পার্বত্য চট্টগ্রামের (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) ১১টি প্রধান ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী—চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, লুসাই, বম, পাংখোয়া, খিয়াং, খুমি ও চাক।
প্রকৃতি, জুম চাষ ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে বাঁধা এদের জীবনপ্রবাহ। পাহাড়ের ভৌগোলিক প্রতিকূলতা, পরিবেশগত পরিবর্তন ও বাজার অর্থনীতির আধুনিক ধাক্কা সামলেও এরা হাজার বছর ধরে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে টিকে রয়েছে।
জীবনযাত্রার প্রধান তিন মূল ভিত্তি:জুম চাষ (লেঙবা/ঝুম): পাহাড়ের ঢালে ধাপ কেটে ধান, মারফা, তুলা, তিল ও শাকসবজি ফলানোর যৌথ ও ঐতিহ্যবাহী কৃষি ব্যবস্থা।মাচাং ঘর: আর্দ্রতা, বন্যপ্রাণী ও পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে মাটির ওপর উঁচুতে নির্মিত বাসস্থান।ঝিরি ও ঝরনা নির্ভরতা: পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা প্রাকৃতিক ঝিরি-ঝরনাই তাদের সুপেয় পানি ও দৈনন্দিন গৃহস্থালির প্রধান উৎস।
১১ জাতিগোষ্ঠীর ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈচিত্র্যময় জীবনধারাজাতিগোষ্ঠীপ্রধান প্রধান অঞ্চলজীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির বিশেষত্বচাকমারাঙামাটি, খাগড়াছড়িসমতলের কাছাকাছি বাস; স্থায়ী কৃষি, ব্যবসায় ও তাঁতশিল্পে অগ্রগামী। বিজু উৎসব পালনে মুখর।
মারমা বান্দরবান, খাগড়াছড়িবৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী; সাংগ্রাই উৎসব ও জলকেলি তাদের মূল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।ত্রিপুরা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটিবৈসুক উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী গড়াইয়া নৃত্যের জন্য প্রসিদ্ধ; জুম ও জঙ্গলনির্ভর কৃষিভিত্তিক জীবন।তঞ্চঙ্গ্যা রাঙামাটি (কাপ্তাই, রাজস্থলী)ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা রঙিন পোশাক (পিনোন-হাদি) ও গহনার নকশায় অত্যন্ত দক্ষ। ম্রো বান্দরবান (রুমা, থানচি)প্রকৃতিপূজারি; সুউচ্চ মাচাং ঘর, বাঁশের বাদ্যযন্ত্র ‘জিয়াং’ ও রিবাং নৃত্যের জন্য সুপরিচিত। লুসাই রাঙামাটি, বান্দরবানসুতি কাপড়ের নিজস্ব বুননশিল্প ও পাহাড়ি ফলমূল সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী। বম বান্দরবানখ্রিস্টধর্মীয় প্রভাব বেশি; কোরাস গান, বাঁশশিল্প ও দলবদ্ধ জুমচাষে অত্যন্ত সুসংগঠিত। পাংখোয়া রাঙামাটি (বিলাইছড়ি) ঝরনাপারের দুর্গম এলাকায় বসবাস; বাঁশ ও বেতের ঝুড়ি তৈরিতে সিদ্ধহস্ত।খিয়াংবান্দরবানপ্রান্তিক ও ছোট আকারের জনগোষ্ঠী; মারমা ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে জীবনযাপন। খুমি বান্দরবান (থানচি, রুমা) চরম দুর্গম পাহাড়ি চূড়ায় বাস; নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি ও জুমনির্ভর আত্মনির্ভরশীল জীবন। চাক বান্দরবান (নাইক্ষ্যংছড়ি)বিলুপ্তপ্রায় নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির বাহক; সীমান্তঘেঁষা বনে জুম ও বনজ সম্পদ সংগ্রহজীবী।
রূপান্তর, সংগ্রাম ও নারীদের ভূমিকাপ্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোকে প্রতিনিয়ত বন্যা, পাহাড়ি ঢলে ভূমিধস ও জুমের ফলন বিপর্যয় মোকাবিলা করতে হয়। কাপ্তাই বাঁধের ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমানের আধুনিক বাজার ব্যবস্থা—উভয় সামাজিক পরিবর্তনের সাথে লড়াই করেই তারা শিক্ষা ও প্রযুক্তির নতুন দিগন্তে পা রাখছে।বিশেষ করে পাহাড়ি নারীদের ভূমিকা এই জীবনসংগ্রামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; জুমের খেত পরিচর্যা, ঝিরি থেকে পানি বহন এবং কোমর তাঁতে কাপড় বোনার মাধ্যমেই মূলত এই অঞ্চলগুলোর পারিবারিক অর্থনীতির চাকা সচল থাকে।
মতামত