স্বাধীনতা মানুষের অস্তিত্বের একটি মৌলিক আলাপ। কয়েকটি প্রশ্নের মধ্যবর্তী সম্পর্কে স্বাধীনতার দার্শনিক তাৎপর্য নিহিত। প্রশ্নগুলো হচ্ছে, মানুষের কী চাই? মানুষ কী করতে পারে? কী করতে চায়? কী করা তার পক্ষে ন্যায়সংগত?
নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু ইচ্ছার বাস্তবায়নই স্বাধীনতার পূর্ণ পরিচয় নয়। কারণ, মানুষের ইচ্ছা কখনো পরিচালিত হয় প্রবৃত্তি দ্বারা, কখনো অজ্ঞতা, কখনো সামাজিক প্রভাব, আবার কখনো ক্ষমতা ও ভোগের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা।
ফলে মানুষ যা চাইছে, তা সত্যিই তার বিবেকবান ইচ্ছার জাহিরি কি না, সেই প্রশ্নও স্বাধীনতার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রে স্বাধীনতাকে বিচার করা হয় মানুষের সৃষ্টিগত অবস্থান, এখতিয়ার, নৈতিক দায়িত্ব এবং অস্তিত্বের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে। নিজের অস্তিত্বের সব শর্ত মানুষ নিজেই নির্ধারণ করে না। তার জন্ম, বদন, প্রকৃতি ও সামাজিক পরিবেশের বহু উপাদান তার অস্তিত্ব ও ইচ্ছার পূর্বেই বিদ্যমান।
কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সে উপলব্ধি, বিচার, নির্বাচন ও কর্মের মাধ্যমে নিজের জীবনের অভিমুখ নির্ধারণে অংশ নিতে পারে। তার স্বাধীনতা তাই শর্তহীনতা নয়; বরং শর্তের মধ্যে দায়িত্বশীল কর্মক্ষমতার বিকাশ।
এখানে সে প্রয়োগ করে এখতিয়ার। এখতিয়ারের মাধ্যমে সে বিভিন্ন বিকল্পের মধ্য থেকে একটি বেছে নেয়। এই বেছে নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত আছে বিকল্পের তাৎপর্য উপলব্ধি, পরিণতি বিচার এবং নিজের কর্মের দায় গ্রহণের সক্ষমতার।
একজন মানুষ ক্রুদ্ধ হতে পারেন, কিন্তু ক্রোধের বশবর্তী হয়ে অন্যায় করা এবং ক্রোধকে সংযত করে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়।
একইভাবে সম্পদের আকাঙ্ক্ষা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হতে পারে, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য অন্যের অধিকার হরণ করা নৈতিকভাবে জায়েজ হয়ে যায় না। মানুষের স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ ঘটে তার প্রবৃত্তির সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের এই সামর্থ্যে।
এখানে মানুষের সৃষ্টিগত প্রবণতা ও যথার্থতার প্রতি অন্তর্নিহিত অভিমুখের ধারণা দেয় ফিতরাত। তবে ফিতরাত আছে বলেই মানুষের প্রতিটি ইচ্ছা ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। মানুষের উপলব্ধি ভুল হতে পারে, আকাঙ্ক্ষা তাকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং সামাজিক পরিবেশ তার বিচারবোধকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই ফিতরাতের সঙ্গে স্বাধীনতার সম্পর্ক হলো সম্ভাবনা ও তার যথার্থ বিকাশের সম্পর্ক। মানুষকে নিজের প্রবণতা চিনতে, সত্য-মিথ্যা বিচার করতে এবং ন্যায়সংগত কর্মের মধ্য দিয়ে নিজের সক্ষমতাকে বিকশিত করতে হয়।
স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণেও এই উপলব্ধি জরুরি। সব সীমা স্বাধীনতার শত্রু নয়। অন্যায়ভাবে মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া অন্যায়। কিন্তু মতপ্রকাশের নামে অন্যের জীবন বিপন্ন করার চেষ্টাকে অধিকার অধিকার বলে না। প্রথম বাধা স্বাধীনতার ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপ। দ্বিতীয়টি অন্যের অধিকার রক্ষার ন্যায়সংগত শর্ত।
একইভাবে কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করার সামর্থ্য থাকলেই সীমাহীনভাবে তাকে ব্যবহার করার নৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। মানুষের কর্মকাণ্ড যখন অন্যের জীবন, জীবিকা কিংবা প্রকৃতির স্থায়িত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তখন ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন বৃহত্তর ন্যায়বিচারের প্রশ্নে পরিণত হয়।
ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের সম্পর্কমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃতি ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয় মানুষ। তার জীবন নির্ভর করে পানি, বায়ু, খাদ্য, সামাজিক সহযোগিতা এবং অসংখ্য প্রাকৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শর্তের ওপর।
তাই স্বাধীনতার এমন ব্যাখ্যা কবুল করা যায় না, যা ব্যক্তির ইচ্ছাকে চূড়ান্ত বানায় আর তার কর্মের সামাজিক ও পরিবেশগত পরিণতিকে উপেক্ষা করে। নিজের স্বাধীনতা প্রয়োগের সময় অন্যের অধিকার রক্ষা করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনভিত্তিকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। এটি দায়িত্বশীল স্বাধীনতার অংশ।
এখানে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি সামনে আসে। আত্মনিয়ন্ত্রণ মানে নিজের আকাঙ্ক্ষা, আবেগ ও অভ্যাসকে চিনে সেগুলোর যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা। মানুষ তাৎক্ষণিক আনন্দের আকর্ষণ অনুভব করেও দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা বিবেচনা করতে পারে।
সে নিজের ভুল উপলব্ধি করে সিদ্ধান্ত সংশোধন করতে পারে এবং অনুশীলনের মাধ্যমে ধৈর্য, সংযম ও দায়িত্বশীলতার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। এই আত্মনিয়ন্ত্রণ স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে না; বরং মানুষকে নিজের প্রবণতার অন্ধ অনুসরণ থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়।
তবে শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির ভিত্তিতে স্বাধীনতার পূর্ণ বিকাশ ঘটে না। দারিদ্র্য, জবরদস্তি, অশিক্ষা, তথ্যের অভাব এবং অন্যায্য সামাজিক কাঠামো মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তব সুযোগকে সংকুচিত করে দেয়।
যে মানুষ জীবিকার ভয়ে অন্যায় নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না, কিংবা যে নাগরিক পরিকল্পিত অপতথ্য ও ন্যারেটিভের দ্বারা প্রভাবিত হন, তাঁদের স্বাধীনতা বিচার করতে হলে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পরিস্থিতিগত সীমাবদ্ধতাকেও বিবেচনায় আনতে হবে।
তাই স্বাধীনতার ন্যায়সংগত বিকাশে শিক্ষা, তথ্যপ্রাপ্তি, সামাজিক নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং ক্ষমতার জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতার সঙ্গে নৈতিক জবাবদিহির সম্পর্কও অবিচ্ছেদ্য। মানুষ তার কর্মের পরিণতি সম্পর্কে যতটা জানে এবং সেই কর্মের ওপর যতটা নিয়ন্ত্রণ রাখে, তার দায় নির্ধারণে ততটা সতর্ক থাকে না সব সময়।
দায় নির্ধারণ একমুখী বিষয় নয়। ইচ্ছাকৃত অন্যায়, অনিবার্য ভুল এবং জবরদস্তির মুখে সংঘটিত কাজের নৈতিক মূল্যায়ন এক হতে পারে না। একই সঙ্গে জবাবদিহি শুধু শাস্তির বিষয় নয়। ক্ষতির স্বীকৃতি ও প্রতিকার জবাবদিহির অংশ; ক্ষতির সংশোধন এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতি প্রতিরোধের দায়িত্বও এর অন্তর্ভুক্ত।
ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের আলোকে স্বাধীনতার ধারণাটি এভাবে একটি সুসংবদ্ধ দার্শনিক কাঠামো লাভ করে। এর অস্তিত্বগত ভিত্তি মানুষের সৃষ্টিগত অবস্থান; এর কার্যকর প্রকাশ এখতিয়ার; এর অন্তর্গত শর্ত আত্মনিয়ন্ত্রণ; এর সামাজিক শর্ত অন্যের অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি; আর এর নৈতিক পরিণতি জবাবদিহি ও দায়িত্বশীল কর্ম।
এর মানে পরিষ্কার। স্বাধীনতা স্রেফ নিজের ইচ্ছা বাস্তবায়নের ক্ষমতা নয়। সে মূলত নিজের ইচ্ছাকে চিনতে, বিচার করতে এবং ন্যায়সংগতভাবে পরিচালনা করতে পারার সামর্থ্য। মানুষ যা করতে সক্ষম, তা করে ফেলা সব সময় তার পক্ষে সংগত নয়।
আবার সীমাবদ্ধতার উপস্থিতি মানুষের আরেক বাস্তবতা। কিন্তু সীমাবদ্ধতা তার নৈতিক কর্মক্ষমতাকে বিলুপ্ত করে না। স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্যকে বুঝতে এই দুই সত্যের মধ্যকার সম্পর্ক উপলব্ধি করা জরুরি। কারণ, এই দুইয়ের মধ্যখানে তার বসবাস।
ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রে স্বাধীনতার লক্ষ্য হবে এমন এক মানবিক সক্ষমতার বিকাশ, যেখানে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রজ্ঞাকে দেয় গভীরতা, এখতিয়ার যুক্ত হয় নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে এবং ব্যক্তির কর্ম বৃহত্তর অস্তিত্বের কল্যাণের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
এর ফলে স্বাধীনতা নিছক ব্যক্তিগত ইচ্ছার পরিসরে আটকে থাকে না। সে এখতিয়ারের সঙ্গে ন্যায়কে যুক্ত করে। ন্যায় থেকে এগিয়ে যায় উৎকর্ষের দিকে। এই প্রক্রিয়াকে করে তোলে মানুষের অগ্রযাত্রার একটি মৌলিক শর্ত।
মুসা আল হাফিজ : লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান
মতামত