একটি ঘর। চারপাশে জীর্ণ দেয়াল, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। সেই ঘরটিই ছিল সালেহা বেগমের পৃথিবী। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এভাবেই কেটে গেছে ১৫টি বছর।
এই দীর্ঘ সময়ে ঘরের দরজা পেরিয়ে বাইরে আসেননি তিনি। কারও সঙ্গে কথা বলেননি। প্রতিবেশীদের কাছে তিনি যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়েছিলেন জীবনের স্বাভাবিক স্রোত থেকে।
স্বামী আবুল কালামের মৃত্যুর পর যে শোক তাঁকে আচ্ছন্ন করেছিল, তা যেন একসময় তাঁকে পুরোপুরি নিজের ভেতরে বন্দী করে ফেলে। সেই বন্দিত্ব আর ভাঙেনি। ১৫ বছর ধরে একটি জরাজীর্ণ ঘরই হয়ে ওঠে তাঁর ঠিকানা, আশ্রয় এবং একমাত্র পৃথিবী। অবশেষে সেই দীর্ঘ নীরবতার অবসান হয়েছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সালেহা বেগমের করুণ জীবনের কথা প্রকাশের পর শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরের নাচনাপাড়া এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর থেকে তাঁকে বের করে আনেন তাঁর ছেলে জিয়াউর রহমান। পরে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় চিকিৎসার জন্য তাঁকে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
সালেহাকে উদ্ধারের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম।ঘর থেকে বের হওয়ার সেই মুহূর্ত ১৫ বছর পর ঘরের সীমানা পেরিয়ে বাইরে এলেন সালেহা। তাঁর এই বেরিয়ে আসার দৃশ্য ছিল স্থানীয়দের জন্যও আবেগঘন।
যে নারী দীর্ঘদিন মানুষের চোখের আড়ালে ছিলেন, তাঁকে এবার চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। তাঁর সামনে খুলে গেল নতুন একটি সম্ভাবনার দরজা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, স্বামী আবুল কালামের মৃত্যুর পর সালেহা নিজেকে ক্রমেই গুটিয়ে নিতে থাকেন। একসময় ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেন। কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় মানুষের সঙ্গে। এভাবেই কেটে যায় এক যুগেরও বেশি সময়।
তবে তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের খবর পুরোপুরি অজানা ছিল না স্বজনদের কাছে। মেয়ে লাকী বেগম দীর্ঘদিন ধরে মায়ের জন্য খাবার পৌঁছে দিতেন। কিন্তু শুধু খাবার পৌঁছে দেওয়া দিয়ে তো একজন মানুষের পূর্ণ জীবন চলে না। প্রয়োজন হয় চিকিৎসা, পরিচর্যা, নিরাপত্তা ও মানুষের সঙ্গ। সেই জায়গাতেই ছিল সবচেয়ে বড় শূন্যতা। ছেলেও অসহায় সালেহার ছেলে জিয়াউর রহমান মায়ের পাশে থাকতে চাইলেও সবসময় তা সম্ভব হয়নি। নিজেই যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর জীবনও ছিল নানা সীমাবদ্ধতায় ঘেরা।
মায়ের অসহায়ত্ব একদিকে, নিজের অসুস্থতা অন্যদিকে দুইয়ের মাঝে পড়ে তিনিও ছিলেন অসহায়। ফলে সালেহার ১৫ বছরের জীবন আরও বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।
এবার নতুন ঘরের স্বপ্ন সালেহাকে হাসপাতালে নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে চোখের সামনে চলতে থাকা এই মানবিক সংকটের একটি দৃশ্যমান সমাধানের পথে এগোনো শুরু হয়েছে।
স্থানীয়রা শুধু তাঁর চিকিৎসাই চান না; চান জীবনের বাকি সময়টুকু যেন নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশে কাটাতে পারেন সালেহা।
তাঁদের দাবি, জরাজীর্ণ ঘরটির পরিবর্তে তাঁর জন্য একটি নতুন ঘর তৈরি করা হোক। যেখানে বৃষ্টি এলে পানি পড়বে না, ভেঙে পড়ার ভয় থাকবে না, আর থাকবে না সেই দীর্ঘ বন্দিত্বের স্মৃতি।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান জানিয়েছেন, সালেহা বেগমের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বহন করা হবে। চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁর নিরাপদ বসবাসের ব্যবস্থা করতেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন ঘর নির্মাণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
১৫ বছর আগে স্বামীকে হারিয়ে যে নারী নিজেকে চার দেয়ালের মধ্যে হারিয়ে ফেলেছিলেন, তাঁর জীবনে এবার হয়তো নতুন একটি অধ্যায়ের শুরু।
হয়তো এই হাসপাতালের বিছানা থেকেই শুরু হবে তাঁর ফিরে আসার গল্প মানুষের কাছে, আলোয়, স্বাভাবিক জীবনে। আর নাচনাপাড়ার সেই জরাজীর্ণ ঘরটি হয়ে থাকবে তাঁর জীবনের দীর্ঘ ১৫ বছরের নীরব সাক্ষী।
মতামত