বাংলাদেশের স্বপ্নের বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বিঘ্নে, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আর্থিকসহ সব ধরনের দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের কাছে দৃশ্যমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আর এ জন্য দেশের সার্বিক রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যমান ইকোসিস্টেমে সততা ও শুদ্ধাচার নিশ্চিত করতে হবে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর সহযোগিতায় এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর আয়োজনে ‘বিচারিক কার্যক্রমে শুদ্ধাচার’ বিষয়ক তিন দিনব্যাপী (৮-১০ নভেম্বর) কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
রোববার ৮ নভেম্বর রাজধানীর তেজগাঁওয়ে হোটেল হলিডে ইন-এ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী জনাব মো. আসাদুজ্জামান, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের রুল অব ল, জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সিনিয়র অ্যাডভাইজার রোমানা শোয়েগার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ ও কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
সূচনা বক্তব্যে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বিচারিক সততা ও শুদ্ধাচার (জুডিশিয়াল ইন্টিগ্রিটি) একটি জনকল্যাণমুখী, ন্যায়বিচার-নির্ভর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য। বিচারকদের সততা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা ও মর্যাদা নির্ভর করে। আইনের চোখে সবাই সমান—কোনো ধরনের দলীয় রাজনৈতিক বা আর্থিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে আইনের শাসনের এই মূলনীতি বাস্তবায়নের জন্য জুডিশিয়াল ইন্টিগ্রিটির বিকল্প নেই।
“তবে বাংলাদেশে দীর্ঘকালীন অসুস্থ রাজনীতির শিকার হয়ে অন্যান্য প্রায় সব পেশা বা প্রতিষ্ঠানের মতো বিচার বিভাগেও রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব একধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। বিচারব্যবস্থা তথা বিচারিক শুদ্ধাচার দেশের সার্বিক রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক-প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেমেরই অংশ। তাই বাংলাদেশের এই ইকোসিস্টেমের রাজনীতি, আমলাতন্ত্র তথা অন্যান্য সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আঙ্গিকে ও সামষ্টিকভাবে সততা ও শুদ্ধাচারের পথে যতটুকু অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বিচারিক শুদ্ধাচারও ততটুকুই অর্জিত হবে।”
ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দিয়ে রোমানা শোয়েগার বলেন, “বাংলাদেশে একটি স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণকেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউএনডিপি ও টিআইবির মধ্যে চলমান অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে।”
বিচার বিভাগীয় শুদ্ধাচারকে স্বাধীন বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার মূল ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিচার বিভাগীয় শুদ্ধাচার রক্ষার অর্থ হলো—প্রতিটি সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র আইনের ওপর ভিত্তি করেই গৃহীত হবে। আইনের শাসনই বিচার প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা টিকিয়ে রাখে।
“বর্তমানে বাংলাদেশের বিচার বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, বিচার বিভাগের সামগ্রিক উন্নয়ন ও নৈতিকতা শক্তিশালী করতে বর্তমানের চেয়ে অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ এর আগে আর কখনোই ছিল না। তাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও শুদ্ধাচারবিষয়ক একটি কাঠামো ইতোমধ্যে বিদ্যমান থাকলেও বর্তমান সময়ের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাঠামোটিকে পর্যায়ক্রমে হালনাগাদ করা প্রয়োজন।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় শুদ্ধাচারের সমস্যা শুধু আর্থিক দৃষ্টিকোণ (Financial Perspective) থেকে দেখলে হবে না, বরং একে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ (Intellectual Perspective) থেকেও দেখতে হবে। বিচারব্যবস্থায় আর্থিক দুর্নীতি যতটা না ক্ষতিকর, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি।
“বিগত বছরগুলোতে উচ্চ আদালত সংকটকালীন সময়ে সরকারের মুখোমুখি হয়ে মানুষের পাশে কতটা দাঁড়িয়েছে—এমন প্রশ্ন তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যখন পঞ্চদশ সংশোধনীর মতো রায় আসে; বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ধ্বংস করে যখন ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত করার প্রক্রিয়া উচ্চ আদালত থেকে চালু করা হয়; তখন এগুলোকে আর আর্থিক দুর্নীতির বাই-প্রোডাক্ট বলার সুযোগ থাকে না। পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির বাই-প্রোডাক্ট।’”
বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় এবং স্বাধীনতার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “সংবিধান সংশোধন করে আমরা বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছি। আমরা এমন বিচারব্যবস্থা চাই, যেখানে ন্যায়বিচার বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠে নির্বিঘ্নে এবং জনগণের কাছে দৃশ্যমান হবে।”
এ সময় বিচারব্যবস্থার সাংবিধানিক সংশোধনে টিআইবির যেকোনো মৌলিক ও জনকল্যাণমুখী পরামর্শ লিখিতভাবে আগামী ১০ দিনের মধ্যে দিলে, তা নিয়ে আলোচনার প্রতিশ্রুতি দেন মন্ত্রী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে তিন দিনব্যাপী এই কর্মশালার প্রথম দিনের সেশন পরিচালনা করেন অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাককুয়ারি ল’ স্কুলের ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ল-এর শিক্ষক অধ্যাপক ড. এম শওকত আলম। প্রশিক্ষণটি আগামী ১০ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। উচ্চ আদালতের অনুমতিক্রমে এবং আইন ও বিচার বিভাগ কর্তৃক মনোনীত সারা দেশের অধস্তন আদালতের ২৫ জন বিচারক এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করছেন।
মতামত