সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সাবেক র্যাব কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসান এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী ও অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন-সংশ্লিষ্ট সূত্র।
রোববার (৩০ আগস্ট) ট্রাইব্যুনালের একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, সাগর-রুনি হত্যার আগে পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন সাংবাদিক দম্পতি। সেটি প্রকাশের আগেই তাদের হত্যা করা হয়। পরে ওই তথ্যচিত্রের উপকরণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় বলে তদন্তে তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে যুক্ত একজন কর্মকর্তা জানান, সাগর-রুনি হত্যার আগে ও পরে তৎকালীন র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান জিয়াউল আহসান এবং রোকেয়া প্রাচীর মধ্যে ২০ বারের বেশি যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব কথোপকথনের বিষয়বস্তু খতিয়ে দেখতে গিয়ে তদন্তকারীরা পেনড্রাইভ হস্তান্তরের ঘটনাও জানতে পারেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর জিয়াউল আহসানের এক বিশ্বস্ত সহকারী রোকেয়া প্রাচীর কাছে গেলে তিনি দুটি পেনড্রাইভ দেন। সেগুলোতে বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৈরি করা তথ্যচিত্র ছিল বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। পরে পেনড্রাইভ দুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোকেয়া প্রাচীর কাছে দেওয়া হয়েছিল এবং দুই দিন পর তা ফেরত নেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় জিয়াউল আহসানের ওই সহকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পেনড্রাইভ হস্তান্তরসহ সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের একজন কর্মকর্তা।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে থানা পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করলেও চার দিনের মাথায় দায়িত্ব যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে। দুই মাসের বেশি সময়েও রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় হাইকোর্টের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল তদন্তভার র্যাবের হাতে দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন র্যাব তদন্ত করেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে না পারায় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট র্যাবকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দেয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (পিবিআই) প্রধানকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। বর্তমানে ওই টাস্কফোর্সই মামলাটির তদন্ত পরিচালনা করছে।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হওয়ায় একাধিকবার সময় বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল হাইকোর্ট আরও ছয় মাস সময় দেন। এ পর্যন্ত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ মোট ১২৯ বার পেছানো হয়েছে।
মামলাটিতে বিভিন্ন সময়ে রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, সাগর-রুনির বাসার নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তানভীর রহমান খানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
তানভীর রহমান খান বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পালও জামিনে মুক্ত হওয়ার পর থেকে পলাতক। অন্য আসামিরা কারাগারে রয়েছেন।
দীর্ঘ ১৪ বছরেও চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ না হওয়ায় মামলাটি নিয়ে প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। নতুন করে উঠে আসা সম্পৃক্ততার তথ্য তদন্তে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মতামত