পটুয়াখালীর বাউফলে এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের আবেদনকে কেন্দ্র করে এক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নীতিমালা লঙ্ঘন, তথ্য গোপন ও অন্য বিদ্যালয়ের নাম অনুমতি ছাড়াই আবেদনে সংযুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসি শিরিন।
অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক হলেন কালাইয়া হায়াতুন্নেছা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মাদ হারুনূর রশীদ।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সাল থেকে কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এর ভেন্যু বা সহযোগী কেন্দ্র ছিল কালাইয়া হায়াতুন্নেছা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। তবে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ব্যয় কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ভেন্যু কেন্দ্রটি বাতিল করা হয়। বর্তমানে মূল কেন্দ্রে সাতটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছেন।
এ অবস্থায় গত ১২ আগস্ট কালাইয়া হায়াতুন্নেছা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নতুন এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য আবেদন করেন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মাদ হারুনূর রশীদ। পরে চলতি মাসের ৭ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সালেহ আহমেদ সুপারিশসহ আবেদনটি বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠান।
তবে কেন্দ্র স্থাপনের আবেদন প্রক্রিয়ায় নীতিমালা লঙ্ঘন ও তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অনুমতি বা সম্মতি ছাড়াই ওই বিদ্যালয়ের নাম আবেদনপত্রে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের পক্ষ থেকে নতুন কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন্দ্র স্থাপনের নীতিমালা পর্যালোচনা করে অভিযোগকারীরা জানান, যে প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের আবেদন করা হবে, সেখানে বিভিন্ন শ্রেণিতে ন্যূনতম ৫০০ শিক্ষার্থী এবং যে পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্রের জন্য আবেদন করা হবে, সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে ন্যূনতম ১০০ শিক্ষার্থী থাকার শর্ত রয়েছে। কিন্তু কালাইয়া হায়াতুন্নেছা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪০০-এর কম এবং দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ৮০ জন। একই সঙ্গে আবেদনপত্রে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির প্রতিস্বাক্ষর থাকার কথা থাকলেও ওই আবেদনে সভাপতির কোনো প্রতিস্বাক্ষর নেই বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আবেদনপত্রে সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কালাইয়া হায়াতুন্নেছা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনে আগ্রহী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থী ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এত বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো বিদ্যালয়টিতে রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কালাইয়া হায়াতুন্নেছা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ চলে আসছে। সম্প্রতি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ও পরীক্ষার ফলাফল কমে যাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় বাউফল উপজেলায় সর্বোচ্চ সংখ্যক জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।
এদিকে, স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে যে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে নতুন পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসি শিরিন বলেন, ২০১২ সাল থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে আমাদের কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। হঠাৎ করে পাশের বিদ্যালয়টি নতুন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য আবেদন করেছে। ওই আবেদনপত্রে আমাদের বিদ্যালয়ও সেখানে পরীক্ষা দিতে ইচ্ছুক বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাকে না জানিয়ে বিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করা বেআইনি। বিষয়টির তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি।
অভিযোগের বিষয়ে কালাইয়া হায়াতুন্নেছা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মাদ হারুনূর রশীদ বলেন, যথাযথ নিয়ম মেনেই কেন্দ্রের জন্য আবেদন করেছি। অধিকাংশ বিদ্যালয় আমাদের সঙ্গে একমত। কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নাম দেওয়া হয়েছে, তবে তারা স্বাক্ষর করেনি। এতে তাদের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সালেহ আহমেদ বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু তাহের মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রের জন্য যে কেউ আবেদন করতে পারেন। আমরা সব বিষয় পর্যালোচনা করে নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।
মতামত