বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩
Bangla FM

সেনাবাহিনী, নাগরিক আস্থা ও দায়িত্বশীল সমাজ


| ফটো কার্ড

সেনাবাহিনী, নাগরিক আস্থা ও দায়িত্বশীল সমাজ

প্রফেসর ড. দিপু সিদ্দিকী

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সার্বভৌমত্ব। সেই সার্বভৌমত্ব রক্ষা শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিকের আস্থা, দায়িত্ববোধ এবং দেশ সম্পর্কে সচেতনতা। একটি দেশের সেনাবাহিনী এই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ইতিহাস ও বিকাশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিজস্ব দায়িত্বের মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষাকে প্রধান দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে। পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলা, প্রয়োজনের সময় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও এর ভূমিকা রয়েছে। 

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বহু মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশা জড়িয়ে আছে। দেশের বিভিন্ন সংকট ও দুর্যোগে সেনাসদস্যদের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। 

তবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসা বা সম্মান করার অর্থ এই নয় যে তার বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। আবার কোনো প্রশ্ন তোলাও অবিশ্বাস বা বিরোধিতার সমার্থক নয়। একটি পরিণত সমাজে সম্মান, প্রশ্ন এবং জবাবদিহিতা—এই তিনটি বিষয় পাশাপাশি চলতে পারে।

তথ্যের যুগে নতুন বাস্তবতা

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন একটি তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাধারণ মানুষকে মত প্রকাশের যে সুযোগ দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বও বাড়িয়েছে।

পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা, সম্পাদিত ভিডিওকে পূর্ণাঙ্গ ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা, কোনো ব্যক্তির বক্তব্যকে একটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান হিসেবে প্রচার করা কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া—এসবের ফলে সহজেই ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লে মানুষের প্রতিক্রিয়া দ্রুত তৈরি হয়। তাই কোনো খবর দেখেই শেয়ার করার আগে কয়েক মুহূর্ত থেমে যাওয়া প্রয়োজন। উৎস কোথায়? তথ্যটি নতুন, নাকি পুরোনো? অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যম কি একই তথ্য নিশ্চিত করেছে? বক্তব্যটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট কী?

এই কয়েকটি প্রশ্ন অনেক অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি থেকে সমাজকে রক্ষা করতে পারে।

স্বাধীনতা মানেই দায়িত্ব

বাংলাদেশের সংবিধান চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং আইনসাপেক্ষে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাই মত প্রকাশের সুযোগ একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক শক্তি।

কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও থাকে।

আমি মনে করি, আমাদের “Self-Censorship”-এর চেয়ে “Self-Responsibility”-এর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ নিজের মত প্রকাশের আগে নিজের কাছেই কয়েকটি প্রশ্ন করা—আমি যা বলছি তা কি সত্য? আমার তথ্যের উৎস কী? আমি কি একটি তথ্য জানাচ্ছি, নাকি যাচাই না করেই তা ছড়িয়ে দিচ্ছি?

সমালোচনা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। বরং যুক্তিসংগত ও তথ্যভিত্তিক সমালোচনা প্রতিষ্ঠানকে আরও সচেতন হতে সাহায্য করতে পারে। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভুল থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

তবে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানকে বিচার করাও যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে প্রশ্ন করলেই প্রশ্নকারীকে নেতিবাচক পরিচয়ে চিহ্নিত করাও স্বাস্থ্যকর নাগরিক সংস্কৃতি নয়।

আমাদের প্রয়োজন মাঝামাঝি একটি পরিণত পথ—যেখানে সম্মান থাকবে, প্রশ্ন থাকবে, তথ্য থাকবে এবং আইনসম্মত জবাবদিহিতাও থাকবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কী করতে পারে

ডিজিটাল যুগে দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করার কাজটি শুধু পরিবার বা গণমাধ্যমের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে এই শিক্ষার অংশ হতে হবে।

শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো যেতে পারে—

শেয়ার করার আগে যাচাই করো।
বিশ্বাস করার আগে প্রশ্ন করো।
সমালোচনা করার আগে তথ্য জানো। এটি শুধু সেনাবাহিনী বা কোনো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নয়; বরং সমাজের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে Digital Literacy, Media Literacy এবং Responsible Citizenship বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা, কর্মশালা ও ওরিয়েন্টেশন আয়োজন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে একটি ছবির উৎস যাচাই করতে হয়, একটি ভিডিওর প্রেক্ষাপট বুঝতে হয় এবং একটি সংবাদ ও মতামতের মধ্যে পার্থক্য করতে হয়।

এ শিক্ষা ভবিষ্যতের নাগরিককে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করবে না; তাকে দায়িত্বশীলও করে তুলবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা

ডিজিটাল যুগে পেশাদার গণমাধ্যমের গুরুত্ব বরং আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্যের বিপরীতে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত যাচাই, প্রেক্ষাপট এবং ভারসাম্য।

একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু দ্রুত সংবাদ প্রকাশ করা নয়; তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং পাঠককে পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট দেওয়া।

একইভাবে ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও আইনসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা প্রয়োজন। ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ বা প্রতারণা মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বৈধ মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা জরুরি।

সেনাবাহিনী ও জনগণের আস্থা

একটি প্রতিষ্ঠানের শক্তি শুধু তার সাংগঠনিক সক্ষমতায় নয়; মানুষের আস্থার সঙ্গেও তার সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দেখতে হবে। সেখানে কর্মরত প্রতিটি সদস্য একজন মানুষ—যার দায়িত্ব আছে, কর্তব্য আছে এবং পেশাগত জবাবদিহিতাও আছে। কোনো অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের পেশাগত দায়িত্ব, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য, দুর্যোগে সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদানকেও সামগ্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘ অংশগ্রহণ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। 

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তাই একপাক্ষিক না হয়ে বাস্তবভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন।

আজকের বাংলাদেশে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা। সেনাবাহিনী, প্রশাসন, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সমাজ এবং সাধারণ নাগরিক—প্রত্যেকেরই নিজ নিজ জায়গা থেকে এই আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রয়েছে।

গুজবের পরিবর্তে তথ্য, উত্তেজনার পরিবর্তে যুক্তি, বিরোধের পরিবর্তে সংলাপ এবং অন্ধ সমর্থনের পরিবর্তে দায়িত্বশীল মূল্যায়ন—এগুলোই একটি পরিণত সমাজের বৈশিষ্ট্য।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সম্মান যেমন প্রয়োজন, তেমনি নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে নাগরিকের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান যেমন প্রয়োজন, তেমনি নাগরিকের দায়িত্ববোধও অপরিহার্য।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর প্রতি শ্রদ্ধা থাকা স্বাভাবিক। সেই শ্রদ্ধাকে আরও অর্থবহ করে তুলতে হলে প্রয়োজন জনগণের আস্থা, পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং আইনসম্মত জবাবদিহিতার সমন্বয়।

অন্যদিকে নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা, দায়িত্বশীলভাবে মত প্রকাশ করা এবং কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রাসঙ্গিক তথ্য জানা।

দেশপ্রেম শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি দায়িত্বেরও বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি শেয়ার, একটি মন্তব্য কিংবা একটি ভিডিও প্রকাশের মধ্য দিয়েও আমরা দায়িত্বশীল অথবা দায়িত্বহীন নাগরিক আচরণের পরিচয় দিতে পারি।

তাই আমাদের প্রত্যয় হতে পারে খুব সরল—

গুজব নয়, তথ্য;
উত্তেজনা নয়, যুক্তি;
বিভাজন নয়, সংলাপ;
অন্ধ সমর্থন নয়, দায়িত্বশীল প্রশ্ন;
এবং সর্বোপরি—দেশের প্রতি দায়িত্ব ও মানুষের প্রতি সম্মান।

একটি শক্তিশালী ও পেশাদার সেনাবাহিনী যেমন রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সচেতন, শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা যত গভীর হবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তত বেশি স্থিতিশীল ও মানবিক হবে।


লেখক —প্রফেসর ড. দিপু সিদ্দিকী
অধ্যাপক, কবি ও প্রাবন্ধিক
ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ
রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলা এফএমের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সেনাবাহিনী, নাগরিক আস্থা ও দায়িত্বশীল সমাজ

প্রকাশের তারিখ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

প্রফেসর ড. দিপু সিদ্দিকী

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সার্বভৌমত্ব। সেই সার্বভৌমত্ব রক্ষা শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিকের আস্থা, দায়িত্ববোধ এবং দেশ সম্পর্কে সচেতনতা। একটি দেশের সেনাবাহিনী এই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ইতিহাস ও বিকাশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিজস্ব দায়িত্বের মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষাকে প্রধান দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে। পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলা, প্রয়োজনের সময় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও এর ভূমিকা রয়েছে। 

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বহু মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশা জড়িয়ে আছে। দেশের বিভিন্ন সংকট ও দুর্যোগে সেনাসদস্যদের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। 

তবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসা বা সম্মান করার অর্থ এই নয় যে তার বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। আবার কোনো প্রশ্ন তোলাও অবিশ্বাস বা বিরোধিতার সমার্থক নয়। একটি পরিণত সমাজে সম্মান, প্রশ্ন এবং জবাবদিহিতা—এই তিনটি বিষয় পাশাপাশি চলতে পারে।

তথ্যের যুগে নতুন বাস্তবতা

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন একটি তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাধারণ মানুষকে মত প্রকাশের যে সুযোগ দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বও বাড়িয়েছে।

পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা, সম্পাদিত ভিডিওকে পূর্ণাঙ্গ ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা, কোনো ব্যক্তির বক্তব্যকে একটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান হিসেবে প্রচার করা কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া—এসবের ফলে সহজেই ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লে মানুষের প্রতিক্রিয়া দ্রুত তৈরি হয়। তাই কোনো খবর দেখেই শেয়ার করার আগে কয়েক মুহূর্ত থেমে যাওয়া প্রয়োজন। উৎস কোথায়? তথ্যটি নতুন, নাকি পুরোনো? অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যম কি একই তথ্য নিশ্চিত করেছে? বক্তব্যটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট কী?

এই কয়েকটি প্রশ্ন অনেক অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি থেকে সমাজকে রক্ষা করতে পারে।

স্বাধীনতা মানেই দায়িত্ব

বাংলাদেশের সংবিধান চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং আইনসাপেক্ষে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাই মত প্রকাশের সুযোগ একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক শক্তি।

কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও থাকে।

আমি মনে করি, আমাদের “Self-Censorship”-এর চেয়ে “Self-Responsibility”-এর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ নিজের মত প্রকাশের আগে নিজের কাছেই কয়েকটি প্রশ্ন করা—আমি যা বলছি তা কি সত্য? আমার তথ্যের উৎস কী? আমি কি একটি তথ্য জানাচ্ছি, নাকি যাচাই না করেই তা ছড়িয়ে দিচ্ছি?

সমালোচনা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। বরং যুক্তিসংগত ও তথ্যভিত্তিক সমালোচনা প্রতিষ্ঠানকে আরও সচেতন হতে সাহায্য করতে পারে। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভুল থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

তবে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানকে বিচার করাও যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে প্রশ্ন করলেই প্রশ্নকারীকে নেতিবাচক পরিচয়ে চিহ্নিত করাও স্বাস্থ্যকর নাগরিক সংস্কৃতি নয়।

আমাদের প্রয়োজন মাঝামাঝি একটি পরিণত পথ—যেখানে সম্মান থাকবে, প্রশ্ন থাকবে, তথ্য থাকবে এবং আইনসম্মত জবাবদিহিতাও থাকবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কী করতে পারে

ডিজিটাল যুগে দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করার কাজটি শুধু পরিবার বা গণমাধ্যমের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে এই শিক্ষার অংশ হতে হবে।

শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো যেতে পারে—

শেয়ার করার আগে যাচাই করো।
বিশ্বাস করার আগে প্রশ্ন করো।
সমালোচনা করার আগে তথ্য জানো। এটি শুধু সেনাবাহিনী বা কোনো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নয়; বরং সমাজের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে Digital Literacy, Media Literacy এবং Responsible Citizenship বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা, কর্মশালা ও ওরিয়েন্টেশন আয়োজন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে একটি ছবির উৎস যাচাই করতে হয়, একটি ভিডিওর প্রেক্ষাপট বুঝতে হয় এবং একটি সংবাদ ও মতামতের মধ্যে পার্থক্য করতে হয়।

এ শিক্ষা ভবিষ্যতের নাগরিককে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করবে না; তাকে দায়িত্বশীলও করে তুলবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা

ডিজিটাল যুগে পেশাদার গণমাধ্যমের গুরুত্ব বরং আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্যের বিপরীতে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত যাচাই, প্রেক্ষাপট এবং ভারসাম্য।

একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু দ্রুত সংবাদ প্রকাশ করা নয়; তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং পাঠককে পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট দেওয়া।

একইভাবে ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও আইনসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা প্রয়োজন। ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ বা প্রতারণা মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বৈধ মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা জরুরি।

সেনাবাহিনী ও জনগণের আস্থা

একটি প্রতিষ্ঠানের শক্তি শুধু তার সাংগঠনিক সক্ষমতায় নয়; মানুষের আস্থার সঙ্গেও তার সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দেখতে হবে। সেখানে কর্মরত প্রতিটি সদস্য একজন মানুষ—যার দায়িত্ব আছে, কর্তব্য আছে এবং পেশাগত জবাবদিহিতাও আছে। কোনো অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের পেশাগত দায়িত্ব, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য, দুর্যোগে সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদানকেও সামগ্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘ অংশগ্রহণ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। 

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তাই একপাক্ষিক না হয়ে বাস্তবভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন।

আজকের বাংলাদেশে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা। সেনাবাহিনী, প্রশাসন, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সমাজ এবং সাধারণ নাগরিক—প্রত্যেকেরই নিজ নিজ জায়গা থেকে এই আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রয়েছে।

গুজবের পরিবর্তে তথ্য, উত্তেজনার পরিবর্তে যুক্তি, বিরোধের পরিবর্তে সংলাপ এবং অন্ধ সমর্থনের পরিবর্তে দায়িত্বশীল মূল্যায়ন—এগুলোই একটি পরিণত সমাজের বৈশিষ্ট্য।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সম্মান যেমন প্রয়োজন, তেমনি নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে নাগরিকের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান যেমন প্রয়োজন, তেমনি নাগরিকের দায়িত্ববোধও অপরিহার্য।




বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর প্রতি শ্রদ্ধা থাকা স্বাভাবিক। সেই শ্রদ্ধাকে আরও অর্থবহ করে তুলতে হলে প্রয়োজন জনগণের আস্থা, পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং আইনসম্মত জবাবদিহিতার সমন্বয়।


অন্যদিকে নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা, দায়িত্বশীলভাবে মত প্রকাশ করা এবং কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রাসঙ্গিক তথ্য জানা।


দেশপ্রেম শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি দায়িত্বেরও বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি শেয়ার, একটি মন্তব্য কিংবা একটি ভিডিও প্রকাশের মধ্য দিয়েও আমরা দায়িত্বশীল অথবা দায়িত্বহীন নাগরিক আচরণের পরিচয় দিতে পারি।


তাই আমাদের প্রত্যয় হতে পারে খুব সরল—


গুজব নয়, তথ্য;
উত্তেজনা নয়, যুক্তি;
বিভাজন নয়, সংলাপ;
অন্ধ সমর্থন নয়, দায়িত্বশীল প্রশ্ন;
এবং সর্বোপরি—দেশের প্রতি দায়িত্ব ও মানুষের প্রতি সম্মান।


একটি শক্তিশালী ও পেশাদার সেনাবাহিনী যেমন রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সচেতন, শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা যত গভীর হবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তত বেশি স্থিতিশীল ও মানবিক হবে।


লেখক —প্রফেসর ড. দিপু সিদ্দিকী
অধ্যাপক, কবি ও প্রাবন্ধিক
ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ
রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলা এফএমের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream