ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে দেশটির সরকারের সমালোচনা করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তাঁর অভিযোগ, শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও ভারত তাতে সাড়া দিচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও প্রজন্ম দলের আয়োজনে এক মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রিজভী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করলেও শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে সেই সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রিজভীর দাবি, শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। তাঁদের ফেরত দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ বারবার ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রিজভী আরও বলেন, অতীতে ভারত থেকে এক অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের উদাহরণ রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, একইভাবে শেখ হাসিনাকে কেন ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে ভারতের অবস্থানের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন রিজভী। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সরকারপ্রধান হিসেবে যথাযথ মর্যাদা না দিয়ে অন্য পরিচয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, এ কারণে তারেক রহমানের সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সার্বভৌম মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত।
রিজভীর অভিযোগ, ওই সিদ্ধান্তের পরদিন ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের একটি ইউনিটে ত্রুটির কথা জানিয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়। তিনি এ ঘটনার সময় ও প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং এটিকে কূটনৈতিক চাপের অংশ বলে দাবি করেন।
বিগত সরকারের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, দীর্ঘ সময় দেশে লুটপাট, অর্থপাচার, গুম ও গুপ্তহত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমান সময়ে বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করতে পারছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদ ও সংসদের বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হলেও বিরোধী নেতাদের গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটছে না। তাঁর ভাষ্য, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার।
দেশের গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিয়েও বক্তব্য দেন রিজভী। তাঁর দাবি, এই সংকট শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার কারণে তৈরি হয়নি; আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও এর ওপর প্রভাব রয়েছে। তিনি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থার কথা উল্লেখ করেন।
সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির চেষ্টা করছে বলেও দাবি করেন তিনি। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমার থেকে গ্যাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান রিজভী।
এ ছাড়া দেশের রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়েও ইতিবাচক দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে এবং রিজার্ভও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতির প্রতি সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানান রিজভী।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ও ইতিহাস মুছে ফেলার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হবে। মধুর ক্যান্টিনের নাম পরিবর্তন বা এর ঐতিহাসিক পরিচয় বদলের কোনো উদ্যোগ থাকলে তার বিরোধিতা করার কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা দলের সহ-সভাপতি কর্নেল (অব.) জয়নুল আবেদীন, আনিসুজ্জামান খোকন, মেজর (অব.) মিজানসহ সংগঠন দুটির কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মতামত