ২১ জন এবং এনজিও কর্মী ১৮ জন।
অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা পেশার মানুষের সমস্যা নয়। এটি সর্বজনীন নাগরিক নিরাপত্তার সংকট।
মোটরসাইকেল: স্বাধীনতার বাহন, নাকি মৃত্যুফাঁদ?
বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল। সেপ্টেম্বর মাসে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন, যা মোট নিহতের ৩২.৮৬ শতাংশ। দুর্ঘটনার মোট সংখ্যার মধ্যেও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৪.৮৪ শতাংশ।
এ পরিসংখ্যান আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। দ্রুতগতির মোটরসাইকেল তরুণদের কাছে সহজ, সাশ্রয়ী ও সময় বাঁচানোর বাহন হলেও নিরাপত্তাহীন ব্যবহার এটিকে প্রাণঘাতী করে তুলছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা, হেলমেট না পরা, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের মতো আচরণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে কেবল অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। লাইসেন্স প্রদানের আগে চালকের দক্ষতা যাচাই, গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং তরুণদের মধ্যে নিরাপদ ড্রাইভিং সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
পথচারীও কেন নিরাপদ নন?
সেপ্টেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৫.০৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি চারজন নিহতের প্রায় একজন পথচারী।
একজন নাগরিক রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক সড়কে একজন পথচারীর নিরাপদে হাঁটার ন্যূনতম সুযোগও নেই। ফুটপাত দখল, ফুটওভারব্রিজের অপ্রতুলতা, অপরিকল্পিত ইউটার্ন, অনিরাপদ রাস্তা পারাপার, দ্রুতগতির যানবাহন এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পথচারীদের জীবনকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
পথচারীদের অসচেতনতাও দুর্ঘটনার একটি কারণ। কিন্তু কেবল পথচারীকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। একটি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থায় পথচারীর ভুলের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রেখে অবকাঠামো তৈরি করতে হয়। রাস্তার নকশা এমন হতে হবে, যাতে একজন সাধারণ মানুষ ভুল করলেও তার প্রাণহানি না ঘটে।
নিয়ন্ত্রণ হারানোই বড় বিপদ
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। সেপ্টেম্বর মাসে ১৬৮টি দুর্ঘটনা, অর্থাৎ ৩৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। ১০৯টি দুর্ঘটনায় পথচারী চাপা বা ধাক্কায় নিহত হয়েছেন। ৯৮টি ছিল মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং ৬১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে অন্য যানবাহনের পেছনে আঘাতের কারণে।
নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত গতি অন্যতম। চালক যখন যানবাহনের নিয়ন্ত্রণের সীমার বাইরে গিয়ে গতি বাড়ান, তখন সামান্য ভুলও বড় দুর্ঘটনায় রূপ নেয়। তাই শুধু চালককে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
স্পিড ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, ডিজিটাল ট্রাফিক মনিটরিং এবং ডেটাভিত্তিক আইন প্রয়োগ—এসব প্রযুক্তি এখন আর বিলাসিতা নয়; নিরাপদ সড়কের অপরিহার্য উপাদান।
কোন সড়কে বেশি দুর্ঘটনা?
দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণও গুরুত্বপূর্ণ। সেপ্টেম্বর মাসে ১৪৫টি দুর্ঘটনা জাতীয় মহাসড়কে, ১৭৮টি আঞ্চলিক সড়কে, ৫৬টি গ্রামীণ সড়কে এবং ৬৩টি শহরের সড়কে ঘটেছে।
অর্থাৎ শুধু জাতীয় মহাসড়ক নয়, আঞ্চলিক ও শহরের সড়কও নিরাপত্তার দিক থেকে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। আঞ্চলিক সড়কে বড় যানবাহনের সঙ্গে ছোট ও ধীরগতির যানবাহনের একই পথে চলাচল, অপরিকল্পিত বাজার, রাস্তার পাশে দোকানপাট, অবৈধ পার্কিং এবং পর্যাপ্ত সড়ক নিরাপত্তা অবকাঠামোর অভাব দুর্ঘটনা বাড়িয়ে তুলছে।
বিশেষ করে মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। মহাসড়কের মূল লেনের সঙ্গে ধীরগতির যানবাহন চলাচল করলে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে। তাই যেখানে সম্ভব, সার্ভিস রোড নির্মাণ করে ছোট ও স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য পৃথক চলাচল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চালকের দক্ষতা ও কর্মপরিবেশ
সড়ক দুর্ঘটনার জন্য প্রায়ই চালককে এককভাবে দায়ী করা হয়। কিন্তু একজন চালক কেন বেপরোয়া গাড়ি চালান—এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, কম বেতন, অনির্দিষ্ট কর্মপরিধি, মালিকের চাপ, সময়মতো ট্রিপ শেষ করার প্রতিযোগিতা এবং শারীরিক-মানসিক ক্লান্তি একজন চালকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
দক্ষ চালক তৈরির পাশাপাশি তাদের জন্য নির্দিষ্ট বেতন, কর্মঘণ্টা, বিশ্রামের সময় এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। চালককে কেবল শ্রমিক হিসেবে নয়, একজন পেশাদার নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
চালকের প্রশিক্ষণও হতে হবে আধুনিক ও বাস্তবভিত্তিক। শুধু গাড়ি চালানো শেখানো যথেষ্ট নয়; জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, প্রতিকূল আবহাওয়ায় গাড়ি চালনা, পথচারী ও সাইকেল আরোহীর নিরাপত্তা, প্রতিরোধমূলক ড্রাইভিং এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।
যানবাহনের ফিটনেস ও সড়কের নকশা
দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন। মেয়াদোত্তীর্ণ ও যান্ত্রিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে প্রত্যাহার করা জরুরি। একই সঙ্গে ফিটনেস সনদ প্রদানের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, ডিজিটাল ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
সড়কও নিরাপদ হতে হবে। শুধু পিচঢালা রাস্তা নির্মাণ করলেই নিরাপদ সড়ক তৈরি হয় না। সড়কে ডিভাইডার, পর্যাপ্ত আলো, সঠিক সাইন-সিগন্যাল, জেব্রা ক্রসিং, ফুটপাত, নিরাপদ ইউটার্ন, গার্ডরেল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সার্ভিস রোড থাকতে হবে।
বিশেষ করে জাতীয় ও আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে রোড সেফটি অডিট বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। কোথায় বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, কেন ঘটছে এবং কী ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন করলে দুর্ঘটনা কমবে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিভাগভিত্তিক চিত্রও উদ্বেগজনক
সেপ্টেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এখানে ১৩২টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৪ জন। দুর্ঘটনার হার ২৯.৮৬ শতাংশ এবং প্রাণহানির হার ৩১.৬৭ শতাংশ।
চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭.৮৭ শতাংশ এবং প্রাণহানি ১৭.৭৩ শতাংশ। খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭.৪২ শতাংশ এবং প্রাণহানি ১৪.৪২ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১২.২১ শতাংশ এবং প্রাণহানি ১০.৮৭ শতাংশ। ময়মনসিংহ, রংপুর, বরিশাল ও সিলেট বিভাগেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
একক জেলা হিসেবে গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি—৩৮ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৫২টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়, দুর্ঘটনার ঘনত্ব, স্থান, সময়, যানবাহনের ধরন এবং কারণভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে অঞ্চলভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
নিরাপদ সড়কের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি
সড়ক নিরাপত্তা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (BRTC), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (DTCA), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এতগুলো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থাকলেও সমন্বিত উদ্যোগের অভাব প্রায়ই চোখে পড়ে। তাই জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলকে কার্যকর ও শক্তিশালী করে তার অধীনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়ের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
BRTA-এর সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো বিশেষভাবে জরুরি। লাইসেন্স প্রদান, গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা, রুট পারমিট এবং চালকের দক্ষতা যাচাই—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটালাইজেশন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রুট রেশনালাইজেশন ও গণপরিবহনের সংস্কার
ঢাকার যানজট, বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা। একই রুটে অসংখ্য বাস, প্রতিযোগিতামূলকভাবে যাত্রী ওঠানো, যেখানে-সেখানে থামানো এবং চালকদের মধ্যে ট্রিপের প্রতিযোগিতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা জরুরি। একই সঙ্গে BRTC-এর বাসের সংখ্যা বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
মানুষ যখন নিরাপদ, দ্রুত, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন পাবে, তখন ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
রেল ও নৌপথকে গুরুত্ব দিতে হবে
সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বড় অংশ সড়কনির্ভর। অথচ রেল ও নৌপথের সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
রেলপথের উন্নয়ন, নিরাপদ লেভেল ক্রসিং, গেটকিপার নিয়োগ এবং আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইভাবে নৌপথে নিরাপত্তা বিধি, নৌযানের ফিটনেস, যাত্রী ধারণক্ষমতা এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত সতর্কতা কঠোরভাবে মানতে হবে।
সড়ক, রেল ও নৌপথকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শিক্ষা থেকেই শুরু হোক সড়ক নিরাপত্তা
সড়ক নিরাপত্তা কেবল চালকদের শেখালে হবে না। পথচারী, যাত্রী, শিক্ষার্থী—সবাইকে সড়ক ব্যবহারের মৌলিক নিয়ম জানতে হবে।
দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বয়সভিত্তিক সড়ক নিরাপত্তা ও গাড়ি চালনার প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা যেতে পারে। ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক সিগন্যাল, পথচারী নিরাপত্তা, হেলমেট ও সিটবেল্টের প্রয়োজনীয়তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব।
একটি দেশের নাগরিকদের মধ্যে আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে শুধু আইন করে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা কঠিন।
আইন সবার জন্য সমান হতে হবে
সড়ক পরিবহন আইন আছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—আইন কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে?
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি যেন তার রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা আর্থিক ক্ষমতার কারণে বিশেষ সুবিধা না পান। চালক, মালিক, যাত্রী, পথচারী—সবার জন্য আইন সমান হতে হবে।
একই সঙ্গে পুলিশ ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। ডিজিটাল মামলা, ই-চালান, ক্যামেরাভিত্তিক আইন প্রয়োগ এবং স্বয়ংক্রিয় জরিমানার ব্যবস্থা চালু ও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
চাঁদাবাজি বন্ধ করাও সড়ক নিরাপত্তার অংশ
গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যখন একজন পরিবহন মালিক বা চালকের ওপর বিভিন্ন ধরনের অবৈধ আর্থিক চাপ থাকে, তখন তার প্রভাব পড়ে পরিচালন ব্যবস্থায়। যাত্রী পরিবহনে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা, নির্দিষ্ট সময়ে বেশি ট্রিপ দেওয়ার চাপ এবং যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ, স্বচ্ছ অর্থনৈতিক কাঠামো এবং নিয়মতান্ত্রিক পরিচালনা নিশ্চিত করা জরুরি।
দুর্ঘটনা কমাতে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সেল গঠন
সড়ক দুর্ঘটনা মোকাবিলায় একটি কার্যকর জাতীয় মনিটরিং ব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রশাসন, পুলিশ, BRTA, সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি সক্রিয় সড়ক নিরাপত্তা সেল গঠন করা যেতে পারে।
একইভাবে প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় এমন সেল থাকতে পারে। এই সেল দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, কারণ বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সুপারিশ এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে।
শুধু দুর্ঘটনা ঘটার পর তদন্ত নয়; দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
গণমাধ্যমের ভূমিকা
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে গণমাধ্যমের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনার সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ, দায়, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান এবং প্রতিরোধের উপায় নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বাড়াতে হবে।
সরকারি উদ্যোগে টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো যেতে পারে। বিশেষ করে তরুণ মোটরসাইকেল চালক, পেশাদার চালক, শিক্ষার্থী ও পথচারীদের লক্ষ্য করে আলাদা প্রচারণা প্রয়োজন।
শুধু স্লোগানে নয়, বাস্তব পদক্ষেপে নিরাপদ সড়ক
‘নিরাপদ সড়ক চাই’—এটি শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্ন। একজন নাগরিক রাস্তা ব্যবহার করবেন এবং নিরাপদে ঘরে ফিরবেন—এটুকু নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনা হয়তো বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নয়, কিন্তু দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশ প্রযুক্তি, নিরাপদ সড়ক নকশা, কঠোর আইন প্রয়োগ, দক্ষ চালক তৈরি এবং উন্নত গণপরিবহনের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
বাংলাদেশকেও সেই পথ অনুসরণ করতে হবে।
প্রথমত, বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালকের প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিবেশের উন্নয়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, ত্রুটিপূর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে সরাতে হবে। চতুর্থত, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে পুনর্নির্মাণ করতে হবে। পঞ্চমত, পথচারীর নিরাপত্তাকে সড়ক পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। ষষ্ঠত, BRTA-সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। সপ্তমত, রেল ও নৌপথের উন্নয়নের মাধ্যমে সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আইনের প্রয়োগে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।
রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট
সড়ক নিরাপত্তার জন্য নীতিমালা রয়েছে, আইন রয়েছে, সরকারি সংস্থা রয়েছে, বাজেটও রয়েছে। তারপরও যদি দুর্ঘটনা কমে না, তাহলে সমস্যাটি শুধু নীতির অভাব নয়; বরং বাস্তবায়নের ঘাটতি।
তাই প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পরিবহন খাতের অনিয়ম, প্রভাবশালী মহলের চাপ, চাঁদাবাজি, লাইসেন্স ও ফিটনেসে অনিয়ম, আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক বা সামাজিক হস্তক্ষেপ—এসব বন্ধ করতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তাকে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু নতুন সড়ক নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সেই সড়কে মানুষ কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারছে, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
সেপ্টেম্বর মাসে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন মানুষের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কিন্তু আমরা যদি প্রতি মাসে নতুন পরিসংখ্যান প্রকাশের পর কিছুদিন আলোচনা করে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাই, তাহলে এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না।
প্রয়োজন এখন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা। প্রশাসন, পুলিশ, BRTA, সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সড়কে প্রতিটি প্রাণ মূল্যবান। একটি দুর্ঘটনা মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্ন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎও জড়িয়ে থাকে। তাই সড়ক দুর্ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’ হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে এটিকে প্রতিরোধযোগ্য জননিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখতে হবে।
আজ যদি আমরা কার্যকর পদক্ষেপ না নিই, আগামীকাল এই পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ হবে। আর যদি এখনই প্রযুক্তি, দক্ষতা, অবকাঠামো, আইন ও জনসচেতনতার সমন্বয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করি, তাহলে নিরাপদ সড়ক কেবল স্লোগান থাকবে না—বাস্তবতাও হয়ে উঠতে পারে।
সড়কে মানুষের মৃত্যু নিয়তি নয়; সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে এই মৃত্যুর মিছিল অনেকটাই থামানো সম্ভব। এখন প্রয়োজন কথার নয়, কার্যকর পদক্ষেপের।
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান, এলএল.বি
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯
Bikash number : +8801716599589 (personal)
মতামত