মোবাইলে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমের সম্পর্ক, এরপর বিয়ের আয়োজন। আর সেই বিয়েকে কেন্দ্র করে নানা কৌশলে ইতালি প্রবাসী এক যুবকের কাছ থেকে প্রায় ১৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সুনামগঞ্জের এক তরুণী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে। তবে অভিযুক্ত তরুণী দাবি করেছেন, তার পরিবার নেওয়া টাকা ফেরত দেবে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার চরযশোরদী ইউনিয়নের চরযশোরদী গ্রামের আশরাফ আলীর ছেলে এরশাদ দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সুনামগঞ্জ জেলার এক তরুণী আরিফা রহমান ঐশীর সঙ্গে তার পরিচয় ও পরে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
আরিফা রহমান ঐশীর বাবার নাম লিটন মিয়া ও মায়ের নাম জিবলী বেগম। তাদের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার ওয়েজখালী-তেঘরিয়া এলাকায় বলে জানা গেছে।
এরশাদ ও তার পরিবারের অভিযোগ, আরিফা ও তার পরিবারের সদস্যরা নিজেদের আর্থিকভাবে সচ্ছল, সিলেট শহরে বাড়ি এবং বিদেশে অবস্থানরত স্বজনসহ নানা পরিচয় দিয়ে এরশাদ ও তার পরিবারের বিশ্বাস অর্জন করেন। পরে বিয়ের প্রস্তাব দিলে এরশাদের পরিবারের সদস্যরা সিলেটে গিয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের সময় সিলেট শহরে একটি বাড়ি ভাড়া করে বিয়ের আয়োজন করা হয় এবং কাবিননামায় ৮ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে এরশাদ ও তার পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী এরশাদের বাবা আশরাফ আলী বলেন, “আমার ছেলে ইতালিতে থাকে। মোবাইলে ওই মেয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মেয়ের পরিবার নিজেদের অনেক পরিচয় দেয়। তারা বলে, মেয়ের মা কাউন্সিলর এবং বাবা লন্ডনে থাকেন। সিলেট শহরে তাদের বাড়িঘর রয়েছে। বিয়ের কথা বলে আমাদের সিলেটে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “বিয়ের পর আমরা ছেলের বউকে বাড়িতে নিয়ে আসি। কিছুদিন পর তাকে বাপের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, তাদের দেওয়া আগের কথাবার্তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। কিন্তু এর আগেই বিভিন্ন কৌশলে আমার পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।”
ইতালি প্রবাসী এরশাদ অভিযোগ করে বলেন, “বিয়ের কয়েকদিন পর আমার কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা ধার হিসেবে নেওয়া হয়। আবার বিভিন্ন সময়ে আমার স্ত্রীকে দিয়ে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। একটি আইফোন কেনার জন্যও টাকা দিয়েছি। এছাড়া আমার বাবার কাছ থেকে ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৯ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়েছে তারা।”
তিনি আরও বলেন, “মোবাইলে আমার স্ত্রী ও শাশুড়ি যে পরিচয় দিয়েছিল, পরে তার অনেক কিছুর সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাইনি। আমি জানতাম না যে, এভাবে প্রতারণার শিকার হব।”
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মেয়ের পরিবারের কথাবার্তায় সন্দেহ দেখা দিলে এরশাদের বাবা মেয়েকে তার শ্বশুরবাড়ি নগরকান্দায় নিয়ে আসেন। এরপর মেয়েকে পুনরায় সুনামগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
পরিবারটির দাবি, একপর্যায়ে মেয়ের মায়ের মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। এমনকি ভিডিও কলে লাশ ফ্রিজে রাখা আছে বলেও দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
এদিকে গত ৮ সেপ্টেম্বর মেয়েকে নগরকান্দার শ্বশুরবাড়িতে আটকে রেখে জিম্মি করা হয়েছে—এমন অভিযোগ করে মেয়ের পরিবার নগরকান্দা থানায় যোগাযোগ করে। পরে পুলিশের সহযোগিতায় মেয়েকে তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং তারা সুনামগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন।
নগরকান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ বলেন, “মেয়ের বাবা-মা থানায় অভিযোগ করেন যে, তাদের মেয়েকে আটকে রেখে জিম্মি করা হয়েছে। অভিযোগের পর পুলিশ পাঠিয়ে মেয়েটিকে তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছেলে পক্ষ চাইলে প্রতারণার অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।”
৮ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে একটি অঙ্গীকারনামাও করা হয়। তবে পরে বিভিন্ন কৌশলে মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারের।
এ বিষয়ে আরিফা রহমান ঐশী বলেন, “মোবাইলে আমাদের সম্পর্ক হয়। বিয়ের পরে আমার পরিবারকে ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আমার স্বামীর কাছ থেকে ও আমার শ্বশুরের কাছ থেকে আমার মা আরও ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়েছে। সেই টাকা ফেরত দেওয়া হবে, তবে কিছু সময় লাগবে।”
তিনি আরও দাবি করেন, তার পরিবারের নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে এরশাদ ও তার পরিবারের দাবি, বিয়ের নাটক সাজিয়ে পরিকল্পিতভাবে তাদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতারণার মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবার দ্রুত তাদের টাকা ফেরত এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
মতামত