বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সুনামগঞ্জে শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পূজা উদযাপন পরিষদের সার্বিক সহযোগিতায় জেলার ৪৪৪টি পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপিত হয়েছে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সম্প্রীতি ও আনন্দঘন পরিবেশে বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে সুনামগঞ্জ পৌরসভার আয়োজনে পৌর শহরের সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের বালুর মাঠে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পৌর শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে ঢাকঢোল, বাদ্যযন্ত্র ও নানা সাজসজ্জায় সজ্জিত দেবী দুর্গা ও অন্যান্য দেবদেবীর প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা সেখানে সমবেত হন। পরে পর্যায়ক্রমে প্রতিমাগুলো সুনামগঞ্জ রিভার ভিউ ঘাটে সুরমা নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। সুনামগঞ্জ পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রতিমা বিসর্জন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন পিপিএম, সুনামগঞ্জ সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার চাতল চাকমা, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শেরেনূর আলী, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিমল বণিক, পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট বিমান রায়, পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম কয়েস, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন শেখ, ওসি (তদন্ত) আরিফ উল্লাহ, পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী হোসাইন আহমদ আনিসসহ পৌরসভার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ ছাড়া র্যাব, ফায়ার সার্ভিসের সদস্য, পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক এবং বিপুলসংখ্যক সনাতনী হিন্দু নারী-পুরুষ ও দর্শনার্থী উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন পিপিএম বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে নির্বিঘ্নে, নিরাপদে ও উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। জেলার ১২টি উপজেলায় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিটি থানার পুলিশ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন। সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। তিনি আরও বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব। ভবিষ্যতেও জেলার শান্তি, শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি রক্ষায় পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করে যাবে৷
সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম বলেন, দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসবই নয়, এটি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধেরও প্রতীক। সুনামগঞ্জের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ। এ ঐতিহ্য অটুট রেখে সবাইকে মিলেমিশে শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি দুর্গোৎসব সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদযাপন পরিষদ এবং স্থানীয় জনগণের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও অনুষ্ঠানের সভাপতি সন্তোষ কুমার দাস বলেন, পৌরসভার উদ্যোগে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠান সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় ভক্তরা নির্বিঘ্নে বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে পেরেছেন। তিনি এ আয়োজনে সহযোগিতা করা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট বিমান রায় বলেন, দুর্গোৎসব বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুনামগঞ্জে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপন ও প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হওয়ায় তাঁরা সন্তুষ্ট। এ জন্য তিনি প্রশাসন, পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা এবং সর্বস্তরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আগামী দিনেও এ সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধান এবং পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার নিবিড় নজরদারিতে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৫২টি পূজামণ্ডপসহ জেলার সব মণ্ডপে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদযাপন পরিষদ ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ উৎসবকে সুশৃঙ্খল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সনাতনী হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত রীতি অনুসারে, এ বছর দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে এবং গমন নৌকায়। বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার বিদায়কে কেন্দ্র করে ভক্তদের মধ্যে ছিল আবেগ, ভক্তি ও আগামী বছরের অপেক্ষা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
মতামত