বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে আমন্ত্রণ জানাতে দিল্লি থেকে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সম্ভাব্য এই সফর নিয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো না হলেও, ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের আগাম প্রস্তুতি এবং একাধিক উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে 'চেঞ্জ অব গার্ড' আয়োজনের তথ্য সংবলিত একটি ই-মেইল পাঠানো হয়, যা পরে দ্রুতই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই জল্পনা আরও জোরালো রূপ নেয়। যদিও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ স্পষ্ট করেছেন যে, সফরের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
তবে ভারত যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রধানকে নিয়ে অত্যন্ত আগ্রহী, তার বড় প্রমাণ মিলছে ভারতীয় কূটনীতিকদের বক্তব্যে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী নিশ্চিত করেছেন, সফর বাস্তবায়িত হলে তারেক রহমানকে 'সর্বোচ্চ সম্মান' ও 'স্মরণীয় অভ্যর্থনা' জানানো হবে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ মনে করছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিয়েও ঢাকার সাথে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও চিকিৎসা ভিসার মতো ক্ষেত্রগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে ভারত এখন ইতিবাচক পদে এগোচ্ছে।
তবে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান। বাংলাদেশে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর ভারতে বসে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করছে। সম্প্রতি দিল্লির একটি ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সমালোচনা করলে ঢাকা কড়া প্রতিক্রিয়া দেখায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, এমন সময়ে হাসিনার বক্তব্য সম্পর্কের বরফ গলানোর ক্ষেত্রে ভারতের আন্তরিকতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে।
ভারতের উদ্বেগের আরেক কারণ হলো শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর ও প্রতিরক্ষা আলোচনা ভারতকে গভীরভাবে নজর রাখতে বাধ্য করছে। পাশাপাশি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রস্তাবিত 'মক্কা চুক্তি' এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক বলয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের ইঙ্গিতও ভারতের নজর এড়ায়নি।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করা, ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রক্ষা করা এবং ৪,০৯৬ কিলোমিটারের বিশাল সীমান্ত নিরাপত্তার খাতিরে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা দিল্লির জন্য কৌশলগতভাবে অপরিহার্য।
আসন্ন সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কিংবা ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর বাস্তবে রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশকে ইতোমধ্যেই বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। সব মিলিয়ে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পর্ক নতুন করে ঝালিয়ে নিতে দিল্লির বার্তা এখন একেবারেই পরিষ্কার।
সূত্র: বিবিসি
মতামত