শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩
Bangla FM

একজন দেশপ্রেমিক ও দূরদর্শী প্রশাসনিক কর্মকর্তার কর্মজীবনের অনন্য দলিল


ডেস্ক নিউজ
ডেস্ক নিউজ
| ফটো কার্ড

একজন দেশপ্রেমিক ও দূরদর্শী প্রশাসনিক কর্মকর্তার কর্মজীবনের অনন্য দলিল
মো. মাহবুব কবীর মিলন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব

লেখক: মো. মাহবুব কবীর মিলন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব

ইদানিং জেন-জি'রা প্রায় জানতে চায়, চাকুরি জীবনে আমি কী করেছি আগে!! মানে ঘাস কেটেছি কিনা। শিশুদের জানার জন্য আবার রিপোস্ট করলাম। যারা পড়েছেন আগে, তাদের জন্য নয়।

আমার কর্ম জীবনের কিছু এ্যাচিভমেন্ট ( Achievement) বা অর্জন। নতুন সরকারি কর্মকর্তা এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমার চাকুরিজীবনের সামান্য প্রচেষ্টাগুলো তুলে ধরলাম, যাতে তাঁরা সাহসী হয়।

এখানে বিন্দুমাত্র মিথ্যা বা অসততা নেই। বানান ভুল এবং অতি বড় লিখার  জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। 

   ১। ফরমালিনের অপব্যবহার দূরীকরণঃ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১৫ সালে “ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫ চুড়ান্ত হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এর পর এই আইনের মারাত্মক একটি ত্রুটি নজরে আসে আমার। আমদানি নীতি আদেশে “ফরমালিনের” সংজ্ঞায় শুধু “ফরমালিন” শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছিল, অথচ ফরমালিনের আরও ১০টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নাম রয়েছে। যা সংজ্ঞায় আনা প্রয়োজন। পরদিন চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে গিয়ে জানতে পারি বিগত এক বছরে অন্য দশটি নামে ফরমালডিহাইড পাউডার (১:৪০ জ্বলীয় দ্রবন=ফরমালিন) আমদানি হয়ে এসেছে প্রায় ১৭৫০০ মেঃটন, অথচ ঐ সময়ে আইনের সংজ্ঞায় উল্লেখিত ফরমালিন আমদানি হয়েছে মাত্র পাঁচ কেজি।

সংজ্ঞায় ফরমালিনের সাথে অন্য ১০টি নাম উল্লেখ করে আমি বিকালেই তা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে ইমেইল করি। তা করা না হলে আইন পাশ হলেও ফরমালিনের বাণিজ্যিক আমদানি বন্ধ করা যেত না। পরদিন আইন মন্ত্রী মহোদয় জনাব আনিসুল হক স্যারের সাথে চট্টগ্রাম থেকে ফোনে সরাসরি কথা বলে বিষয়টি বিস্তারিত জানাই। তিনি ফরমালিনের অন্য দশটি নাম লিখে নেন। আইন মন্ত্রী মহোদয় আইনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হতে ফেরত এনে আইনের সংজ্ঞায় সব নাম যুক্ত করে চুড়ান্ত করেন। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ করি যাতে দ্রুততম সময়ে আমদানি নীতি সংশোধন করে ফরমালিনের অন্য দশটি নাম যুক্ত করে শিল্প ছাড়া ফরমালিনের বাণিজ্যিক আমদানি বন্ধ করে দেয়া হয়। সংশোধন করা হয় আমদানি নীতি। বন্ধ হয়ে যায় ফরমালিনের বাণিজ্যিক আমদানি। ফলে বন্ধ হয়ে যায় খোলা বাজারে ফরমালিনের ক্রয় বিক্রয়। বাজারে ফরমালিন নেই, কাজেই এর অপব্যবহারও নেই। ২০১৫ হতে আজ পর্যন্ত আর এক কেজি ফরমালিন বাণিজ্যিকভাবে আমদানি হয়নি। দেশে কোথাও খোলা বাজারে ফরমালিন বিক্রি হয় না। 

ফরমালিন আইন ও বিধি প্রণয়ন এবং তা কঠিনভাবে বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন সেই সময়ের সিনিয়র বাণিজ্য সচিব জনাব Hedayetullah Al Mamoon স্যার এবং বর্তমান পরিকল্পনা সিনিয়র সচিব আমার বন্ধু Satyajit Karmaker মহোদয়।

২। ক্যালসিয়াম কার্বাইডের অপব্যবহার দূরীকরণঃ ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে সরকার। শুধু শিল্পে ব্যবহারের জন্য এর আমদানি নিয়ন্ত্রিত। কাঁচামাল হিসেবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সারা দেশে মাত্র ১১টি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে আমদানির পারমিশন দিয়েছে বিস্ফোরক অধিদপ্তর, অথচ বাজারে অবাধে ক্রয় বিক্রয় হয়ে থাকে ক্যালসিয়াম কার্বাইড। এই আইন ঘাঁটতে গিয়ে লক্ষ্য করি যে একটি বিশাল ত্রুটি রয়ে গিয়েছে এর লাইসেন্সের শর্তাবলীতে। শিল্প ছাড়া আমদানি, ক্রয়, বিক্রয় পরিবহন নিষিদ্ধ হলেও লাইসেন্সের শর্তাবলীর ৯ নাম্বার ধারায় সুস্পষ্ঠ উল্লেখ রয়েছে যে, দেশে যে কোন ব্যক্তি বা আমদানিকারক, যে কোন ব্যক্তির কাছে ২০ কেজি পর্যন্ত ক্যালসিয়াম কার্বাইড ক্রয় বিক্রয়, পরিবহন ও মজুদ করতে পারবে। ২০ কেজি ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে সারা দেশের এক সিজনের আম বা ফল পাকানো যায়। লাইসেন্সের এই ত্রুটিযুক্ত শর্তাবলীর জন্য বাজারে সহজলভ্য ছিল ক্যালসিয়াম কার্বাইড। আমি বিষয়টি লিখিতভাবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের নিকট তুলে ধরি। মন্ত্রণালয় বেশ কয়েকটি সভা করে (সব ক’টিতে আমি উপস্থিত ছিলাম) লাইসেন্সের ত্রুটিযুক্ত শর্তাবলী বাতিল করে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের অবৈধ ব্যবহারের জন্য ছয় মাসের শাস্তি আরোপ করে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে। বন্ধ হয়ে যায় ক্যালসিয়াম কার্বাইডের বাণিজ্যিক ক্রয় বিক্রয়, সরবরাহ ও মজুদ। এখন ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

কৃতজ্ঞতা DG Ahsanul Jabbar  স্যার

৩। হার্টের রোগীর রিং (স্টেন্ট) এর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণঃ ড্রাগ প্রশাসনের নীতিমালা বা আইনে চিকিৎসা খাতে নিত্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা সামগ্রীর মূল্য বেঁধে দেয়া বা এমআরপি (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) নির্ধারণ করার ব্যবস্থা থাকা সত্বেও দেশে হার্টের রোগীর রিং (স্টেন্ট) এর মূল্য ছিল লাগামহীন। যে যেভাবে পারত স্টেন্ট এর দাম আদায় করত অসহায় রোগির কাছ থেকে। এক চিকিৎসকের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে হার্টের রোগীর রিং (স্টেন্ট) এর এমআরপি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য বিষয়টি নিয়ে পোস্ট দেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন পেজে। সেখানে প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ স্যারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলে, চিঠি লিখি প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি স্যারের কাছে। কপি প্রেরণ করা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সহ মহাপরিচালক ড্রাগ প্রশাসন মহোদয়ের নিকট। একাধিক সভা আহ্বান করে ড্রাগ প্রশাসন। উপস্থিত ছিলাম আমি সেখানে। এরপর হার্টের স্টেন্ট বা রিং এর এমআরপি নির্ধারণ করা হয়। তিন থেকে চার লাখ টাকার স্টেন্ট এর দাম নেমে আসে সর্বোচ্চ ১থেকে ১.৫ লক্ষ টাকায়।

কৃতজ্ঞত Abul Azad স্যার

 @জাহিদুর রহমান (ভাইরোলজিস্ট)

৪। ইয়াবা তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ায় ঔষধের উপাদান সিউডোএফিড্রিন নিষিদ্ধ ঘোষণাঃ এক ঔষধের দোকানে জানতে পারি সর্দি কাশির সিরাপের উপাদান সিউডোএফিড্রিন পাউডার দিয়ে ইয়াবা ট্যাবলেট বানানো হচ্ছে। বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানিগুলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত পাউডার আমদানি করে তা ব্ল্যাক মার্কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে, যা দিয়ে ইয়াবার মূল উপাদান মেথাএম্ফিটামিন বানানো হয়। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে এর সত্যতা যাচাই করে নেই। আরো জানতে পারি যে, সিউডোএফিড্রিন এর ব্যবহার পৃথিবীর অনেক দেশেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ এবং চিকিৎসা খাতে অনেক বিকল্প উপকরণ থাকায় সিউডোএফিড্রিন এর কোন প্রয়োজন নেই। এটা অবশ্যই আমাদের দেশেও নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে সিউডোএফিড্রিন যুক্ত একটি কফ কাশির ট্যাবলেট দিয়ে দশটি ইয়াবা বানানো যায়। সেই সময় ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ, ঢাকা শহরে চারটি ইয়াবা তৈরির কারখানার খোঁজ পায়। তারমানে দেশেই ইয়াবা তৈরি শুরু হয়েছিল।

এরপর আমি সিউডোএফিড্রিন যুক্ত কয়েকটি ট্যাবলেট এবং সিউডোএফিড্রিন আমদানি, ক্রয় বিক্রয় এবং ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য চিঠি সহ দেখা করি প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ স্যারের সাথে এবং ট্যাবলেট ও চিঠি প্রদান করি তাঁর হাতে। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নির্দেশ দেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য সচিব স্যারকে (বর্তমানে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান) সভাপতি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ডিজি ড্রাগ প্রশাসন, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সহ একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে দেন। কমিটি অনেকগুলো সভা করে অবশেষে সিউডোএফিড্রিন পাউডারের আমদানি এবং ব্যবহার নিষিদ্ধ করা সহ সিউডোএফিড্রিন দিয়ে বানানো সব ঔষধের লাইসেন্স বাতিল করে ঐসব ঔষধ বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। যা এখনো কার্যকর আছে। এরফলে বন্ধ হয়ে যায় দেশে ইয়াবা তৈরির কারখানা।

কৃতজ্ঞতা @Abul Azad স্যার

৫। ইন্টারনেট পর্ণগ্রাফি বন্ধে ব্যবস্থাঃ একবার ঈদে রংপুরে গ্রামের বাড়ি গিয়ে জানতে পারি যে, গ্রামের ছেলেরা বাজারে গিয়ে ১০ টাকা দিয়ে দুই জিবি পর্ণগ্রাফি মোবাইলে ডাউনলোড করে দেখে এবং এই আসক্তিতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তারা। এ থেকে আমাদের বাড়ির কৃষি কাজের ছেলেও মুক্ত ছিল না। পর্ণগ্রাফি আসক্তিতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে যুব সমাজ। ফিরে এসে প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ স্যারের কাছে তা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চিঠি লিখি। কপি প্রদান করি তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব স্যারের কাছে এবং দেখা করি তাঁর সাথে। পৃথিবীর অনেক দেশেই পর্ণগ্রাফি নিয়ন্ত্রিত, অথচ আমাদের দেশে অবাধ এবং সহজ এক্সেস। প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি স্যার সেই চিঠির প্রেক্ষিতে দ্রুত একটি প্রজেক্ট নেয়ার জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয়কে নির্দেশ প্রদান করেন। অবশেষে প্রায় ১৬০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়, যা বাস্তবায়ন করে ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমিউনিকেশন বা ডট। সাইবার থ্রেট ডিটেকশন এন্ড রেসপঞ্জ নামে এটি এখন নিয়ন্ত্রণ করছে বিটিআরসি। যেখানে পর্ণগ্রাফী নিয়ন্ত্রণ সহ আরও অনেক কাজ করা হচ্ছে।

কৃতজ্ঞতা @abul azad স্যার

৬। ঘন চিনি বা সোডিয়াম সাইক্লামেট খাদ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ি মিথ্যা ডিক্লারেশন দিয়ে অন্য নামে সোডিয়াম সাইক্লামেট আমদানি করে আসছিল। এছাড়া সোডিয়াম সাইক্লামেট এর সাথে জমিতে ব্যবহারের রাসয়নিক সার সোডিয়াম সালফেট মিশ্রণ করে প্যাকেটজাত অবস্থায় বিক্রি করা হচ্ছিল খোলা বাজারে। যা ব্যবহৃত হত সারা দেশে বেকারি এবং মিস্টিতে। সোডিয়াম সাইক্লামেট এর সাথে যে সোডিয়াম সালফেট সার মেশানো হত তার কোন ক্লু বা প্রমাণ কোথাও ছিল না। আমার নিজের চেষ্টায় তা অনুধাবন করে খামার বাড়ি মৃত্তিকা গবেষণা ও উন্নয়ন ইন্সটিটিউট (এসআরডিআই) হতে পরীক্ষা করে সন্দেহের যথার্থতা প্রমাণিত হয় যে, তা সোডিয়াম সালফেট রাসয়নিক সার। এরপর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিষয়টি কাস্টমস সহ র্যা ব এবং পুলিশকে অবহিত করি।

৭। চায়না থেকে অননুমোদিতভাবে সম্পূর্ণ তৈরি বা ফিনিশড মশার কয়েল আমদানি বন্ধে বিএসটিআইকে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। উল্লেখ্য যে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফিনিশড মশার কয়েল আমদানি হয়ে আসে দেশে, যা সম্পূর্ণ বে-আইনি।

৮। সংশোধীত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০১৮ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিধিমালা প্রণয়নে গ্রুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ তে কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব প্রেরণ। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড আইন, ২০১৮ প্রণয়নে গ্রুত্বপূর্ণ প্রস্তাব প্রেরণ।

৯। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক প্রেরণে “গামকা” এক মারাত্মক হয়রানির নাম। গামকা কর্তৃক নির্ধারিত ২৫টি প্যাথলোজি বা ক্লিনিক ছাড়া অন্য কোথাও থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট গ্রহন করা হয় না। এই কারণে প্রবাসে গমনেচ্ছু শ্রমিকরা মারাত্মক হরানির স্বীকার হয়ে থাকেন প্রতিনিয়ত। অতিরিক্ত টাকা ছাড়া রিপোর্ট দেয়া হয় না। এই গামকা সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিয়ে সারা দেশে ভাল ভাল হাসপাতাল বা ক্লিনিককে মধ্যপ্রাচ্যে গমনেচ্ছু শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয় সচিব মহোদয় বরাবর চিঠি প্রেরণ।

১০। দেশে ফ্রি ল্যান্সারদের সুবিধা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধির লক্ষ্যে অতি প্রয়োজনীয় গেটওয়ে “পেপাল” চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী এবং সচিব মহোদয় বরাবর চিঠি প্রেরণ।

১১। শিশু নির্যাতনের ধরণে পৈশাচিকতা ও বর্বরতা ভয়ানক বেড়ে যাওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ সংশোধন করে আরও কঠিন শাস্তির বিধান করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় বরাবর চিঠি প্রেরণ।

১২। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক এবং নিন্ম-মাধ্যমিক ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে একটি যুগোপযোগী এবং কল্যাণকর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষা আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে প্রাথমিক এবং গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।

১৩। কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিন সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত এলাকায় নেটিং/ফেন্সিং করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।

১৪। বাসে চলাচলরত নারীদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনে জরুরি সার্ভিসের (৯৯৯) সাহায্য পাওয়ার জন্য প্রতিটি গণপরিবহনের (বাস/রাইডার ইত্যাদি) অভ্যন্তরে চার পাশে গাড়ির নাম্বার বড় হরফে স্পষ্টাক্ষরে লিখা বাধ্যতামূলক করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সচিব এবং চেয়ারম্যান, বিআরটিএ মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।

১৫। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে চাকুরি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে করা প্রাথমিক আবেদনে, সার্টিফিকেট এবং ফটো সত্যায়ন ব্যবস্থা তুলে দেয়ার প্রয়জোনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে সচিব, সমন্বয় ও সংস্কার, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।

১৬. কৃষকরা যাতে ধানের ন্যায্য মূল্য পায় সে জন্য অবশ্যই প্রতি বছর মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই ধান ক্রয় শুরু করার ব্যবস্থা গ্রহনের অনুরোধ জানিয়ে খাদ্য সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ। কারণ এপ্রিলের মধ্যভাগ থেকেই বোরো ধান কাটা শুরু হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় আদেশ দিয়ে তা সব উপজেলায় প্রেরণ এবং ধান ক্রয় শুরু করতে জুন মাস নাগাদ লেগে যায়। ততদিনে প্রান্তিক চাষিরা মাঠ থেকেই দালাল ফড়িয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিকট কম মূল্যে ধান বিক্রি করে দেয়। ফলে সরকারি মূল্য থেকে বঞ্চিত হয় কৃষক।

১৭। দেশে আমদানী হয়ে আসা কীটনাশক বন্দরে আসার পর কোন প্রকার ল্যাব পরীক্ষা ছাড়াই খালাস হয়ে থাকে। কোন কোন আমদানিকারক নিষিদ্ধ কীটনাশক নিয়ে আসলে বা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অন্য কিছু নিয়ে আসলে তা ধরার কোন উপায় নেই। এছাড়া কীটনাশকের লাইসেন্স নেয়ার সময় আবেদনকারীর আবেদনে উল্লেখিত সবগুলো ঘোষণার সত্যতা যাচাইয়ের সক্ষমতা কৃষি বিভাগের নেই। মাঠ পর্যায়ে কৃষক সকালে কীটনাশক স্প্রে করে বিকালে বাজারে বিক্রি করে, রাতে তা আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহন করে থাকি। এই প্রি-হারভেস্ট ইন্টারভেল মেনে না চলার জন্য কীটনাশকের রেসিডিউ যাচ্ছে খাদ্যের সাথে আমাদের শরীরে। দেখা দিচ্ছে নানান জটিল রোগ। এসব কিছু থেকে উত্তরণের উপায় সহ ১০টি আন্তর্জাতিক মানের প্রটোকল আমি তৈরি করে তা বাস্তবায়নের অনুরোধ জানিয়ে কৃষি সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ করি।

১৮। টঙ্গী ভৈরব, লাকসাম চিনকি আস্তানা ডাবল লাইন চালুর পর ঢাকা চট্টগ্রাম ননস্টপ ট্রেন ৬.৩০ ঘন্টা থেকে বর্তমানে পাঁচ ঘন্টা দশ মিনিট করা, বায়োটয়লেট চালু করা, প্রতিটি কোচের ছাদে অপ্রয়োজনীয় এসিপি সিস্টেম তুলে দেয়া, ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করে আনা নতুন কোচের অসংখ্য ত্রুটি চিহ্নিত করা এবং পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া হতে আনা ২৫০টি কোচে সেসব ত্রুটি দূর করে ডিজাইন কনফার্ম করা, ট্রেনের ইঞ্জিন হতে তেল চুরি বন্ধে তেলের ট্যাংকে আধুনিক জিপিএস ডিভাইস স্থাপন, নতুন ক্রয় করা সব লোকোতে চালকদের জন্য ক্যাবে এসি সিস্টেম চালু করা, যাত্রী টিকেটে যাত্রীর নাম ও মোবাইল নাম্বার উল্লেখ করা, ইঞ্জিন এবং ছাদে অবৈধ যাত্রী তোলা বন্ধে কমলাপুর এবং বিমানবন্দর স্টেশনে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে তাঁর মনিটর রেল মন্ত্রী, সচিব এবং ডিজি মহোদয়ের অফিস কক্ষে স্থাপন সহ রেলের অসংখ্য উন্নয়ন ও অনিয়ম দূরীকরণে আমার সরাসরি ভূমিকা রয়েছে।

১৯। আবুল কালাম আজাদ স্যার ( প্রাক্তন এসডিজি মূখ্য সমন্বয়ক) তখন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব। আমি কাজ করছি বিনিয়োগ বোর্ডের পরিচালক, চট্টগ্রাম। দেশে চলছে মারাত্মক লোড শেডিং। জনগণকে অন্ধকারে (শেডিং) রেখে পিডিবি নিয়ম ভঙ্গ করে অর্থের বিনিময়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে। চট্টগ্রাম থেকে বিদ্যুৎ সচিব বরাবর করা এমন একটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হল আমাকে। কমিটির সভাপতি হলেন বর্তমান রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব, তৎকালীন যুগ্ম-সচিব (উন্নয়ন), বিদ্যুৎ বিভাগ। মাঠ পর্যায়ে ইনটেন্সিভ তদন্তের ভার পড়ল আমার উপর। কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, স্ক্যাডা কন্ট্রোল রুম, চট্টগ্রাম পিডিবি প্রধান প্রকৌশলী সহ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং ঢাকাস্থ ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাস সেন্টার (এনএলডিসি) পরিদর্শন করে তাঁদের সবার বক্তব্য নেয়া হল।

এই তদন্ত করতে গিয়ে একটি ভয়াবহ বিষয় উদ্ঘাটন করলাম আমি। সরকারের কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি। সারা দেশে লোড শেডিং চালু রেখে, সবচেয়ে কম খরচে যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, সেই কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরেও এনএলডিসি থেকে ক্যারিয়ারের মাধ্যমে (সরাসরি ফোন) মৌখিক নির্দেশে দৈনিক প্রায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে রাখা হচ্ছিল। সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে একই চিত্র পাওয়া যায়। তারমানে শুধু কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে সরকারের ক্ষতি হচ্ছিল দৈনিক ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের আয়। হাজার হাজার মেগাওয়াট লোড শেডিং রেখে সবচেয়ে কম খরচে উৎপাদিত দিনে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন শাট ডাউন করে রাখ হত, তার সদুত্তোর দিতে পারেনি এনএলডিসি বা পিডিবির অন্য কেউ।

তদন্তে অনিয়ম করে শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বেশি বিদ্যুৎ প্রদানের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। লোড শেডিং চালু রেখে এভাবে সক্ষমতা থাকা সত্বেও কাপ্তাই জলবিদ্যুত কেন্দ্র সহ অন্যান্য কেন্দ্রে উৎপাদন কমিয়ে রাখা বা শাট ডাউন করে রাখা বন্ধ হয়ে যায়, তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার পর। বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হতে রক্ষা পায় সরকার। আমি ইঞ্জিনিয়ার নই বা বিদ্যুতে কখনো চাকুরিও করিনি। ঘটোনাচক্রে সেই তদন্ত কমিটির সদস্য হতে হয়েছিল আমাকে। এ তদন্ত করতে গিয়ে বিদ্যুতের অসংখ্য অনিয়ম এবং চুরি বা দুর্নীতির ঘটনা জানতে পেরেছিলাম।

২০। স্বাধীনতা যুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল তৎকালীন ইপিআর (বিজিবি) এর একটি দল দিনাজপুর ক্যাম্প থেকে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এসে দিনাজপুর দশ মাইল নামক এলাকার বাজারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিসের সামনে খানসেনাদের প্রতিহত করতে অবস্থা নেয়। সাথে ছিল এলাকার কিছু লোকজন। দিনাজপুর থেকে পাকসেনারা এগিয়ে আসলে শুরু হয় গোলাগুলি। চলতে থাকে প্রচন্ড যুদ্ধ। ইপিআর এর বীর দুই যোদ্ধা ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এবং হাবিলদার মিয়াঁ হোসেন চালাচ্ছিলেন সিক্স পাউন্ডার গান (মর্টার)। ইতিমধ্যে নিলফামারীর সৈয়দপুর (বিমানবন্দর) হয়ে খান সেনাদের আর একটি দল এসে অন্য পাশ থেকে আক্রমণ চালায় ইপিআর বাহিনীর উপর। দুই দিক হতে প্রচন্ড আক্রমণে টিকতে না পেরে ইপিআর এর বীর যোদ্ধারা পিছু হটতে থাকে, পিছিয়ে যায় জনগণ। কিন্তু জান বাজী রেখে সিক্স পাউন্ডার গান থেকে ফায়ার করতে থাকেন ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এবং হাবিলদার মিয়াঁ হোসেন। পিছু হটা সঙ্গী সাথীরা সবাই যখন চিৎকার করে তাঁদের পিছু হটতে বলছিলেন, তখনও নিজ অবস্থান থেকে এক ইঞ্চি সরেননি মোস্তাফিজুর রহমান এবং মিয়াঁ হোসেন। তাঁরা উভয়ে চিৎকার করে উত্তর দেন, “দেহে এক বিন্দু রক্ত থাকতে দেশের এক ইঞ্চি মাটি ছাড়ব না শ্ত্রুদের কাছে।“ মাটি ছাড়েননি তাঁরা। খানসেনাদের গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাঁদের দেহ। এক সময় চলে যায় খানসেনারা। পড়ে থাকে দুই শহীদের লাশ।

এলাকার জনগণ পরে একত্রিত হয়ে দশ মাইল বাজারের এক দোকানের পিছনে একটি কবর খুড়ে তাঁদের দুই জনের লাশ দাফন করে একই কবরে।

বেঁচে থেকে এক ইঞ্চি মাটি ছাড়েননি, সেই শহীদ বীর দুইজনের ঠিকানা, পরিবার রয়ে যায় অজানা। কোন রেকর্ডে তাঁদের হদিস ছিল না। দিনাজপুরের মুক্তিযোদ্ধারা প্রতি বছর ১২ এপ্রিল এলাকায় জড় হয়ে তাঁদের মৃত্যু দিবস পালন করে থাকেন।

আমি এই খবর দিনাজপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে জানার পর তাঁদের দুই পরিবারের সন্ধানে নেমে পড়ি। দিনাজপুর বিজিবি সেক্টর কামান্ড এবং রংপুর সেক্টর কমান্ড অফিসে খোঁজ করে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। সেদিনের যুদ্ধে সাথে ছিলেন এমন একজন যোদ্ধা পরে মৃত্যু বরণ করায় সমুদ্রে পড়তে হয় আমাকে। দিনাজপুরের জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলেছি। তাঁদের অনেকেই বিভিন জেলার নাম বলছিলেন।

অনেকদিন ধরে আমি প্রায় ২০টি জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও নাম নেই তাঁদের দুই জনের। বিজিবি হেড কোয়াটারে খোঁজ করেও কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। বারবার ফোনে অনুরোধ করতে থাকি বিজিবি হেড কোয়াটারে রেকর্ড রুমের দায়িত্বে থাকা মেজর সাহেবের সাথে। তিনি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে একদিন সেই সুসংবাদ দিলেন। পাওয়া গেল তাঁদের ঠিকানা, তবে শুধু উপজেলা এবং জেলার নাম।

ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এর বাড়ি ভোলার বোরহান উদ্দিন উপজেলা এবং হাবিলদার মিয়াঁ হোসেনের বাড়ী নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলা। ইউনিয়ন এবং গ্রামের ঠিকানা নেই। ফোন দিলাম দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে। বললাম, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে নিয়ে এই দুই শহীদের বাড়ী এবং পরিবারের হদিস বের করতে। এসে গেল সেই ক্ষণ। ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এঁর বাবা মা মারা গিয়েছে অনেক আগেই। বেঁচে আছেন তাঁর এক বোন আর এক ভাই। অপরদিকে হাবিলদার মিয়াঁ হোসেন এঁর স্ত্রী এবং একমাত্র ছেলে আছেন।

সবার সাথে মোবাইলে কথা বলে নিজে কাঁদলাম, কাঁদালাম তাঁদের। স্বাধীনতার প্রায় ৪৪ বছর পর স্বজনেরা খোঁজ পেলেন তাঁদের দুই বীর শহীদের কবর। এঁরা সবাই গিয়েছিলেন দিনাজপুর দশ মাইল বাজারে, যেখানে শুয়ে আছেন দুই শহীদ। এই কাহিনী ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসের কথা।

২১। হাজেরা খাতুন। স্বামী শহীদ কনস্টেবল আঃ ছাত্তার। পুলিশ সদস্য কনস্টেবল আঃ ছাত্তার শহীদ হন ৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১। কুষ্টিয়া সদর থানা পাহারত অবস্থায় পাক হানাদার বাহিনী থানা আক্রমন করে। আঃ ছাত্তার সাথের তিনজন কনস্টেবল সহ জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ চালিয়ে যান। তাঁরা কেউ এক ইঞ্চি মাটি ছাড়েনি। সবাই শহীদ হন। পরে জনগণ থানার পাশে এক কবরে দাফন করেন তাঁদের। আজও কেউ জানে না কোথায় তাঁরা শুয়ে আছেন।

স্বাধীনতার পরে হাজেরা বেগম স্বামী মৃত্যুর খবর পান। এক মেয়ে ছিল, বিয়ে হয়ে গেছে। স্বাধীনতার ৪৪ বছর ধরে চেষ্টা করেও হাজেরা খাতুন তাঁর স্বামী যে কনস্টেবল ছিল এবং যুদ্ধ করে থানায় শহীদ হয়েছিলেন, তার কোন প্রমাণ বা কাগজ বের করতে পারেন নি। যার ফলে বিধবা শহীদ পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি আজ পর্যন্ত ভাতা পাননি।

৩ বছর আগে জানতে পারি সে দুঃখজনক ঘটনার কথা। শুরু করলাম তালাশ। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক, এসপি এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহোদয় এবং কয়েকজন পুলিশ ভাইয়ের সাথে কথা বললাম। এসপি সাহেব এবং পুলিশ রেকর্ড রুম থেকে জানালেন, এর আগেও তাঁরা হাজেরা খাতুনের আবেদনের ভিত্তিতে অনেক খুঁজেও আঃ সাত্তার এঁর কোন তথ্য পাননি তাঁরা। আমি আবার নতুন করে খুঁজতে বিনয়ের সাথে অনুরোধ জানালাম। শুরু হল আবার সেই মহৎ উদ্যোগ। তাঁদের সবার ঐকান্তিক আগ্রহ, আন্তরিকতা এবং অনেক চেষ্টার পরে খুঁজে পাওয়া গেল শহীদ কনস্টেবল আঃ ছাত্তার এঁর তথ্য। হাজেরা খাতুন পান তাঁর স্বামী শহীদ হবার স্বীকৃতি, কাগজে কলমে।

মৃতপ্রায় হাজেরা খাতুন বিছানায় শুয়ে কাঁদেন তাঁর শহীদ স্বামীর সেই স্বীকৃতি পত্র নিয়ে, যা পেতে তাঁর ৪৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। যে শহীদেরা এক ইঞ্চি মাটি ছাড়েনি, জীবন দিয়েছেন।

২২। লিভার ব্রাদার্সের “ফেয়ার এন্ড লাভ্লি” ক্রিমের প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন, “বিশ্ব জয় করে এবং দুবাই সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সকল ক্রিমকে হারিয়ে দেয়ার বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ করে তা বন্ধের ব্যবস্থা নিয়েছিলাম।

উপরের সবগুলো কাজ (১-২২) করেছি ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত, যখন আমি বিনিয়োগ বোর্ডের পরিচালক (উপ সচিব/যুগ্ম সচিব) হিসেবে কর্মরত ছিলাম এবং এই সব কাজ ছিল আমার নিজ দাপ্তরিক কাজের বাইরে, আউট অব মাই ডেস্ক।

২৪ আগস্ট ২০১৭ সালে আমি সদস্য (আইন ও নীতি) হিসেবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে যোগদান করি। পরের সব কাজগুলোতে সবার সাহায্য পেয়েছি এবং তা সব ছিল আমার ব্রেইন চাইল্ড।

২৩। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয় ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫। আমি এখানে যোগদান করার আগ পর্যন্ত একটি খাদ্য পণ্য বা খাদ্য উপকরণ ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়নি। জয়েন করেই হাতে নেই খাদ্য পণ্য পরীক্ষা করার প্রোগ্রাম। একই খাদ্য এক বা একাধিক ল্যাবে পাঠানো শুরু হয়। বর্তমান পর্যন্ত এমন কোন খাদ্য নেই যা পরীক্ষা করা হয়নি। যেগুলোতে সমস্যা পাওয়া যায়, সব কোম্পানিকে ডেকে মোটিভেশন, সতর্ক করা সহ তাঁদের সবাইকে সময় বেঁধে দেয়া হয়। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এসবের পুরো দায়িত্ব ছিল আমার উপর।

২৪। জানতে পারি বিভিন্নন কোম্পানি এনার্জি ড্রিঙ্কস বানাচ্ছে বিএসটিআই থেকে কার্বোনেটেড বেভারেজের (কোক, সেভেন আপ, ফান্টা মিরিন্ডা ইত্যাদি) লাইসেন্স নিয়ে। যা একেবারেই অবৈধ। কারণ এনার্জি ড্রিংক এবং কার্বোনেটেড বেভারেজ আলাদা পণ্য। এনার্জি ড্রিংকস এ উচ্চমাত্রায় ক্ষতিকর ক্যাফেইন থাকে। বিএসটিআই এনার্জি ড্রিংক্স বানাবার অনুমতি দেয় না বা স্ট্যান্ডার্ড (বিডিএস) নেই তাদের। সারা দেশে বাচ্চাদের অতি প্রিয় ড্রিংক হচ্ছে এই এনার্জি ড্রিংক্স। সব কোম্পানির এনার্জি ড্রিংক কয়েকটি ল্যাবে পরীক্ষা করে উচ্চ মাত্রায় (একটিতে ৭৫০ এমজি/লিটার) ক্যাফেইন পাওয়া যায়। যেহেতু এনার্জি ড্রিংকস এর লাইসেন্স নেই, এবং ক্ষতিকর মাত্রায় ক্যাফেইন পাওয়া গিয়েছে, বিষয়টি আমি বিএসটিআই এর কাউন্সিল কমিটির মিটিং এ (অযাচিতভাবে উপস্থিত ছিলাম) সভাপতি শিল্প মন্ত্রী জনাব আমীর হোসেন আমু মহোদয়ের নজরে নিয়ে আসি। সভায় আলোচনা শেষে এনার্জি ড্রিংস উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

পরবর্তিতে বিএসটিআই এনার্জি ড্রিংক্স এর স্ট্যান্ডার্ড তৈরিতে উদ্যোগ গ্রহন করে, যেখানে উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইন এর অনুমতি দেবার কথা বলা আছে। আমি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তাতে বাধা প্রদান করি। এরপর জনগণের মতামত নেয়া হয়। সেখানেও এনার্জি ড্রিংক্স এর বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করা হয়। অতঃপর বিএসটিআই এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে যে, এনার্জি ড্রিংক্স এর উৎপাদন, বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা যাবে না। যারা কার্বোনেটেড বেভারেজের নামে লাইসেন্স নিয়েছে তারা সেই নামেই সফট ড্রিংস উৎপাদন এবং বাজারজাত করতে পারবে এবং ক্যাফেইন এর সর্বোচ্চ মাত্রা হবে ১৪৫ এমজি/লিটার।

বিএসটিআই এর সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ হতে আদেশ জারি করা হয় যে, পণ্যে এনার্জি শব্দ লিখা বা বিজ্ঞাপনে তা প্রকাশ করা যাবে না এবং ১৪৫ এমজি/লিটার ক্যাফেইন এর বেশি ক্যাফেইন যুক্ত পানীয় আমদানি, উৎপাদন, ক্রয় বিক্রয় করা যাবে না। এরফলে রেড বুল এনার্জি ড্রিংকের আমদানি বন্ধ হয়ে যায়, যেহেতু রেড বুলে ক্যাফেইন এর পরিমাণ ৩২০ এমজি/লিটার। এখন দেশে ক্ষতিকর (বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য) উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইনযুক্ত ড্রিঙ্কস বাজারে নেই।

২৫। দেশি এবং বিদেশি আমদানি করা সব মাছ পরীক্ষা করালাম। দেশি প্রায় সব মাছে হেভি মেটাল সীসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়াম মাত্রা সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেল। বিদেশি আমদানি করা সব মাছেও তাই। সব কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে আমদানি করা সব মাছের চালানের হেভি মেটাল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হল। আমদানি করা মাছের চালানের প্রায় সবগুলোতে হেভি মেটাল পাওয়া যাচ্ছিল বেশি। এরপর সব ধরণের মাছের আমদানির সময় মাছ সরবরাহকারী দেশের এক্রিডেটেড ল্যাব থেকে ঐ মাছের হেভি মেটাল পরীক্ষা করে সেখানে কোন হেভি মেটাল মেটাল নেই মর্মে হেলথ সার্টীফিকেট দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা হল।

২৬। এবার দেশি মাছে হেভি মেটাল। হেভি মেটাল কেউ মেশায় না। এটা দুষণ। পরিবেশ বা খাদ্য থেকে আসে। মুরগী পরীক্ষা করেও হেভি মেটাল পাওয়া গেল মাত্রার অনেক বেশি। মাছ এবং মুরগীতে হেভি মেটাল এর উৎস একই। আমরা এদের ফিড বা খাদ্যের দিকে নজর দিলাম। ফিডের একটি উপাদান এমবিএম (মিট এন্ড বোন মিল) আসে বিদেশ থেকে। যত মরা প্রাণির হাড় মাংস গুঁড়া করে বানানো হয় এমবিএম। মারাত্মক সব রোগের আধার এই এমবিএম। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ অনেক আগেই প্রাণি ও মৎস্য খাদ্যে এমবিএম এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে শুধু আমরা ছাড়া। শত শত কোটি টাকার হাজার হাজার মেঃটন এমবিএম আমদানি করে আনা হয়। এই এমবিএম আমদানি করার পর ল্যাব পরীক্ষা করে মাল ছাড় করার জন্য প্রাণি ও মৎস্য সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় বরাবর পত্র দিয়েছিলাম প্রায় ৪ বছর আগে, যখন বিনিয়োগ বোর্ডে ছিলাম।

 বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে সদস্য হিসেবে জয়েন করার পর এসে গেল সেই সুযোগ। প্রাণি ও মৎস্য সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাথে কয়েকটি মিটিং করে তাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ হতে এমবিএম আমদানি, উৎপাদন, ক্রয় বিক্রয় ও ব্যবহার সম্পূর্ণ্রুপে নিষিদ্ধ করা হল। এটা ছিল আমার সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগ। এমবিএম নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর প্রায় ৪৫টি এমবিএম এর চালান  অন্য নামে আমদানি হয়ে আসলে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার (বর্তমান) মহোদয়ের সার্বিক সহায়তায় তা খালাস বন্ধ করে দেয়া হয়, যা বর্তমানে বন্দরে বাজেয়াপ্ত অবস্থায় আছে।

২৭। এরপর প্রাণি ও মৎস্য খাদ্যের দ্বিতীয় অভিশাপ ট্যানারি বর্জ্য। সাভার ট্যানারি পল্লী একাধিকবার ভিজিট করে সেখানে প্রচুর অ-ব্যবস্থাপনা দেখতে পাই আমরা। সেখানে ট্যানারি বর্জ্য, যা মুরগীর খাদ্যে ব্যবহার করা হয়, সেই ড্রাই পার্টের কোন ইটিপি প্ল্যান্ট করা হয়নি ট্যানারি পল্লীতে। পল্লীর কোন সিকিউরিটি প্ল্যান বা প্রোটেকশন নেই। দেয়াল চার ফিট। একদিকে সম্পূর্ণ খোলা মাঠ, দেয়াল নেই। সিসি ক্যামেরা নেই। মেইন গেট নেই। প্রতিদিন প্রায় ১২৫ মেঃটন ড্রাই বর্জ্য জমা হয়, যা পাচার হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে এবং মুরগী ও মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মুরগী, ডিম, মাছ হচ্ছে হেভি মেটালের আধার।

আমরা সুপারিশ পাঠিয়েছি শিল্প মন্ত্রণালয়ে তিন মাস সময় দিয়ে। যাতে কোনভাবেই সামান্যতম ট্যানারি বর্জ্য, ট্যানারি পল্লী হতে পাচার হয়ে বাইরে যেতে না পারে। এটা দূর হলেই আমাদের মাছ, মুরগী এবং ডিম হেভি মেটাল মুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।

২৮। খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, বেকারি মিস্টির কারখানা সমূহে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় জেল জরিমানার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান সীলগালা করার সিস্টেম চালু করেছি। যেসব প্রতিষ্ঠান খুব খারাপ অবস্থায় পাওয়া যেত সেগুলো সীল করে দেয়া হত। এতে খুব ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছিল। মালিকরা অঙ্গীকারনামা দিয়ে তাদের কিচেন সহ খাবার জায়গা বা কারখানার প্রভূত উন্নয়ন করে, তারপর তারা জনগণের জন্য তা খুলে দিত।

২৯। খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, বেকারি মিস্টির কারখানা সমূহের হাইজিন অনুযায়ী স্কোর বেজড গ্রেডিং পদ্ধতিতে সবুজ, নীল, হলুদ এবং কমলা স্টিকার দেয়া শুরু করা হয় আমার উদ্যোগে। সবুজ ৯০+ নাম্বার, নীল ৮০+, হলুদ ৪০-৭৯ এবং কমলা ৪০- নাম্বার। হলুদ স্টিকার তিন মাস এবং কমলা স্টিকার এক মাস সময়ের মধ্যে নীল বা সবুজ স্টীকারে উন্নীত করতে হয়, নাহলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। এ পর্যন্ত ঢাকা শহরে পাইলটিং ভিত্তিতে মোট ৯০টি প্রতিষ্ঠানকে স্টিকার দেয়া হয়েছে। এগুলো রেগুলার মনিটরিং করা হচ্ছে। আরো ১০০টির মত প্রতিষ্ঠান রেডি করা হচ্ছে।

৩০। সকল কোম্পানির উৎপাদিত সকল প্রকার খাদ্য পণ্যের সেলফ লাইফ বা মেয়াদ উত্তীর্ণের স্টাডি রিপোর্ট/রিসার্চ পেপার বা বৈজ্ঞানিক দলিল বা প্রমাণক বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিকট দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রায় সবাই পণ্য ভিত্তিক স্টাডি রিপোর্ট দাখিল করেছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে সেলফ লাইফ কি স্টাডি করে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে দেয়া হয়েছে, নাকি আন্দাজে দেয়া হয়েছে। এগুলো পরীক্ষা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। যারা আন্দাজে দিচ্ছেন, কোন রিসার্চ নেই, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

৩১। হৃদরোগের ঝুঁকির বড় একটি কারণ ভোজ্য তেল, ডালডা এবং বনস্পতির ট্র্যান্স ফ্যাটি এসিড। এর আন্তর্জাতিক সহনীয় মাত্রা ২ এমজি/১০০ গ্রাম। আমরা ভোজ্য তেল এবং ডালডা, বনস্পতি ল্যাব পরীক্ষা করে পাই, সব ভোজ্য তেলে ২এমজি/১০০গ্রাম এর নিচে এবং ডালডা, বনস্পতিতে ১০/১২ এমজি/১০০গ্রাম, যা অনেক বেশি ক্ষতিকর মাত্রায়। এর প্রেক্ষিতে সব কোম্পানির সাথে বৈঠক করে ভোজ্য তেল এবং ডালডা, বনস্পতির ট্র্যান্স ফ্যাটি এসিডের সর্বোচ্চ মাত্রা ২এমজি/১০০গ্রাম (আন্তর্জাতিক) নির্ধারণ করে দেয়া হয়। অচিরেই তা কার্যকর হবে। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক কমে যাবে ইনশাআল্লাহ।

৩২। টি-ব্যাগ এবং চাপাতা পরীক্ষা করে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান এপিক্লোরোহাইড্রিন এবং কীটনাশক পাওয়া যায়নি। ব্রেড পরীক্ষা করে ক্ষতিকর উপাদান পটাসিয়াম ব্রোমেট পাওয়া যায়নি। ঢাকা শহরের সব বাজারের বিভিন্ন মাছ এবং ফল পরীক্ষা করে ফরমালিন পাওয়া যায়নি। পাউডার দুধ এবং পাস্তুরিত সব দুধ পরীক্ষা করে ভাল পাওয়া গিয়েছে। এগুলো কিছুদিন পরপর পরীক্ষা করা হয়। খাবার লবণ ভাল পাওয়া গেছে। কনডেন্সড মিল্কে ক্ষতিকর কিছু পাওয়া যায়নি। চিনি পরীক্ষা করে সোডিয়াম সাইক্লামেট পাওয়া যায়নি। হোটেলে পরাটা, রুটি, জিলাপীতে ব্যবহৃত “সাল্টু” পরীক্ষা করে তা এমোনিয়াম বাই কার্বোনেট হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফুড গ্রেড খাদ্য উপাদান।

৩৩। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ দেশবাসী খেয়ে থাকেন এমন একটি খাদ্য পণ্য পরীক্ষা করে মারাত্মক ক্ষতিকর মাত্রায় প্রিজার্ভেটিভ সোডিয়াম বেঞ্জয়েট এবং স্যাকারিন পাওয়া গিয়েছে দেশে এবং বিদেশের ল্যাব পরীক্ষায়। একই রকম আরও দুটি পণ্য পরীক্ষা করে উভয়টিতেই ক্ষতিকর মাত্রায় সোডিয়াম বেঞ্জয়েট এবং স্যাকারিন পাওয়া যায়। এই তিনটি খাদ্য পণ্যের লেবেল এবং বিজ্ঞাপনে প্রতারণা এবং মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার জন্য তাদের সবার বিরুদ্ধে খাদ্য আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় প্রথম কোম্পানিকে সাড়ে তিন লাখ এবং অপর দুই কোম্পানিকে সাড়ে এগারো লাখ টাকা করে জরিমানা করে আদালত।  এদের সবাইক চুড়ান্ত নোটিশ দেয়া হয়। প্রথম কোম্পানি পরবর্তীতে তাদের রেসিপি সম্পূর্ণ্রুপে পরিবর্তন করে নতুনভাবে উৎপাদন শুরু করে। স্যাকারিন একেবারে বাদ দিয়ে দেয় এবং সোডিয়াম বেঞ্জয়েট নিয়ে আসে ১০০ গ্রাম/লিটারের নিচে (বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড)। এর আগে সোডিয়াম বেঞ্জয়েট ছিল ৬০০ এমজি’র উপরে এবং স্যাকারিন ছিল প্রায় ১২৫০ এমজি। যা শরিরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

সর্বশেষ পরীক্ষায় প্রথম কোম্পানির খাদ্য পণ্য ভাল পাওয়া গিয়েছে। এই পণ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে আমাকে মারাত্মক প্রতিকূল পরিস্থিতির স্বীকার হতে হয়েছিল। অপদস্ত হতে হয়েছিল মারাত্মকভাবে। তবুও দমে যাইনি। যেহেতু এই পণ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খেয়ে থাকেন, তাই তা ঠিক করা ছিল আমার ব্যাক্তিগত একটি চ্যালেঞ্জ। 

৩৪। বাজারের গুঁড়া হলুদ মশলা পরীক্ষা করে ক্ষতিকর মাত্রায় হেভি মেটাল সীসা পাওয়া গিয়েছে। হার্ট ফাউন্ডেশন এবং ডিজি হেলথ যৌথভাবে এক পরীক্ষায় তারা প্রমাণ পেয়েছেন যে, গুঁড়া হলুদে একটি রাসায়নিক পাউডার লেড ক্রোমেট মেশানো হয়। অসাধু ব্যবসায়িরা হলুদের রঙকে আরও উজ্জ্বল করতে এই লেড ক্রোমেট পাউডার মিশিয়ে থাকে। লেড ক্রোমেট পাউডার আমদানি হয়ে থাকে শিল্পে ব্যবহারের জন্য। অনেক দেশেই এই লেড দূষণের জন্য লেড ক্রোমেট পাউডারকে দায়ি করা হয়ে থাকে এবং লেড ক্রোমেট পাউডার ব্যবহার নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে খুব কঠোরভাবে। আমাদের দেশে লেড ক্রোমেট পাউডার অবাধ আমদানি করা হয়ে থাকে। লেড ক্রোমেট পাউডার শুধু শিল্পে আমদানির জন্য অনুমতি প্রদান বা আমদানি নিষিদ্ধ করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। শিল্পে আমদানির অনুমতি দেয়া হলে বাণিজ্যিক আমদানি ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করতে হবে। শিল্প শুধু তাদের নিজেদের প্রয়োজনে আমদানি করবে।

৩৫। শতভাগ ফেয়ার এবং দুর্নীতিমুক্ত ২০৮ জন কর্মকর্তা এবং কর্মচারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে খুব অল্প সময়ে। নিয়োগ কমিটির সভাপতি ছিলাম আমি।

৩৬। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইনকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করায় আইনকে সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়। আইনের খসড়া চুড়ান্ত হয়েছে, যা অতি সত্বর মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে।

৩৭। ক্ষতিকর স্পর্শক হিসেবে খাদ্যে ওয়ান টাইম নন ফুডগ্রেড প্লাস্টিকের কাপ, খবরের কাগজ এবং প্যাকেটে স্ট্যাপলার পিন ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সহসাই এসবের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, অভিযান এবং মামলা দায়ের শুরু হবে।

৩৮। বাজার হতে ৪৭টি বহুল প্রচলিত আমদানিকৃত কীটনাশক ল্যাব পরীক্ষা করে প্রায় সবগুলোতে অত্যাধিক মাত্রায় হেভি মেটাল সীসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। কীটনাশকে সামান্য মাত্রায় হেভি মেটাল গ্রহনযোগ্য নয় বিধায় বিশ্বে কোথাও এর মাত্রা নিররাধারণ করা হয়নি। আমাদের দেশেও তা গ্রহনযোগ্য নয়। কীটনাশক অবশ্যই পিওর হতে হবে। তাই আগামী ১ জুলাই হতে আমদানি হয়ে আসা প্রত্যেক কীটনাশকের চালান বন্দরে আসার পর ঢাকার দুটি ল্যাবে হেভি মেটাল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে এনবিআর এবং কাস্টমসকে পত্র দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, দেশে কোন কীটনাশক বানানো হয় না। জমির মাটিকে হেভি মেটালের দুষণে দুষিত করার বড় একটি কারণ এই হেভি মেটালযুক্ত কীটনাশক।

৩৯। জর্দা গুল এবং খয়ের পরীক্ষা করে অতি উচ্চ মাত্রায় হেভি মেটাল সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম পাওয়া গিয়েছে। এর উতস্য খুঁজতে গিয়ে আমরা সাদা তামাক পাতা, বিড়ির তামাক এবং দেশে বানানো সিগারেটের তামাক পাতা পরীক্ষা করি। সব তামাক পাতাতেই উচ্চ মাত্রায় সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। সব তামাক পাতায় সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম পাওয়ায় এটা ধরে নেয়া যায় যে, তা মাটি এবং হয়ত কীটনাশকের দুষণ থেকে হচ্ছে। এই একই কারণে বিভিন্ন ফসলেও মাঝে মাঝে হেভি মেটাল পাওয়া যাচ্ছে, যা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন ট্রেসিবিলিটি নির্ধারণ।

৪০। ২০১৯ সালে ঢাকা শহরের বিভিন্ন কোল্ড স্টোরেজে র্যানব ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পরিচালিত অভিযানে দেখা গিয়েছে যে, সেখানে নস্ট হয়ে যাওয়া ২০০৯ সালের খেজুর এবং ২০১৩ সালের আমদানি করা মাংস রক্ষিত আছে, যা মেয়াদের তারিখ পরিবর্তন করে বাজারে বিক্রি করা হত। কোল্ড স্টোরেজগুলোর সহযোগিতায় তা করা হচ্ছিল এবং তারা মালামালের কোন রেকর্ড বা ইনভেন্ট্রি লিস্ট মেইন্টেইন করত না। এই বছর আমরা সব কোল্ড স্টোরেজ এবং খেজুর ও মাংস আমদানীকারকদের নিকট হালনাগাদ মালামালের মেয়াদ সহ কোল্ড স্টোরেজে রক্ষিত খেজুর ও মাংসের পরিমাণ এবং আমদানির তারিখ এবং কাগজপত্র দাখিল করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। এখন থেকে প্রতি মাসে তা দাখিল করা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। এতে করে আশা করা যায়, আমদানি করা খেজুর এবং মাংসের অনিয়ম দূর করা সম্ভব হবে।

৪১। আমরা আমদানি করা সকল খাদ্য এবং খাদ্য উপকরণে স্টিকারযুক্ত উৎপাদন এবং মেয়াদের তারিখ ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছি। উৎপাদন এবং মেয়াদের তারিখ হতে হবে স্পষ্টাক্ষরে অমোচনীয় কালি দ্বারা ছাপার অক্ষরে এবং আমদানি করা চালানের সাথে যেন খুচরা পর্যায়ে বিক্রির সময় সেই পণ্যের মিল বা সামঞ্জস্য থাকে, সে জন্য প্রতিটি চালান আমদানির সময় এলসি নাম্বার, আমদানি করা পণ্যের প্রতিটি কার্টুন বা বক্সে তা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছি। এতে করে খোলা বাজারে আমদানি করা প্রতিটি পণ্যের উৎস্য সনাক্ত করা অতি সহজ হবে এবং ইচ্ছাকৃত ম্যানুপুলেশন বন্ধ হয়ে যাবে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে আমি ছিলাম সদস্য (ইন-সি-টু অতিরিক্ত সচিব) এবং প্রায় আড়াই মাস ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। উপরে বর্ণিত সব কাজ ছিল আমার ব্রেইন চাইল্ড। দেশ থেকে খদায় ভেজাল দূর করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করেছিলাম। সেখান থেকে বদলি হয়ে চলে যাই রেলে। 

৪২। বিকাশ একাউন্ট হতে প্রতারকদের প্রতারণা বন্ধ করা। বিকাশের মাল্টি ডিভাইস লগ ইন সিস্টেমের কারণে প্রতারকরা বিকাশ গ্রাহকদের কাছ থেকে চালাকি, প্রতারণার ফাঁদে ফেলে কিংবা লোভ দেখিয়ে গ্রাহকের পিন নাম্বার এবং ওটিপি নিয়ে গ্রাহকের একাউন্ট থেকে সব টাকা হাতিয়ে নিত। মাল্টি ডিভাইস লগইন বন্ধ করে নীতিমালা অনুযায়ী সিঙ্গেল ডিভাইস লগইন সিস্টেম চালুর জন্য বিকাশ কর্তৃপক্ষের সাথে বারংবার যোগাযোগ সব বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ দাখিল করেছিলাম। ফলশ্রুতিতে বিকাশ মাল্টি ডিভাইস লগইন বন্ধ করে সিঙ্গেল ডিভাইস লগইন সিস্টেম চালু করেছে।অর্থাৎ একটি একাউন্ট থেকেই আপনি এখন ট্রানজেকশন করতে হবে। ওটিপি পিন নাম্বার দিয়েও আর অন্য ডিভাইস থেকে একাউন্ট চালানো যাবে না।

আপাতত বন্ধ হয়ে গেল প্রতারকদের রাস্তা। রক্ষা পেল গ্রাহকদের কষ্টার্জিত অর্থ প্রতারকদের কবল থেকে।

৪৩। হরলিক্স এর বিতর্কিত বিজ্ঞাপন “Taller Stronger Sharper” বন্ধের ব্যবস্থা নেয়া।

৪৪। এছাড়া রেলের শতভাগ অনলাইন/অফ-লাইন (কাউন্টার) টিকিট চালু , ইন্টারসিটি ট্রেনে স্ট্যান্ডিং টিকিট বিক্রি বন্ধ, অনলাইন রিফান্ড সিস্টেম চালু, টিকিট কালোবাজারি সম্পুর্ণ দূর করণে রিয়েলটাইম এনআইডি ভেরিফিকেশন করে অনবোর্ড "টিকিট যার, ভ্রমণ তার" নিশ্চিত করার সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহন। রেলের যাত্রীসেবা বৃদ্ধিতে আমি ২০১৫ সাল থেকেই রেল সচিব জনাব ফিরোজ সালাউদ্দিন স্যারের সাথে কাজ শুরু করি। আমি তখন পরিচালক, বিনিয়োগ বোর্ড চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলাম। তখন থেকেই প্রতি তিনমাস অন্তর রেলের অংশীজন সভায় যাত্রী প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকতাম। এটাই ছিল রেলের কল্যাণে আমাদের একটি সক্রিয় ফোরাম। যা অব্যাহত ছিল প্রাক্তন রেল সচিব জনাব মোফাজ্জল হোসেন স্যারের শেষ সময় পর্যন্ত। এরপর রেলে আমার পোস্টিং হয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


একজন দেশপ্রেমিক ও দূরদর্শী প্রশাসনিক কর্মকর্তার কর্মজীবনের অনন্য দলিল

প্রকাশের তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

লেখক: মো. মাহবুব কবীর মিলন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব

ইদানিং জেন-জি'রা প্রায় জানতে চায়, চাকুরি জীবনে আমি কী করেছি আগে!! মানে ঘাস কেটেছি কিনা। শিশুদের জানার জন্য আবার রিপোস্ট করলাম। যারা পড়েছেন আগে, তাদের জন্য নয়।

আমার কর্ম জীবনের কিছু এ্যাচিভমেন্ট ( Achievement) বা অর্জন। নতুন সরকারি কর্মকর্তা এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমার চাকুরিজীবনের সামান্য প্রচেষ্টাগুলো তুলে ধরলাম, যাতে তাঁরা সাহসী হয়।

এখানে বিন্দুমাত্র মিথ্যা বা অসততা নেই। বানান ভুল এবং অতি বড় লিখার  জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। 

   ১। ফরমালিনের অপব্যবহার দূরীকরণঃ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১৫ সালে “ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫ চুড়ান্ত হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এর পর এই আইনের মারাত্মক একটি ত্রুটি নজরে আসে আমার। আমদানি নীতি আদেশে “ফরমালিনের” সংজ্ঞায় শুধু “ফরমালিন” শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছিল, অথচ ফরমালিনের আরও ১০টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নাম রয়েছে। যা সংজ্ঞায় আনা প্রয়োজন। পরদিন চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে গিয়ে জানতে পারি বিগত এক বছরে অন্য দশটি নামে ফরমালডিহাইড পাউডার (১:৪০ জ্বলীয় দ্রবন=ফরমালিন) আমদানি হয়ে এসেছে প্রায় ১৭৫০০ মেঃটন, অথচ ঐ সময়ে আইনের সংজ্ঞায় উল্লেখিত ফরমালিন আমদানি হয়েছে মাত্র পাঁচ কেজি।

সংজ্ঞায় ফরমালিনের সাথে অন্য ১০টি নাম উল্লেখ করে আমি বিকালেই তা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে ইমেইল করি। তা করা না হলে আইন পাশ হলেও ফরমালিনের বাণিজ্যিক আমদানি বন্ধ করা যেত না। পরদিন আইন মন্ত্রী মহোদয় জনাব আনিসুল হক স্যারের সাথে চট্টগ্রাম থেকে ফোনে সরাসরি কথা বলে বিষয়টি বিস্তারিত জানাই। তিনি ফরমালিনের অন্য দশটি নাম লিখে নেন। আইন মন্ত্রী মহোদয় আইনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হতে ফেরত এনে আইনের সংজ্ঞায় সব নাম যুক্ত করে চুড়ান্ত করেন। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ করি যাতে দ্রুততম সময়ে আমদানি নীতি সংশোধন করে ফরমালিনের অন্য দশটি নাম যুক্ত করে শিল্প ছাড়া ফরমালিনের বাণিজ্যিক আমদানি বন্ধ করে দেয়া হয়। সংশোধন করা হয় আমদানি নীতি। বন্ধ হয়ে যায় ফরমালিনের বাণিজ্যিক আমদানি। ফলে বন্ধ হয়ে যায় খোলা বাজারে ফরমালিনের ক্রয় বিক্রয়। বাজারে ফরমালিন নেই, কাজেই এর অপব্যবহারও নেই। ২০১৫ হতে আজ পর্যন্ত আর এক কেজি ফরমালিন বাণিজ্যিকভাবে আমদানি হয়নি। দেশে কোথাও খোলা বাজারে ফরমালিন বিক্রি হয় না। 

ফরমালিন আইন ও বিধি প্রণয়ন এবং তা কঠিনভাবে বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন সেই সময়ের সিনিয়র বাণিজ্য সচিব জনাব Hedayetullah Al Mamoon স্যার এবং বর্তমান পরিকল্পনা সিনিয়র সচিব আমার বন্ধু Satyajit Karmaker মহোদয়।

২। ক্যালসিয়াম কার্বাইডের অপব্যবহার দূরীকরণঃ ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে সরকার। শুধু শিল্পে ব্যবহারের জন্য এর আমদানি নিয়ন্ত্রিত। কাঁচামাল হিসেবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সারা দেশে মাত্র ১১টি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে আমদানির পারমিশন দিয়েছে বিস্ফোরক অধিদপ্তর, অথচ বাজারে অবাধে ক্রয় বিক্রয় হয়ে থাকে ক্যালসিয়াম কার্বাইড। এই আইন ঘাঁটতে গিয়ে লক্ষ্য করি যে একটি বিশাল ত্রুটি রয়ে গিয়েছে এর লাইসেন্সের শর্তাবলীতে। শিল্প ছাড়া আমদানি, ক্রয়, বিক্রয় পরিবহন নিষিদ্ধ হলেও লাইসেন্সের শর্তাবলীর ৯ নাম্বার ধারায় সুস্পষ্ঠ উল্লেখ রয়েছে যে, দেশে যে কোন ব্যক্তি বা আমদানিকারক, যে কোন ব্যক্তির কাছে ২০ কেজি পর্যন্ত ক্যালসিয়াম কার্বাইড ক্রয় বিক্রয়, পরিবহন ও মজুদ করতে পারবে। ২০ কেজি ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে সারা দেশের এক সিজনের আম বা ফল পাকানো যায়। লাইসেন্সের এই ত্রুটিযুক্ত শর্তাবলীর জন্য বাজারে সহজলভ্য ছিল ক্যালসিয়াম কার্বাইড। আমি বিষয়টি লিখিতভাবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের নিকট তুলে ধরি। মন্ত্রণালয় বেশ কয়েকটি সভা করে (সব ক’টিতে আমি উপস্থিত ছিলাম) লাইসেন্সের ত্রুটিযুক্ত শর্তাবলী বাতিল করে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের অবৈধ ব্যবহারের জন্য ছয় মাসের শাস্তি আরোপ করে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে। বন্ধ হয়ে যায় ক্যালসিয়াম কার্বাইডের বাণিজ্যিক ক্রয় বিক্রয়, সরবরাহ ও মজুদ। এখন ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

কৃতজ্ঞতা DG Ahsanul Jabbar  স্যার

৩। হার্টের রোগীর রিং (স্টেন্ট) এর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণঃ ড্রাগ প্রশাসনের নীতিমালা বা আইনে চিকিৎসা খাতে নিত্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা সামগ্রীর মূল্য বেঁধে দেয়া বা এমআরপি (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) নির্ধারণ করার ব্যবস্থা থাকা সত্বেও দেশে হার্টের রোগীর রিং (স্টেন্ট) এর মূল্য ছিল লাগামহীন। যে যেভাবে পারত স্টেন্ট এর দাম আদায় করত অসহায় রোগির কাছ থেকে। এক চিকিৎসকের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে হার্টের রোগীর রিং (স্টেন্ট) এর এমআরপি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য বিষয়টি নিয়ে পোস্ট দেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন পেজে। সেখানে প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ স্যারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলে, চিঠি লিখি প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি স্যারের কাছে। কপি প্রেরণ করা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সহ মহাপরিচালক ড্রাগ প্রশাসন মহোদয়ের নিকট। একাধিক সভা আহ্বান করে ড্রাগ প্রশাসন। উপস্থিত ছিলাম আমি সেখানে। এরপর হার্টের স্টেন্ট বা রিং এর এমআরপি নির্ধারণ করা হয়। তিন থেকে চার লাখ টাকার স্টেন্ট এর দাম নেমে আসে সর্বোচ্চ ১থেকে ১.৫ লক্ষ টাকায়।

কৃতজ্ঞত Abul Azad স্যার

 @জাহিদুর রহমান (ভাইরোলজিস্ট)

৪। ইয়াবা তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ায় ঔষধের উপাদান সিউডোএফিড্রিন নিষিদ্ধ ঘোষণাঃ এক ঔষধের দোকানে জানতে পারি সর্দি কাশির সিরাপের উপাদান সিউডোএফিড্রিন পাউডার দিয়ে ইয়াবা ট্যাবলেট বানানো হচ্ছে। বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানিগুলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত পাউডার আমদানি করে তা ব্ল্যাক মার্কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে, যা দিয়ে ইয়াবার মূল উপাদান মেথাএম্ফিটামিন বানানো হয়। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে এর সত্যতা যাচাই করে নেই। আরো জানতে পারি যে, সিউডোএফিড্রিন এর ব্যবহার পৃথিবীর অনেক দেশেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ এবং চিকিৎসা খাতে অনেক বিকল্প উপকরণ থাকায় সিউডোএফিড্রিন এর কোন প্রয়োজন নেই। এটা অবশ্যই আমাদের দেশেও নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে সিউডোএফিড্রিন যুক্ত একটি কফ কাশির ট্যাবলেট দিয়ে দশটি ইয়াবা বানানো যায়। সেই সময় ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ, ঢাকা শহরে চারটি ইয়াবা তৈরির কারখানার খোঁজ পায়। তারমানে দেশেই ইয়াবা তৈরি শুরু হয়েছিল।

এরপর আমি সিউডোএফিড্রিন যুক্ত কয়েকটি ট্যাবলেট এবং সিউডোএফিড্রিন আমদানি, ক্রয় বিক্রয় এবং ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য চিঠি সহ দেখা করি প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ স্যারের সাথে এবং ট্যাবলেট ও চিঠি প্রদান করি তাঁর হাতে। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নির্দেশ দেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য সচিব স্যারকে (বর্তমানে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান) সভাপতি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ডিজি ড্রাগ প্রশাসন, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সহ একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে দেন। কমিটি অনেকগুলো সভা করে অবশেষে সিউডোএফিড্রিন পাউডারের আমদানি এবং ব্যবহার নিষিদ্ধ করা সহ সিউডোএফিড্রিন দিয়ে বানানো সব ঔষধের লাইসেন্স বাতিল করে ঐসব ঔষধ বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। যা এখনো কার্যকর আছে। এরফলে বন্ধ হয়ে যায় দেশে ইয়াবা তৈরির কারখানা।

কৃতজ্ঞতা @Abul Azad স্যার

৫। ইন্টারনেট পর্ণগ্রাফি বন্ধে ব্যবস্থাঃ একবার ঈদে রংপুরে গ্রামের বাড়ি গিয়ে জানতে পারি যে, গ্রামের ছেলেরা বাজারে গিয়ে ১০ টাকা দিয়ে দুই জিবি পর্ণগ্রাফি মোবাইলে ডাউনলোড করে দেখে এবং এই আসক্তিতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তারা। এ থেকে আমাদের বাড়ির কৃষি কাজের ছেলেও মুক্ত ছিল না। পর্ণগ্রাফি আসক্তিতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে যুব সমাজ। ফিরে এসে প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ স্যারের কাছে তা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চিঠি লিখি। কপি প্রদান করি তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব স্যারের কাছে এবং দেখা করি তাঁর সাথে। পৃথিবীর অনেক দেশেই পর্ণগ্রাফি নিয়ন্ত্রিত, অথচ আমাদের দেশে অবাধ এবং সহজ এক্সেস। প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি স্যার সেই চিঠির প্রেক্ষিতে দ্রুত একটি প্রজেক্ট নেয়ার জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয়কে নির্দেশ প্রদান করেন। অবশেষে প্রায় ১৬০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়, যা বাস্তবায়ন করে ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমিউনিকেশন বা ডট। সাইবার থ্রেট ডিটেকশন এন্ড রেসপঞ্জ নামে এটি এখন নিয়ন্ত্রণ করছে বিটিআরসি। যেখানে পর্ণগ্রাফী নিয়ন্ত্রণ সহ আরও অনেক কাজ করা হচ্ছে।

কৃতজ্ঞতা @abul azad স্যার

৬। ঘন চিনি বা সোডিয়াম সাইক্লামেট খাদ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ি মিথ্যা ডিক্লারেশন দিয়ে অন্য নামে সোডিয়াম সাইক্লামেট আমদানি করে আসছিল। এছাড়া সোডিয়াম সাইক্লামেট এর সাথে জমিতে ব্যবহারের রাসয়নিক সার সোডিয়াম সালফেট মিশ্রণ করে প্যাকেটজাত অবস্থায় বিক্রি করা হচ্ছিল খোলা বাজারে। যা ব্যবহৃত হত সারা দেশে বেকারি এবং মিস্টিতে। সোডিয়াম সাইক্লামেট এর সাথে যে সোডিয়াম সালফেট সার মেশানো হত তার কোন ক্লু বা প্রমাণ কোথাও ছিল না। আমার নিজের চেষ্টায় তা অনুধাবন করে খামার বাড়ি মৃত্তিকা গবেষণা ও উন্নয়ন ইন্সটিটিউট (এসআরডিআই) হতে পরীক্ষা করে সন্দেহের যথার্থতা প্রমাণিত হয় যে, তা সোডিয়াম সালফেট রাসয়নিক সার। এরপর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিষয়টি কাস্টমস সহ র্যা ব এবং পুলিশকে অবহিত করি।

৭। চায়না থেকে অননুমোদিতভাবে সম্পূর্ণ তৈরি বা ফিনিশড মশার কয়েল আমদানি বন্ধে বিএসটিআইকে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। উল্লেখ্য যে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফিনিশড মশার কয়েল আমদানি হয়ে আসে দেশে, যা সম্পূর্ণ বে-আইনি।

৮। সংশোধীত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০১৮ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিধিমালা প্রণয়নে গ্রুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ তে কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব প্রেরণ। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড আইন, ২০১৮ প্রণয়নে গ্রুত্বপূর্ণ প্রস্তাব প্রেরণ।

৯। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক প্রেরণে “গামকা” এক মারাত্মক হয়রানির নাম। গামকা কর্তৃক নির্ধারিত ২৫টি প্যাথলোজি বা ক্লিনিক ছাড়া অন্য কোথাও থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট গ্রহন করা হয় না। এই কারণে প্রবাসে গমনেচ্ছু শ্রমিকরা মারাত্মক হরানির স্বীকার হয়ে থাকেন প্রতিনিয়ত। অতিরিক্ত টাকা ছাড়া রিপোর্ট দেয়া হয় না। এই গামকা সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিয়ে সারা দেশে ভাল ভাল হাসপাতাল বা ক্লিনিককে মধ্যপ্রাচ্যে গমনেচ্ছু শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয় সচিব মহোদয় বরাবর চিঠি প্রেরণ।

১০। দেশে ফ্রি ল্যান্সারদের সুবিধা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধির লক্ষ্যে অতি প্রয়োজনীয় গেটওয়ে “পেপাল” চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী এবং সচিব মহোদয় বরাবর চিঠি প্রেরণ।

১১। শিশু নির্যাতনের ধরণে পৈশাচিকতা ও বর্বরতা ভয়ানক বেড়ে যাওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ সংশোধন করে আরও কঠিন শাস্তির বিধান করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় বরাবর চিঠি প্রেরণ।

১২। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক এবং নিন্ম-মাধ্যমিক ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে একটি যুগোপযোগী এবং কল্যাণকর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষা আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে প্রাথমিক এবং গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।

১৩। কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিন সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত এলাকায় নেটিং/ফেন্সিং করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।

১৪। বাসে চলাচলরত নারীদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনে জরুরি সার্ভিসের (৯৯৯) সাহায্য পাওয়ার জন্য প্রতিটি গণপরিবহনের (বাস/রাইডার ইত্যাদি) অভ্যন্তরে চার পাশে গাড়ির নাম্বার বড় হরফে স্পষ্টাক্ষরে লিখা বাধ্যতামূলক করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সচিব এবং চেয়ারম্যান, বিআরটিএ মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।

১৫। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে চাকুরি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে করা প্রাথমিক আবেদনে, সার্টিফিকেট এবং ফটো সত্যায়ন ব্যবস্থা তুলে দেয়ার প্রয়জোনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে সচিব, সমন্বয় ও সংস্কার, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ।

১৬. কৃষকরা যাতে ধানের ন্যায্য মূল্য পায় সে জন্য অবশ্যই প্রতি বছর মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই ধান ক্রয় শুরু করার ব্যবস্থা গ্রহনের অনুরোধ জানিয়ে খাদ্য সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ। কারণ এপ্রিলের মধ্যভাগ থেকেই বোরো ধান কাটা শুরু হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় আদেশ দিয়ে তা সব উপজেলায় প্রেরণ এবং ধান ক্রয় শুরু করতে জুন মাস নাগাদ লেগে যায়। ততদিনে প্রান্তিক চাষিরা মাঠ থেকেই দালাল ফড়িয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিকট কম মূল্যে ধান বিক্রি করে দেয়। ফলে সরকারি মূল্য থেকে বঞ্চিত হয় কৃষক।

১৭। দেশে আমদানী হয়ে আসা কীটনাশক বন্দরে আসার পর কোন প্রকার ল্যাব পরীক্ষা ছাড়াই খালাস হয়ে থাকে। কোন কোন আমদানিকারক নিষিদ্ধ কীটনাশক নিয়ে আসলে বা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অন্য কিছু নিয়ে আসলে তা ধরার কোন উপায় নেই। এছাড়া কীটনাশকের লাইসেন্স নেয়ার সময় আবেদনকারীর আবেদনে উল্লেখিত সবগুলো ঘোষণার সত্যতা যাচাইয়ের সক্ষমতা কৃষি বিভাগের নেই। মাঠ পর্যায়ে কৃষক সকালে কীটনাশক স্প্রে করে বিকালে বাজারে বিক্রি করে, রাতে তা আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহন করে থাকি। এই প্রি-হারভেস্ট ইন্টারভেল মেনে না চলার জন্য কীটনাশকের রেসিডিউ যাচ্ছে খাদ্যের সাথে আমাদের শরীরে। দেখা দিচ্ছে নানান জটিল রোগ। এসব কিছু থেকে উত্তরণের উপায় সহ ১০টি আন্তর্জাতিক মানের প্রটোকল আমি তৈরি করে তা বাস্তবায়নের অনুরোধ জানিয়ে কৃষি সচিব মহোদয় বরাবর পত্র প্রেরণ করি।

১৮। টঙ্গী ভৈরব, লাকসাম চিনকি আস্তানা ডাবল লাইন চালুর পর ঢাকা চট্টগ্রাম ননস্টপ ট্রেন ৬.৩০ ঘন্টা থেকে বর্তমানে পাঁচ ঘন্টা দশ মিনিট করা, বায়োটয়লেট চালু করা, প্রতিটি কোচের ছাদে অপ্রয়োজনীয় এসিপি সিস্টেম তুলে দেয়া, ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করে আনা নতুন কোচের অসংখ্য ত্রুটি চিহ্নিত করা এবং পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া হতে আনা ২৫০টি কোচে সেসব ত্রুটি দূর করে ডিজাইন কনফার্ম করা, ট্রেনের ইঞ্জিন হতে তেল চুরি বন্ধে তেলের ট্যাংকে আধুনিক জিপিএস ডিভাইস স্থাপন, নতুন ক্রয় করা সব লোকোতে চালকদের জন্য ক্যাবে এসি সিস্টেম চালু করা, যাত্রী টিকেটে যাত্রীর নাম ও মোবাইল নাম্বার উল্লেখ করা, ইঞ্জিন এবং ছাদে অবৈধ যাত্রী তোলা বন্ধে কমলাপুর এবং বিমানবন্দর স্টেশনে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে তাঁর মনিটর রেল মন্ত্রী, সচিব এবং ডিজি মহোদয়ের অফিস কক্ষে স্থাপন সহ রেলের অসংখ্য উন্নয়ন ও অনিয়ম দূরীকরণে আমার সরাসরি ভূমিকা রয়েছে।

১৯। আবুল কালাম আজাদ স্যার ( প্রাক্তন এসডিজি মূখ্য সমন্বয়ক) তখন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব। আমি কাজ করছি বিনিয়োগ বোর্ডের পরিচালক, চট্টগ্রাম। দেশে চলছে মারাত্মক লোড শেডিং। জনগণকে অন্ধকারে (শেডিং) রেখে পিডিবি নিয়ম ভঙ্গ করে অর্থের বিনিময়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে। চট্টগ্রাম থেকে বিদ্যুৎ সচিব বরাবর করা এমন একটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হল আমাকে। কমিটির সভাপতি হলেন বর্তমান রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব, তৎকালীন যুগ্ম-সচিব (উন্নয়ন), বিদ্যুৎ বিভাগ। মাঠ পর্যায়ে ইনটেন্সিভ তদন্তের ভার পড়ল আমার উপর। কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, স্ক্যাডা কন্ট্রোল রুম, চট্টগ্রাম পিডিবি প্রধান প্রকৌশলী সহ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং ঢাকাস্থ ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাস সেন্টার (এনএলডিসি) পরিদর্শন করে তাঁদের সবার বক্তব্য নেয়া হল।

এই তদন্ত করতে গিয়ে একটি ভয়াবহ বিষয় উদ্ঘাটন করলাম আমি। সরকারের কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি। সারা দেশে লোড শেডিং চালু রেখে, সবচেয়ে কম খরচে যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, সেই কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরেও এনএলডিসি থেকে ক্যারিয়ারের মাধ্যমে (সরাসরি ফোন) মৌখিক নির্দেশে দৈনিক প্রায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে রাখা হচ্ছিল। সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে একই চিত্র পাওয়া যায়। তারমানে শুধু কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে সরকারের ক্ষতি হচ্ছিল দৈনিক ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের আয়। হাজার হাজার মেগাওয়াট লোড শেডিং রেখে সবচেয়ে কম খরচে উৎপাদিত দিনে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন শাট ডাউন করে রাখ হত, তার সদুত্তোর দিতে পারেনি এনএলডিসি বা পিডিবির অন্য কেউ।

তদন্তে অনিয়ম করে শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বেশি বিদ্যুৎ প্রদানের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। লোড শেডিং চালু রেখে এভাবে সক্ষমতা থাকা সত্বেও কাপ্তাই জলবিদ্যুত কেন্দ্র সহ অন্যান্য কেন্দ্রে উৎপাদন কমিয়ে রাখা বা শাট ডাউন করে রাখা বন্ধ হয়ে যায়, তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার পর। বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হতে রক্ষা পায় সরকার। আমি ইঞ্জিনিয়ার নই বা বিদ্যুতে কখনো চাকুরিও করিনি। ঘটোনাচক্রে সেই তদন্ত কমিটির সদস্য হতে হয়েছিল আমাকে। এ তদন্ত করতে গিয়ে বিদ্যুতের অসংখ্য অনিয়ম এবং চুরি বা দুর্নীতির ঘটনা জানতে পেরেছিলাম।

২০। স্বাধীনতা যুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল তৎকালীন ইপিআর (বিজিবি) এর একটি দল দিনাজপুর ক্যাম্প থেকে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এসে দিনাজপুর দশ মাইল নামক এলাকার বাজারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিসের সামনে খানসেনাদের প্রতিহত করতে অবস্থা নেয়। সাথে ছিল এলাকার কিছু লোকজন। দিনাজপুর থেকে পাকসেনারা এগিয়ে আসলে শুরু হয় গোলাগুলি। চলতে থাকে প্রচন্ড যুদ্ধ। ইপিআর এর বীর দুই যোদ্ধা ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এবং হাবিলদার মিয়াঁ হোসেন চালাচ্ছিলেন সিক্স পাউন্ডার গান (মর্টার)। ইতিমধ্যে নিলফামারীর সৈয়দপুর (বিমানবন্দর) হয়ে খান সেনাদের আর একটি দল এসে অন্য পাশ থেকে আক্রমণ চালায় ইপিআর বাহিনীর উপর। দুই দিক হতে প্রচন্ড আক্রমণে টিকতে না পেরে ইপিআর এর বীর যোদ্ধারা পিছু হটতে থাকে, পিছিয়ে যায় জনগণ। কিন্তু জান বাজী রেখে সিক্স পাউন্ডার গান থেকে ফায়ার করতে থাকেন ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এবং হাবিলদার মিয়াঁ হোসেন। পিছু হটা সঙ্গী সাথীরা সবাই যখন চিৎকার করে তাঁদের পিছু হটতে বলছিলেন, তখনও নিজ অবস্থান থেকে এক ইঞ্চি সরেননি মোস্তাফিজুর রহমান এবং মিয়াঁ হোসেন। তাঁরা উভয়ে চিৎকার করে উত্তর দেন, “দেহে এক বিন্দু রক্ত থাকতে দেশের এক ইঞ্চি মাটি ছাড়ব না শ্ত্রুদের কাছে।“ মাটি ছাড়েননি তাঁরা। খানসেনাদের গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাঁদের দেহ। এক সময় চলে যায় খানসেনারা। পড়ে থাকে দুই শহীদের লাশ।

এলাকার জনগণ পরে একত্রিত হয়ে দশ মাইল বাজারের এক দোকানের পিছনে একটি কবর খুড়ে তাঁদের দুই জনের লাশ দাফন করে একই কবরে।

বেঁচে থেকে এক ইঞ্চি মাটি ছাড়েননি, সেই শহীদ বীর দুইজনের ঠিকানা, পরিবার রয়ে যায় অজানা। কোন রেকর্ডে তাঁদের হদিস ছিল না। দিনাজপুরের মুক্তিযোদ্ধারা প্রতি বছর ১২ এপ্রিল এলাকায় জড় হয়ে তাঁদের মৃত্যু দিবস পালন করে থাকেন।

আমি এই খবর দিনাজপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে জানার পর তাঁদের দুই পরিবারের সন্ধানে নেমে পড়ি। দিনাজপুর বিজিবি সেক্টর কামান্ড এবং রংপুর সেক্টর কমান্ড অফিসে খোঁজ করে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। সেদিনের যুদ্ধে সাথে ছিলেন এমন একজন যোদ্ধা পরে মৃত্যু বরণ করায় সমুদ্রে পড়তে হয় আমাকে। দিনাজপুরের জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলেছি। তাঁদের অনেকেই বিভিন জেলার নাম বলছিলেন।

অনেকদিন ধরে আমি প্রায় ২০টি জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও নাম নেই তাঁদের দুই জনের। বিজিবি হেড কোয়াটারে খোঁজ করেও কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। বারবার ফোনে অনুরোধ করতে থাকি বিজিবি হেড কোয়াটারে রেকর্ড রুমের দায়িত্বে থাকা মেজর সাহেবের সাথে। তিনি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে একদিন সেই সুসংবাদ দিলেন। পাওয়া গেল তাঁদের ঠিকানা, তবে শুধু উপজেলা এবং জেলার নাম।

ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এর বাড়ি ভোলার বোরহান উদ্দিন উপজেলা এবং হাবিলদার মিয়াঁ হোসেনের বাড়ী নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলা। ইউনিয়ন এবং গ্রামের ঠিকানা নেই। ফোন দিলাম দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে। বললাম, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে নিয়ে এই দুই শহীদের বাড়ী এবং পরিবারের হদিস বের করতে। এসে গেল সেই ক্ষণ। ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান এঁর বাবা মা মারা গিয়েছে অনেক আগেই। বেঁচে আছেন তাঁর এক বোন আর এক ভাই। অপরদিকে হাবিলদার মিয়াঁ হোসেন এঁর স্ত্রী এবং একমাত্র ছেলে আছেন।

সবার সাথে মোবাইলে কথা বলে নিজে কাঁদলাম, কাঁদালাম তাঁদের। স্বাধীনতার প্রায় ৪৪ বছর পর স্বজনেরা খোঁজ পেলেন তাঁদের দুই বীর শহীদের কবর। এঁরা সবাই গিয়েছিলেন দিনাজপুর দশ মাইল বাজারে, যেখানে শুয়ে আছেন দুই শহীদ। এই কাহিনী ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসের কথা।

২১। হাজেরা খাতুন। স্বামী শহীদ কনস্টেবল আঃ ছাত্তার। পুলিশ সদস্য কনস্টেবল আঃ ছাত্তার শহীদ হন ৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১। কুষ্টিয়া সদর থানা পাহারত অবস্থায় পাক হানাদার বাহিনী থানা আক্রমন করে। আঃ ছাত্তার সাথের তিনজন কনস্টেবল সহ জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ চালিয়ে যান। তাঁরা কেউ এক ইঞ্চি মাটি ছাড়েনি। সবাই শহীদ হন। পরে জনগণ থানার পাশে এক কবরে দাফন করেন তাঁদের। আজও কেউ জানে না কোথায় তাঁরা শুয়ে আছেন।

স্বাধীনতার পরে হাজেরা বেগম স্বামী মৃত্যুর খবর পান। এক মেয়ে ছিল, বিয়ে হয়ে গেছে। স্বাধীনতার ৪৪ বছর ধরে চেষ্টা করেও হাজেরা খাতুন তাঁর স্বামী যে কনস্টেবল ছিল এবং যুদ্ধ করে থানায় শহীদ হয়েছিলেন, তার কোন প্রমাণ বা কাগজ বের করতে পারেন নি। যার ফলে বিধবা শহীদ পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি আজ পর্যন্ত ভাতা পাননি।

৩ বছর আগে জানতে পারি সে দুঃখজনক ঘটনার কথা। শুরু করলাম তালাশ। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক, এসপি এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহোদয় এবং কয়েকজন পুলিশ ভাইয়ের সাথে কথা বললাম। এসপি সাহেব এবং পুলিশ রেকর্ড রুম থেকে জানালেন, এর আগেও তাঁরা হাজেরা খাতুনের আবেদনের ভিত্তিতে অনেক খুঁজেও আঃ সাত্তার এঁর কোন তথ্য পাননি তাঁরা। আমি আবার নতুন করে খুঁজতে বিনয়ের সাথে অনুরোধ জানালাম। শুরু হল আবার সেই মহৎ উদ্যোগ। তাঁদের সবার ঐকান্তিক আগ্রহ, আন্তরিকতা এবং অনেক চেষ্টার পরে খুঁজে পাওয়া গেল শহীদ কনস্টেবল আঃ ছাত্তার এঁর তথ্য। হাজেরা খাতুন পান তাঁর স্বামী শহীদ হবার স্বীকৃতি, কাগজে কলমে।

মৃতপ্রায় হাজেরা খাতুন বিছানায় শুয়ে কাঁদেন তাঁর শহীদ স্বামীর সেই স্বীকৃতি পত্র নিয়ে, যা পেতে তাঁর ৪৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। যে শহীদেরা এক ইঞ্চি মাটি ছাড়েনি, জীবন দিয়েছেন।

২২। লিভার ব্রাদার্সের “ফেয়ার এন্ড লাভ্লি” ক্রিমের প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন, “বিশ্ব জয় করে এবং দুবাই সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সকল ক্রিমকে হারিয়ে দেয়ার বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ করে তা বন্ধের ব্যবস্থা নিয়েছিলাম।

উপরের সবগুলো কাজ (১-২২) করেছি ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত, যখন আমি বিনিয়োগ বোর্ডের পরিচালক (উপ সচিব/যুগ্ম সচিব) হিসেবে কর্মরত ছিলাম এবং এই সব কাজ ছিল আমার নিজ দাপ্তরিক কাজের বাইরে, আউট অব মাই ডেস্ক।

২৪ আগস্ট ২০১৭ সালে আমি সদস্য (আইন ও নীতি) হিসেবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে যোগদান করি। পরের সব কাজগুলোতে সবার সাহায্য পেয়েছি এবং তা সব ছিল আমার ব্রেইন চাইল্ড।

২৩। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয় ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫। আমি এখানে যোগদান করার আগ পর্যন্ত একটি খাদ্য পণ্য বা খাদ্য উপকরণ ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়নি। জয়েন করেই হাতে নেই খাদ্য পণ্য পরীক্ষা করার প্রোগ্রাম। একই খাদ্য এক বা একাধিক ল্যাবে পাঠানো শুরু হয়। বর্তমান পর্যন্ত এমন কোন খাদ্য নেই যা পরীক্ষা করা হয়নি। যেগুলোতে সমস্যা পাওয়া যায়, সব কোম্পানিকে ডেকে মোটিভেশন, সতর্ক করা সহ তাঁদের সবাইকে সময় বেঁধে দেয়া হয়। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এসবের পুরো দায়িত্ব ছিল আমার উপর।

২৪। জানতে পারি বিভিন্নন কোম্পানি এনার্জি ড্রিঙ্কস বানাচ্ছে বিএসটিআই থেকে কার্বোনেটেড বেভারেজের (কোক, সেভেন আপ, ফান্টা মিরিন্ডা ইত্যাদি) লাইসেন্স নিয়ে। যা একেবারেই অবৈধ। কারণ এনার্জি ড্রিংক এবং কার্বোনেটেড বেভারেজ আলাদা পণ্য। এনার্জি ড্রিংকস এ উচ্চমাত্রায় ক্ষতিকর ক্যাফেইন থাকে। বিএসটিআই এনার্জি ড্রিংক্স বানাবার অনুমতি দেয় না বা স্ট্যান্ডার্ড (বিডিএস) নেই তাদের। সারা দেশে বাচ্চাদের অতি প্রিয় ড্রিংক হচ্ছে এই এনার্জি ড্রিংক্স। সব কোম্পানির এনার্জি ড্রিংক কয়েকটি ল্যাবে পরীক্ষা করে উচ্চ মাত্রায় (একটিতে ৭৫০ এমজি/লিটার) ক্যাফেইন পাওয়া যায়। যেহেতু এনার্জি ড্রিংকস এর লাইসেন্স নেই, এবং ক্ষতিকর মাত্রায় ক্যাফেইন পাওয়া গিয়েছে, বিষয়টি আমি বিএসটিআই এর কাউন্সিল কমিটির মিটিং এ (অযাচিতভাবে উপস্থিত ছিলাম) সভাপতি শিল্প মন্ত্রী জনাব আমীর হোসেন আমু মহোদয়ের নজরে নিয়ে আসি। সভায় আলোচনা শেষে এনার্জি ড্রিংস উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

পরবর্তিতে বিএসটিআই এনার্জি ড্রিংক্স এর স্ট্যান্ডার্ড তৈরিতে উদ্যোগ গ্রহন করে, যেখানে উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইন এর অনুমতি দেবার কথা বলা আছে। আমি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তাতে বাধা প্রদান করি। এরপর জনগণের মতামত নেয়া হয়। সেখানেও এনার্জি ড্রিংক্স এর বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করা হয়। অতঃপর বিএসটিআই এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে যে, এনার্জি ড্রিংক্স এর উৎপাদন, বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা যাবে না। যারা কার্বোনেটেড বেভারেজের নামে লাইসেন্স নিয়েছে তারা সেই নামেই সফট ড্রিংস উৎপাদন এবং বাজারজাত করতে পারবে এবং ক্যাফেইন এর সর্বোচ্চ মাত্রা হবে ১৪৫ এমজি/লিটার।

বিএসটিআই এর সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ হতে আদেশ জারি করা হয় যে, পণ্যে এনার্জি শব্দ লিখা বা বিজ্ঞাপনে তা প্রকাশ করা যাবে না এবং ১৪৫ এমজি/লিটার ক্যাফেইন এর বেশি ক্যাফেইন যুক্ত পানীয় আমদানি, উৎপাদন, ক্রয় বিক্রয় করা যাবে না। এরফলে রেড বুল এনার্জি ড্রিংকের আমদানি বন্ধ হয়ে যায়, যেহেতু রেড বুলে ক্যাফেইন এর পরিমাণ ৩২০ এমজি/লিটার। এখন দেশে ক্ষতিকর (বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য) উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইনযুক্ত ড্রিঙ্কস বাজারে নেই।

২৫। দেশি এবং বিদেশি আমদানি করা সব মাছ পরীক্ষা করালাম। দেশি প্রায় সব মাছে হেভি মেটাল সীসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়াম মাত্রা সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেল। বিদেশি আমদানি করা সব মাছেও তাই। সব কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে আমদানি করা সব মাছের চালানের হেভি মেটাল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হল। আমদানি করা মাছের চালানের প্রায় সবগুলোতে হেভি মেটাল পাওয়া যাচ্ছিল বেশি। এরপর সব ধরণের মাছের আমদানির সময় মাছ সরবরাহকারী দেশের এক্রিডেটেড ল্যাব থেকে ঐ মাছের হেভি মেটাল পরীক্ষা করে সেখানে কোন হেভি মেটাল মেটাল নেই মর্মে হেলথ সার্টীফিকেট দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা হল।

২৬। এবার দেশি মাছে হেভি মেটাল। হেভি মেটাল কেউ মেশায় না। এটা দুষণ। পরিবেশ বা খাদ্য থেকে আসে। মুরগী পরীক্ষা করেও হেভি মেটাল পাওয়া গেল মাত্রার অনেক বেশি। মাছ এবং মুরগীতে হেভি মেটাল এর উৎস একই। আমরা এদের ফিড বা খাদ্যের দিকে নজর দিলাম। ফিডের একটি উপাদান এমবিএম (মিট এন্ড বোন মিল) আসে বিদেশ থেকে। যত মরা প্রাণির হাড় মাংস গুঁড়া করে বানানো হয় এমবিএম। মারাত্মক সব রোগের আধার এই এমবিএম। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ অনেক আগেই প্রাণি ও মৎস্য খাদ্যে এমবিএম এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে শুধু আমরা ছাড়া। শত শত কোটি টাকার হাজার হাজার মেঃটন এমবিএম আমদানি করে আনা হয়। এই এমবিএম আমদানি করার পর ল্যাব পরীক্ষা করে মাল ছাড় করার জন্য প্রাণি ও মৎস্য সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় বরাবর পত্র দিয়েছিলাম প্রায় ৪ বছর আগে, যখন বিনিয়োগ বোর্ডে ছিলাম।

 বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে সদস্য হিসেবে জয়েন করার পর এসে গেল সেই সুযোগ। প্রাণি ও মৎস্য সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাথে কয়েকটি মিটিং করে তাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ হতে এমবিএম আমদানি, উৎপাদন, ক্রয় বিক্রয় ও ব্যবহার সম্পূর্ণ্রুপে নিষিদ্ধ করা হল। এটা ছিল আমার সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগ। এমবিএম নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর প্রায় ৪৫টি এমবিএম এর চালান  অন্য নামে আমদানি হয়ে আসলে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার (বর্তমান) মহোদয়ের সার্বিক সহায়তায় তা খালাস বন্ধ করে দেয়া হয়, যা বর্তমানে বন্দরে বাজেয়াপ্ত অবস্থায় আছে।

২৭। এরপর প্রাণি ও মৎস্য খাদ্যের দ্বিতীয় অভিশাপ ট্যানারি বর্জ্য। সাভার ট্যানারি পল্লী একাধিকবার ভিজিট করে সেখানে প্রচুর অ-ব্যবস্থাপনা দেখতে পাই আমরা। সেখানে ট্যানারি বর্জ্য, যা মুরগীর খাদ্যে ব্যবহার করা হয়, সেই ড্রাই পার্টের কোন ইটিপি প্ল্যান্ট করা হয়নি ট্যানারি পল্লীতে। পল্লীর কোন সিকিউরিটি প্ল্যান বা প্রোটেকশন নেই। দেয়াল চার ফিট। একদিকে সম্পূর্ণ খোলা মাঠ, দেয়াল নেই। সিসি ক্যামেরা নেই। মেইন গেট নেই। প্রতিদিন প্রায় ১২৫ মেঃটন ড্রাই বর্জ্য জমা হয়, যা পাচার হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে এবং মুরগী ও মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মুরগী, ডিম, মাছ হচ্ছে হেভি মেটালের আধার।

আমরা সুপারিশ পাঠিয়েছি শিল্প মন্ত্রণালয়ে তিন মাস সময় দিয়ে। যাতে কোনভাবেই সামান্যতম ট্যানারি বর্জ্য, ট্যানারি পল্লী হতে পাচার হয়ে বাইরে যেতে না পারে। এটা দূর হলেই আমাদের মাছ, মুরগী এবং ডিম হেভি মেটাল মুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।

২৮। খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, বেকারি মিস্টির কারখানা সমূহে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় জেল জরিমানার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান সীলগালা করার সিস্টেম চালু করেছি। যেসব প্রতিষ্ঠান খুব খারাপ অবস্থায় পাওয়া যেত সেগুলো সীল করে দেয়া হত। এতে খুব ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছিল। মালিকরা অঙ্গীকারনামা দিয়ে তাদের কিচেন সহ খাবার জায়গা বা কারখানার প্রভূত উন্নয়ন করে, তারপর তারা জনগণের জন্য তা খুলে দিত।

২৯। খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, বেকারি মিস্টির কারখানা সমূহের হাইজিন অনুযায়ী স্কোর বেজড গ্রেডিং পদ্ধতিতে সবুজ, নীল, হলুদ এবং কমলা স্টিকার দেয়া শুরু করা হয় আমার উদ্যোগে। সবুজ ৯০+ নাম্বার, নীল ৮০+, হলুদ ৪০-৭৯ এবং কমলা ৪০- নাম্বার। হলুদ স্টিকার তিন মাস এবং কমলা স্টিকার এক মাস সময়ের মধ্যে নীল বা সবুজ স্টীকারে উন্নীত করতে হয়, নাহলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। এ পর্যন্ত ঢাকা শহরে পাইলটিং ভিত্তিতে মোট ৯০টি প্রতিষ্ঠানকে স্টিকার দেয়া হয়েছে। এগুলো রেগুলার মনিটরিং করা হচ্ছে। আরো ১০০টির মত প্রতিষ্ঠান রেডি করা হচ্ছে।

৩০। সকল কোম্পানির উৎপাদিত সকল প্রকার খাদ্য পণ্যের সেলফ লাইফ বা মেয়াদ উত্তীর্ণের স্টাডি রিপোর্ট/রিসার্চ পেপার বা বৈজ্ঞানিক দলিল বা প্রমাণক বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিকট দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রায় সবাই পণ্য ভিত্তিক স্টাডি রিপোর্ট দাখিল করেছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে সেলফ লাইফ কি স্টাডি করে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে দেয়া হয়েছে, নাকি আন্দাজে দেয়া হয়েছে। এগুলো পরীক্ষা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। যারা আন্দাজে দিচ্ছেন, কোন রিসার্চ নেই, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

৩১। হৃদরোগের ঝুঁকির বড় একটি কারণ ভোজ্য তেল, ডালডা এবং বনস্পতির ট্র্যান্স ফ্যাটি এসিড। এর আন্তর্জাতিক সহনীয় মাত্রা ২ এমজি/১০০ গ্রাম। আমরা ভোজ্য তেল এবং ডালডা, বনস্পতি ল্যাব পরীক্ষা করে পাই, সব ভোজ্য তেলে ২এমজি/১০০গ্রাম এর নিচে এবং ডালডা, বনস্পতিতে ১০/১২ এমজি/১০০গ্রাম, যা অনেক বেশি ক্ষতিকর মাত্রায়। এর প্রেক্ষিতে সব কোম্পানির সাথে বৈঠক করে ভোজ্য তেল এবং ডালডা, বনস্পতির ট্র্যান্স ফ্যাটি এসিডের সর্বোচ্চ মাত্রা ২এমজি/১০০গ্রাম (আন্তর্জাতিক) নির্ধারণ করে দেয়া হয়। অচিরেই তা কার্যকর হবে। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক কমে যাবে ইনশাআল্লাহ।

৩২। টি-ব্যাগ এবং চাপাতা পরীক্ষা করে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান এপিক্লোরোহাইড্রিন এবং কীটনাশক পাওয়া যায়নি। ব্রেড পরীক্ষা করে ক্ষতিকর উপাদান পটাসিয়াম ব্রোমেট পাওয়া যায়নি। ঢাকা শহরের সব বাজারের বিভিন্ন মাছ এবং ফল পরীক্ষা করে ফরমালিন পাওয়া যায়নি। পাউডার দুধ এবং পাস্তুরিত সব দুধ পরীক্ষা করে ভাল পাওয়া গিয়েছে। এগুলো কিছুদিন পরপর পরীক্ষা করা হয়। খাবার লবণ ভাল পাওয়া গেছে। কনডেন্সড মিল্কে ক্ষতিকর কিছু পাওয়া যায়নি। চিনি পরীক্ষা করে সোডিয়াম সাইক্লামেট পাওয়া যায়নি। হোটেলে পরাটা, রুটি, জিলাপীতে ব্যবহৃত “সাল্টু” পরীক্ষা করে তা এমোনিয়াম বাই কার্বোনেট হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফুড গ্রেড খাদ্য উপাদান।

৩৩। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ দেশবাসী খেয়ে থাকেন এমন একটি খাদ্য পণ্য পরীক্ষা করে মারাত্মক ক্ষতিকর মাত্রায় প্রিজার্ভেটিভ সোডিয়াম বেঞ্জয়েট এবং স্যাকারিন পাওয়া গিয়েছে দেশে এবং বিদেশের ল্যাব পরীক্ষায়। একই রকম আরও দুটি পণ্য পরীক্ষা করে উভয়টিতেই ক্ষতিকর মাত্রায় সোডিয়াম বেঞ্জয়েট এবং স্যাকারিন পাওয়া যায়। এই তিনটি খাদ্য পণ্যের লেবেল এবং বিজ্ঞাপনে প্রতারণা এবং মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার জন্য তাদের সবার বিরুদ্ধে খাদ্য আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় প্রথম কোম্পানিকে সাড়ে তিন লাখ এবং অপর দুই কোম্পানিকে সাড়ে এগারো লাখ টাকা করে জরিমানা করে আদালত।  এদের সবাইক চুড়ান্ত নোটিশ দেয়া হয়। প্রথম কোম্পানি পরবর্তীতে তাদের রেসিপি সম্পূর্ণ্রুপে পরিবর্তন করে নতুনভাবে উৎপাদন শুরু করে। স্যাকারিন একেবারে বাদ দিয়ে দেয় এবং সোডিয়াম বেঞ্জয়েট নিয়ে আসে ১০০ গ্রাম/লিটারের নিচে (বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড)। এর আগে সোডিয়াম বেঞ্জয়েট ছিল ৬০০ এমজি’র উপরে এবং স্যাকারিন ছিল প্রায় ১২৫০ এমজি। যা শরিরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

সর্বশেষ পরীক্ষায় প্রথম কোম্পানির খাদ্য পণ্য ভাল পাওয়া গিয়েছে। এই পণ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে আমাকে মারাত্মক প্রতিকূল পরিস্থিতির স্বীকার হতে হয়েছিল। অপদস্ত হতে হয়েছিল মারাত্মকভাবে। তবুও দমে যাইনি। যেহেতু এই পণ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খেয়ে থাকেন, তাই তা ঠিক করা ছিল আমার ব্যাক্তিগত একটি চ্যালেঞ্জ। 

৩৪। বাজারের গুঁড়া হলুদ মশলা পরীক্ষা করে ক্ষতিকর মাত্রায় হেভি মেটাল সীসা পাওয়া গিয়েছে। হার্ট ফাউন্ডেশন এবং ডিজি হেলথ যৌথভাবে এক পরীক্ষায় তারা প্রমাণ পেয়েছেন যে, গুঁড়া হলুদে একটি রাসায়নিক পাউডার লেড ক্রোমেট মেশানো হয়। অসাধু ব্যবসায়িরা হলুদের রঙকে আরও উজ্জ্বল করতে এই লেড ক্রোমেট পাউডার মিশিয়ে থাকে। লেড ক্রোমেট পাউডার আমদানি হয়ে থাকে শিল্পে ব্যবহারের জন্য। অনেক দেশেই এই লেড দূষণের জন্য লেড ক্রোমেট পাউডারকে দায়ি করা হয়ে থাকে এবং লেড ক্রোমেট পাউডার ব্যবহার নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে খুব কঠোরভাবে। আমাদের দেশে লেড ক্রোমেট পাউডার অবাধ আমদানি করা হয়ে থাকে। লেড ক্রোমেট পাউডার শুধু শিল্পে আমদানির জন্য অনুমতি প্রদান বা আমদানি নিষিদ্ধ করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। শিল্পে আমদানির অনুমতি দেয়া হলে বাণিজ্যিক আমদানি ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করতে হবে। শিল্প শুধু তাদের নিজেদের প্রয়োজনে আমদানি করবে।

৩৫। শতভাগ ফেয়ার এবং দুর্নীতিমুক্ত ২০৮ জন কর্মকর্তা এবং কর্মচারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে খুব অল্প সময়ে। নিয়োগ কমিটির সভাপতি ছিলাম আমি।

৩৬। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইনকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করায় আইনকে সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়। আইনের খসড়া চুড়ান্ত হয়েছে, যা অতি সত্বর মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে।

৩৭। ক্ষতিকর স্পর্শক হিসেবে খাদ্যে ওয়ান টাইম নন ফুডগ্রেড প্লাস্টিকের কাপ, খবরের কাগজ এবং প্যাকেটে স্ট্যাপলার পিন ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সহসাই এসবের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, অভিযান এবং মামলা দায়ের শুরু হবে।

৩৮। বাজার হতে ৪৭টি বহুল প্রচলিত আমদানিকৃত কীটনাশক ল্যাব পরীক্ষা করে প্রায় সবগুলোতে অত্যাধিক মাত্রায় হেভি মেটাল সীসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। কীটনাশকে সামান্য মাত্রায় হেভি মেটাল গ্রহনযোগ্য নয় বিধায় বিশ্বে কোথাও এর মাত্রা নিররাধারণ করা হয়নি। আমাদের দেশেও তা গ্রহনযোগ্য নয়। কীটনাশক অবশ্যই পিওর হতে হবে। তাই আগামী ১ জুলাই হতে আমদানি হয়ে আসা প্রত্যেক কীটনাশকের চালান বন্দরে আসার পর ঢাকার দুটি ল্যাবে হেভি মেটাল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে এনবিআর এবং কাস্টমসকে পত্র দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, দেশে কোন কীটনাশক বানানো হয় না। জমির মাটিকে হেভি মেটালের দুষণে দুষিত করার বড় একটি কারণ এই হেভি মেটালযুক্ত কীটনাশক।

৩৯। জর্দা গুল এবং খয়ের পরীক্ষা করে অতি উচ্চ মাত্রায় হেভি মেটাল সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম পাওয়া গিয়েছে। এর উতস্য খুঁজতে গিয়ে আমরা সাদা তামাক পাতা, বিড়ির তামাক এবং দেশে বানানো সিগারেটের তামাক পাতা পরীক্ষা করি। সব তামাক পাতাতেই উচ্চ মাত্রায় সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। সব তামাক পাতায় সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম পাওয়ায় এটা ধরে নেয়া যায় যে, তা মাটি এবং হয়ত কীটনাশকের দুষণ থেকে হচ্ছে। এই একই কারণে বিভিন্ন ফসলেও মাঝে মাঝে হেভি মেটাল পাওয়া যাচ্ছে, যা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন ট্রেসিবিলিটি নির্ধারণ।

৪০। ২০১৯ সালে ঢাকা শহরের বিভিন্ন কোল্ড স্টোরেজে র্যানব ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পরিচালিত অভিযানে দেখা গিয়েছে যে, সেখানে নস্ট হয়ে যাওয়া ২০০৯ সালের খেজুর এবং ২০১৩ সালের আমদানি করা মাংস রক্ষিত আছে, যা মেয়াদের তারিখ পরিবর্তন করে বাজারে বিক্রি করা হত। কোল্ড স্টোরেজগুলোর সহযোগিতায় তা করা হচ্ছিল এবং তারা মালামালের কোন রেকর্ড বা ইনভেন্ট্রি লিস্ট মেইন্টেইন করত না। এই বছর আমরা সব কোল্ড স্টোরেজ এবং খেজুর ও মাংস আমদানীকারকদের নিকট হালনাগাদ মালামালের মেয়াদ সহ কোল্ড স্টোরেজে রক্ষিত খেজুর ও মাংসের পরিমাণ এবং আমদানির তারিখ এবং কাগজপত্র দাখিল করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। এখন থেকে প্রতি মাসে তা দাখিল করা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। এতে করে আশা করা যায়, আমদানি করা খেজুর এবং মাংসের অনিয়ম দূর করা সম্ভব হবে।

৪১। আমরা আমদানি করা সকল খাদ্য এবং খাদ্য উপকরণে স্টিকারযুক্ত উৎপাদন এবং মেয়াদের তারিখ ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছি। উৎপাদন এবং মেয়াদের তারিখ হতে হবে স্পষ্টাক্ষরে অমোচনীয় কালি দ্বারা ছাপার অক্ষরে এবং আমদানি করা চালানের সাথে যেন খুচরা পর্যায়ে বিক্রির সময় সেই পণ্যের মিল বা সামঞ্জস্য থাকে, সে জন্য প্রতিটি চালান আমদানির সময় এলসি নাম্বার, আমদানি করা পণ্যের প্রতিটি কার্টুন বা বক্সে তা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছি। এতে করে খোলা বাজারে আমদানি করা প্রতিটি পণ্যের উৎস্য সনাক্ত করা অতি সহজ হবে এবং ইচ্ছাকৃত ম্যানুপুলেশন বন্ধ হয়ে যাবে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে আমি ছিলাম সদস্য (ইন-সি-টু অতিরিক্ত সচিব) এবং প্রায় আড়াই মাস ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। উপরে বর্ণিত সব কাজ ছিল আমার ব্রেইন চাইল্ড। দেশ থেকে খদায় ভেজাল দূর করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করেছিলাম। সেখান থেকে বদলি হয়ে চলে যাই রেলে। 

৪২। বিকাশ একাউন্ট হতে প্রতারকদের প্রতারণা বন্ধ করা। বিকাশের মাল্টি ডিভাইস লগ ইন সিস্টেমের কারণে প্রতারকরা বিকাশ গ্রাহকদের কাছ থেকে চালাকি, প্রতারণার ফাঁদে ফেলে কিংবা লোভ দেখিয়ে গ্রাহকের পিন নাম্বার এবং ওটিপি নিয়ে গ্রাহকের একাউন্ট থেকে সব টাকা হাতিয়ে নিত। মাল্টি ডিভাইস লগইন বন্ধ করে নীতিমালা অনুযায়ী সিঙ্গেল ডিভাইস লগইন সিস্টেম চালুর জন্য বিকাশ কর্তৃপক্ষের সাথে বারংবার যোগাযোগ সব বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ দাখিল করেছিলাম। ফলশ্রুতিতে বিকাশ মাল্টি ডিভাইস লগইন বন্ধ করে সিঙ্গেল ডিভাইস লগইন সিস্টেম চালু করেছে।অর্থাৎ একটি একাউন্ট থেকেই আপনি এখন ট্রানজেকশন করতে হবে। ওটিপি পিন নাম্বার দিয়েও আর অন্য ডিভাইস থেকে একাউন্ট চালানো যাবে না।

আপাতত বন্ধ হয়ে গেল প্রতারকদের রাস্তা। রক্ষা পেল গ্রাহকদের কষ্টার্জিত অর্থ প্রতারকদের কবল থেকে।

৪৩। হরলিক্স এর বিতর্কিত বিজ্ঞাপন “Taller Stronger Sharper” বন্ধের ব্যবস্থা নেয়া।

৪৪। এছাড়া রেলের শতভাগ অনলাইন/অফ-লাইন (কাউন্টার) টিকিট চালু , ইন্টারসিটি ট্রেনে স্ট্যান্ডিং টিকিট বিক্রি বন্ধ, অনলাইন রিফান্ড সিস্টেম চালু, টিকিট কালোবাজারি সম্পুর্ণ দূর করণে রিয়েলটাইম এনআইডি ভেরিফিকেশন করে অনবোর্ড "টিকিট যার, ভ্রমণ তার" নিশ্চিত করার সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহন। রেলের যাত্রীসেবা বৃদ্ধিতে আমি ২০১৫ সাল থেকেই রেল সচিব জনাব ফিরোজ সালাউদ্দিন স্যারের সাথে কাজ শুরু করি। আমি তখন পরিচালক, বিনিয়োগ বোর্ড চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলাম। তখন থেকেই প্রতি তিনমাস অন্তর রেলের অংশীজন সভায় যাত্রী প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকতাম। এটাই ছিল রেলের কল্যাণে আমাদের একটি সক্রিয় ফোরাম। যা অব্যাহত ছিল প্রাক্তন রেল সচিব জনাব মোফাজ্জল হোসেন স্যারের শেষ সময় পর্যন্ত। এরপর রেলে আমার পোস্টিং হয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream