রংপুর নগরীর বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর চার খুন মামলার তদন্তে নতুন এবং চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের আগে খুনের মূল অভিযুক্তদের কাছে ইয়াবা বিক্রির চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে আদালতে সাক্ষী হিসেবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন শান্ত দাস নামের এক ব্যক্তি।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রংপুর মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারকের খাসকামরায় এই জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। জবানবন্দি প্রদানকারী শান্ত দাস স্থানীয় বাদল দাসের ছেলে।
মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা ও রংপুর মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী জানান, হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস ঘটনার আগের রাতে শান্ত দাসের কাছ থেকে মোবাইল ফোন বন্ধক রেখে ইয়াবা কিনেছিল বলে তদন্তে উঠে আসে। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় শান্ত দাস বিষয়টি স্বীকার করায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেন।
তদন্ত সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে শান্ত দাস আদালতকে জানিয়েছে, গত ২১ আগস্ট রাতে দফায় দফায় তার কাছ থেকে ইয়াবা কেনা হয়েছিল। প্রথমে রাত ৯টার দিকে তিনটি এবং পরবর্তীতে ভোররাতে আরও পাঁচটি ইয়াবা সংগ্রহ করে অভিযুক্তরা। সাড়ে তিন হাজার টাকায় একটি মোবাইল ফোন বন্ধক রেখে ওই মাদক কেনা হয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, হত্যাকাণ্ডের পরের দিন শুক্রবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নতুন চকচকে টাকা দিয়ে সেই বন্ধকি মোবাইল ফোনটি আবার ছাড়িয়েও নেওয়া হয়।
এর আগে রোববার দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওসি জিন্নাত আলীর নেতৃত্বে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শান্ত দাসকে আদালতে হাজির করা হয়। মাদক কারবারি হওয়া সত্ত্বেও তাকে কেন তাৎক্ষণিকভাবে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি ডিবি সনাতন চক্রবর্তী স্পষ্ট করেন যে, শান্ত দাসের বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো মাদকের মামলা ছিল না এবং আটকের সময় তার নিকট থেকে কোনো মাদকদ্রব্যও উদ্ধার করা হয়নি। তবে তিনি নিজেই মাদক সেবনের কথা স্বীকার করায় তাকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২১ আগস্ট ভোরে রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে একই পরিবারের চার জনের মরদেহ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক গণমতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বোলা, কন্যা আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং পুত্র আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম। ২২ আগস্ট রাত থেকে ২৩ আগস্ট ভোররাতের মধ্যে পুলিশ এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের রহস্য ভেদ করে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পরপরই তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিল।
পরবর্তীতে এই মামলার তদন্তের স্বার্থে একে একে সাক্ষ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। গত ২৫ আগস্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন অভিযুক্তদের বন্ধু সীমান্ত, যার ঘরে বসে হত্যাকাণ্ডের আগে ইয়াবা সেবন করা হয়েছিল। এছাড়া ২৬ আগস্ট আদালতে জবানবন্দি দেন দখিগঞ্জ শ্মশানের পাহারাদার বিদ্যুৎ দাস, যার কাছে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে আশ্রয় চেয়ে খুনের কথা স্বীকার করেছিল মুগ্ধ।
এদিকে পৈশাচিক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে পুরো রংপুরবাসী। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
মতামত