মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা



কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

শিশুর নিরাপদ শৈশব তার মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে এখনও বহু কন্যাশিশু জন্মের পর থেকেই নানা ধরনের বৈষম্য, সহিংসতা, নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, যৌন হয়রানি, অনলাইন নিপীড়ন এবং শিক্ষাবঞ্চনার ঝুঁকিতে বেড়ে ওঠে। একটি কন্যাশিশুকে নিরাপদ পরিবেশে বড় করে তোলা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, এর সঙ্গে রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সর্বোপরি সমাজের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব জড়িত। তাই কন্যাশিশুর সুরক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক ইস্যু নয়, এটি একটি দেশের মানবিকতা, আইনের শাসন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইন, নীতিমালা ও সরকারি কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু আইন ও নীতির উপস্থিতির সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এখনও যে ব্যবধান রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা MICS-এর তথ্য এ বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথভাবে পরিচালিত এই জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত। একই জরিপে দেখা যায়, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ গত এক মাসে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের অভিজ্ঞতা পেয়েছে।

পরিসংখ্যান শুধু কিছু সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর জীবন, একটি পরিবারের গল্প এবং একটি অপূর্ণ সম্ভাবনা। বাল্যবিবাহের ফলে একটি কন্যাশিশু শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে, অল্প বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকিতে পড়ে, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে যায় এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়ে। ইউনিসেফ বলছে, বাল্যবিবাহের সঙ্গে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, অপুষ্টি, গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ঘরের ভেতর সহিংসতার ঝুঁকি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের কন্যাশিশুর সুরক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বাল্যবিবাহ। আইন থাকা সত্ত্বেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণে এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। দরিদ্রতা, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ, কন্যাশিশুকে পরিবারের বোঝা হিসেবে দেখার মানসিকতা, যৌতুকের ভয় এবং ‘মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেওয়া’কে সামাজিক নিরাপত্তার উপায় মনে করার প্রবণতা এখনও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে। অথচ একটি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না বরং তার শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, আত্মনির্ভরতা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব আরও বড় হয়ে ওঠে।

কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী অপরিচিত কেউ নয়। যে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বা পরিচিত পরিবেশকে একটি শিশু নিরাপদ মনে করে, সেখানেও নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশুরা সহিংসতা, নির্যাতন ও শোষণের মুখোমুখি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকেও ঝুঁকি তৈরি হয়। শুধু শারীরিক নিরাপত্তাই নয়, কন্যাশিশুর মানসিক নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভয় দেখানো, অপমান করা, অবহেলা করা, অন্য শিশুদের সঙ্গে বৈষম্য করা কিংবা তার মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়াও শিশুর বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি শিশুকে বারবার বলা যে সে ‘মেয়ে বলে কম পারবে’, তার চলাফেরা, শিক্ষা বা সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং ছেলেশিশুর তুলনায় তাকে কম সুযোগ দেওয়া মূলত বৈষম্যের সংস্কৃতিকেই শক্তিশালী করে।

ডিজিটাল যুগে কন্যাশিশুর সুরক্ষার প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত হয়েছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট শিশুদের শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইলিং এবং যৌন শোষণের মতো ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। ফলে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু বাড়ি ও বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সচেতনতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষা কন্যাশিশুর সুরক্ষার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। যে মেয়ে বিদ্যালয়ে থাকে, নিজের অধিকার সম্পর্কে জানে, প্রয়োজনীয় তথ্য পায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করার সুযোগ পায়, তার ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার এখনও উদ্বেগের বিষয়। MICS 2025 অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে adjusted net attendance rate ৬০ দশমিক ১ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।

কন্যাশিশুকে শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। তাকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে হবে। নিরাপদ যাতায়াত, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, হয়রানিমুক্ত পরিবেশ, দক্ষ শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দরিদ্র এলাকার মেয়েদের জন্য শিক্ষা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে পরিবার ও রাষ্ট্রকে বাড়তি সহায়তা দিতে হবে।

কন্যাশিশুর সুরক্ষায় জন্মনিবন্ধনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্মনিবন্ধন না থাকলে বয়স প্রমাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। MICS 2025 অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মাত্র ৫৯ দশমিক ২ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন কোনো নাগরিক কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পন্ন হয়েছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জন্মনিবন্ধন ও বয়স যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শুধু কাজি বা নিবন্ধকের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বিদ্যালয়, পরিবার ও কমিউনিটিকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো কন্যাশিশুর বিয়ে নির্ধারিত হলে বিষয়টি আগেই শনাক্ত করে দ্রুত হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বাল্যবিবাহরোধে চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সমাজসেবা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১০৯৮-এ ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৮৮৭টি কল গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধে ৮ হাজার ২০২টি ঘটনায় সহায়তা করা হয়েছে এবং শিশুনির্যাতনসংক্রান্ত ৫৪ হাজার ১২২টি কলের সেবা দেওয়া হয়েছে। ১০৯৮ নম্বরটি সারাদেশে বিনামূল্যে এবং ২৪ ঘণ্টা সেবা দেয়। শিশু নিজে অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি শিশুর সুরক্ষার জন্য এই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।

তবে একটি হেল্পলাইন যতই কার্যকর হোক, প্রতিটি ঘটনা ঘটার পর প্রতিকার দেওয়ার চেয়ে ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি। এজন্য পরিবারে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের ভয় দেখিয়ে নয়, বুঝিয়ে নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়, কারও অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা আচরণে কীভাবে ‘না’ বলতে হবে, বিপদে পড়লে কার কাছে সাহায্য চাইতে হবে এবং অনলাইনে কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে, তা বয়স উপযোগীভাবে শেখানো প্রয়োজন।

বিদ্যালয়েও শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্ভরযোগ্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, গোপনীয়তা রক্ষা, দ্রুত অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। কোনো অভিযোগকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বা ‘ছোট ঘটনা’ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। শিশুর বক্তব্যকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং অভিযোগকারী শিশুকে দোষারোপ বা সামাজিকভাবে অপমান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগও অপরিহার্য। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পাচার কিংবা বাল্যবিবাহের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে শিশুবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শিশুদের সুরক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশুর ওপর নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশের সময় তার পরিচয় প্রকাশ করে তাকে দ্বিতীয়বার সামাজিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। বরং গণমাধ্যমকে ঘটনার পাশাপাশি সমস্যার কারণ, আইনগত ব্যবস্থা, প্রতিরোধের উপায় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির বিষয় তুলে ধরতে হবে। জনমত গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গণমাধ্যম কন্যাশিশুর সুরক্ষাকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে।

কন্যাশিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়, এটি তার অধিকার। একটি শিশুকে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হওয়া মানে শুধু একটি পরিবারকে বিপদে ফেলা নয়; এর মাধ্যমে একটি জাতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা। তাই কন্যাশিশুকে ‘রক্ষা করার বস্তু’ হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তার মতামত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য প্রথমেই পরিবারকে সচেতন হতে হবে। শিশুদের জন্য বিদ্যালয়কে নিরাপদ করতে হবে।  স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বাল্যবিবাহ ও শিশুনির্যাতন প্রতিরোধে সক্রিয় হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত ও শিশুবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে হবে। শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের সমন্বয় বাড়াতে হবে। অনলাইন নিরাপত্তাকে শিশু সুরক্ষা নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের কন্যাশিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ‘ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা’ থেকে ‘ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধ’ ব্যবস্থায় যেতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ কন্যাশিশু ও পরিবার শনাক্তকরণ, বাল্যবিবাহের আগাম সতর্কতা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধ এবং নির্যাতনের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ ও সমাধানের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের নিয়মিত মূল্যায়ন ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।

কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু আজকের একটি শিশুকে রক্ষা করা নয়; আগামী দিনের একজন শিক্ষিত মা, দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক কিংবা নেতৃত্বদাতা তৈরি করার পথকে নিরাপদ করা। তাই কন্যাশিশুর প্রতি বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়, এটি জাতির ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু অবকাঠামো, আয় বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। দেশের কন্যাশিশু কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠছে, কতজন স্কুলে থাকতে পারছে, কতজন বাল্যবিবাহ থেকে মুক্ত থাকছে এবং নির্যাতনের শিকার হলে কত দ্রুত ন্যায়বিচার ও সহায়তা পাচ্ছে, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

আজকের শিশুই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তার শৈশব যদি ভয়, বৈষম্য ও অনিরাপত্তায় বন্দী থাকে, তাহলে একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন পূরণ হবে না। তাই পরিবারকে সচেতন, সমাজকে দায়িত্বশীল, প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিমূলক এবং রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর হতে হবে। কন্যাশিশুসহ প্রত্যেকটি  শিশুর  নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নয়, কোনো অবহেলা নয়। রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কন্যাশিশুসহ প্রতিটি শিশু ভয় নয়, সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে উঠবে। তাই কন্যাশিশুসহ প্রত্যেকটি শিশুর সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

লেখক পরিচিতি:

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি

যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি

ফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮, ০১৮৪২৬৩১১১৮

ইমেইল: lionganibabul@gmail.com

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

শিশুর নিরাপদ শৈশব তার মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে এখনও বহু কন্যাশিশু জন্মের পর থেকেই নানা ধরনের বৈষম্য, সহিংসতা, নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, যৌন হয়রানি, অনলাইন নিপীড়ন এবং শিক্ষাবঞ্চনার ঝুঁকিতে বেড়ে ওঠে। একটি কন্যাশিশুকে নিরাপদ পরিবেশে বড় করে তোলা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, এর সঙ্গে রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সর্বোপরি সমাজের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব জড়িত। তাই কন্যাশিশুর সুরক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক ইস্যু নয়, এটি একটি দেশের মানবিকতা, আইনের শাসন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইন, নীতিমালা ও সরকারি কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু আইন ও নীতির উপস্থিতির সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এখনও যে ব্যবধান রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা MICS-এর তথ্য এ বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথভাবে পরিচালিত এই জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত। একই জরিপে দেখা যায়, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ গত এক মাসে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের অভিজ্ঞতা পেয়েছে।

পরিসংখ্যান শুধু কিছু সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর জীবন, একটি পরিবারের গল্প এবং একটি অপূর্ণ সম্ভাবনা। বাল্যবিবাহের ফলে একটি কন্যাশিশু শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে, অল্প বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকিতে পড়ে, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে যায় এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়ে। ইউনিসেফ বলছে, বাল্যবিবাহের সঙ্গে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, অপুষ্টি, গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ঘরের ভেতর সহিংসতার ঝুঁকি সম্পর্কিত।


বাংলাদেশের কন্যাশিশুর সুরক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বাল্যবিবাহ। আইন থাকা সত্ত্বেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণে এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। দরিদ্রতা, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ, কন্যাশিশুকে পরিবারের বোঝা হিসেবে দেখার মানসিকতা, যৌতুকের ভয় এবং ‘মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেওয়া’কে সামাজিক নিরাপত্তার উপায় মনে করার প্রবণতা এখনও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে। অথচ একটি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না বরং তার শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, আত্মনির্ভরতা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব আরও বড় হয়ে ওঠে।


কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী অপরিচিত কেউ নয়। যে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বা পরিচিত পরিবেশকে একটি শিশু নিরাপদ মনে করে, সেখানেও নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশুরা সহিংসতা, নির্যাতন ও শোষণের মুখোমুখি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকেও ঝুঁকি তৈরি হয়। শুধু শারীরিক নিরাপত্তাই নয়, কন্যাশিশুর মানসিক নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভয় দেখানো, অপমান করা, অবহেলা করা, অন্য শিশুদের সঙ্গে বৈষম্য করা কিংবা তার মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়াও শিশুর বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি শিশুকে বারবার বলা যে সে ‘মেয়ে বলে কম পারবে’, তার চলাফেরা, শিক্ষা বা সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং ছেলেশিশুর তুলনায় তাকে কম সুযোগ দেওয়া মূলত বৈষম্যের সংস্কৃতিকেই শক্তিশালী করে।


ডিজিটাল যুগে কন্যাশিশুর সুরক্ষার প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত হয়েছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট শিশুদের শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইলিং এবং যৌন শোষণের মতো ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। ফলে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু বাড়ি ও বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সচেতনতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।


শিক্ষা কন্যাশিশুর সুরক্ষার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। যে মেয়ে বিদ্যালয়ে থাকে, নিজের অধিকার সম্পর্কে জানে, প্রয়োজনীয় তথ্য পায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করার সুযোগ পায়, তার ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার এখনও উদ্বেগের বিষয়। MICS 2025 অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে adjusted net attendance rate ৬০ দশমিক ১ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।


কন্যাশিশুকে শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। তাকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে হবে। নিরাপদ যাতায়াত, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, হয়রানিমুক্ত পরিবেশ, দক্ষ শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দরিদ্র এলাকার মেয়েদের জন্য শিক্ষা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে পরিবার ও রাষ্ট্রকে বাড়তি সহায়তা দিতে হবে।


কন্যাশিশুর সুরক্ষায় জন্মনিবন্ধনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্মনিবন্ধন না থাকলে বয়স প্রমাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। MICS 2025 অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মাত্র ৫৯ দশমিক ২ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন কোনো নাগরিক কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পন্ন হয়েছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জন্মনিবন্ধন ও বয়স যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শুধু কাজি বা নিবন্ধকের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বিদ্যালয়, পরিবার ও কমিউনিটিকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো কন্যাশিশুর বিয়ে নির্ধারিত হলে বিষয়টি আগেই শনাক্ত করে দ্রুত হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা থাকতে হবে।


বাল্যবিবাহরোধে চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সমাজসেবা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১০৯৮-এ ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৮৮৭টি কল গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধে ৮ হাজার ২০২টি ঘটনায় সহায়তা করা হয়েছে এবং শিশুনির্যাতনসংক্রান্ত ৫৪ হাজার ১২২টি কলের সেবা দেওয়া হয়েছে। ১০৯৮ নম্বরটি সারাদেশে বিনামূল্যে এবং ২৪ ঘণ্টা সেবা দেয়। শিশু নিজে অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি শিশুর সুরক্ষার জন্য এই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।


তবে একটি হেল্পলাইন যতই কার্যকর হোক, প্রতিটি ঘটনা ঘটার পর প্রতিকার দেওয়ার চেয়ে ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি। এজন্য পরিবারে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের ভয় দেখিয়ে নয়, বুঝিয়ে নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়, কারও অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা আচরণে কীভাবে ‘না’ বলতে হবে, বিপদে পড়লে কার কাছে সাহায্য চাইতে হবে এবং অনলাইনে কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে, তা বয়স উপযোগীভাবে শেখানো প্রয়োজন।


বিদ্যালয়েও শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্ভরযোগ্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, গোপনীয়তা রক্ষা, দ্রুত অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। কোনো অভিযোগকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বা ‘ছোট ঘটনা’ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। শিশুর বক্তব্যকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং অভিযোগকারী শিশুকে দোষারোপ বা সামাজিকভাবে অপমান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগও অপরিহার্য। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পাচার কিংবা বাল্যবিবাহের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে শিশুবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


শিশুদের সুরক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশুর ওপর নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশের সময় তার পরিচয় প্রকাশ করে তাকে দ্বিতীয়বার সামাজিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। বরং গণমাধ্যমকে ঘটনার পাশাপাশি সমস্যার কারণ, আইনগত ব্যবস্থা, প্রতিরোধের উপায় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির বিষয় তুলে ধরতে হবে। জনমত গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গণমাধ্যম কন্যাশিশুর সুরক্ষাকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে।


কন্যাশিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়, এটি তার অধিকার। একটি শিশুকে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হওয়া মানে শুধু একটি পরিবারকে বিপদে ফেলা নয়; এর মাধ্যমে একটি জাতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা। তাই কন্যাশিশুকে ‘রক্ষা করার বস্তু’ হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তার মতামত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য প্রথমেই পরিবারকে সচেতন হতে হবে। শিশুদের জন্য বিদ্যালয়কে নিরাপদ করতে হবে।  স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বাল্যবিবাহ ও শিশুনির্যাতন প্রতিরোধে সক্রিয় হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত ও শিশুবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে হবে। শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের সমন্বয় বাড়াতে হবে। অনলাইন নিরাপত্তাকে শিশু সুরক্ষা নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের কন্যাশিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করতে হবে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ‘ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা’ থেকে ‘ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধ’ ব্যবস্থায় যেতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ কন্যাশিশু ও পরিবার শনাক্তকরণ, বাল্যবিবাহের আগাম সতর্কতা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধ এবং নির্যাতনের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ ও সমাধানের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের নিয়মিত মূল্যায়ন ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।


কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু আজকের একটি শিশুকে রক্ষা করা নয়; আগামী দিনের একজন শিক্ষিত মা, দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক কিংবা নেতৃত্বদাতা তৈরি করার পথকে নিরাপদ করা। তাই কন্যাশিশুর প্রতি বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়, এটি জাতির ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু অবকাঠামো, আয় বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। দেশের কন্যাশিশু কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠছে, কতজন স্কুলে থাকতে পারছে, কতজন বাল্যবিবাহ থেকে মুক্ত থাকছে এবং নির্যাতনের শিকার হলে কত দ্রুত ন্যায়বিচার ও সহায়তা পাচ্ছে, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।


আজকের শিশুই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তার শৈশব যদি ভয়, বৈষম্য ও অনিরাপত্তায় বন্দী থাকে, তাহলে একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন পূরণ হবে না। তাই পরিবারকে সচেতন, সমাজকে দায়িত্বশীল, প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিমূলক এবং রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর হতে হবে। কন্যাশিশুসহ প্রত্যেকটি  শিশুর  নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নয়, কোনো অবহেলা নয়। রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কন্যাশিশুসহ প্রতিটি শিশু ভয় নয়, সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে উঠবে। তাই কন্যাশিশুসহ প্রত্যেকটি শিশুর সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।


লেখক পরিচিতি:

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি

যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি

ফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮, ০১৮৪২৬৩১১১৮

ইমেইল: lionganibabul@gmail.com


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream