জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। মামলার সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৮ জুন তদন্ত শুরু হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর একই বছরের ৭ ডিসেম্বর চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং সেদিনই তা আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২।
পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য ও প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
তদন্ত কর্মকর্তাসহ মামলায় মোট ২৯ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে নিহত শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিও রয়েছে। ২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ৪ আগস্ট থেকে যুক্তিতর্ক শুরু করে প্রসিকিউশন। নয় কার্যদিবস পর ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়। মামলায় মোট ১২৩টি সিরিজ ডকুমেন্টস প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে আসামিরা বিভিন্ন পর্যায়ে নির্দেশনা, উসকানি ও প্ররোচনা দিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, সহিংসতার পরিকল্পনা, সশস্ত্র হামলা এবং দমন-পীড়নের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন।
ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, তার অধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র কর্মীদের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলা চালানো হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, তার নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তার ফলে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
অন্য আসামিদের বিরুদ্ধেও নিজ নিজ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং দলীয় সহযোগী সংগঠনের কর্মীদের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, হত্যা ও নির্যাতনে নির্দেশ, উসকানি, সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আসামিদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, অমানবিক আচরণ, ষড়যন্ত্র, উসকানি ও অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতার মতো অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য বলে দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
মতামত