বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

গাজীপুরে ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের অভিনব ফাঁদ



গাজীপুরে ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের অভিনব ফাঁদ

গাজীপুরের চৌরাস্তা, বোর্ডবাজার, টঙ্গী স্টেশন রোড কিংবা কোনাবাড়ী শিল্পাঞ্চল—প্রতিটি মোড়ে মোড়ে এখন ভিক্ষুকদের উপচে পড়া ভিড়। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন, শিল্পনগরী গাজীপুরে এত ভিক্ষুক হঠাৎ কোথা থেকে আসে? অনুসন্ধানে জানা গেছে, এটি কোনো সাধারণ অভাবজনিত ভিক্ষাবৃত্তি নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে একটি সুসংগঠিত ভিক্ষুক সিন্ডিকেট। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসহায় মানুষদের এনে ঢাকায় বিশেষ 'ট্রেনিং' বা কৌশল শিখিয়ে প্রতিদিন গাজীপুরের রাস্তায় নামানো হচ্ছে। এই ভিক্ষা বাণিজ্য থেকে চক্রটি প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

অনুসন্ধানে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, গাজীপুরে আসা ভিক্ষুকদের সিংহভাগই নদীভাঙন ও চরম দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা থেকে আসা। বিশেষ করে রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, শেরপুর এবং খুলনা উপকূলীয় অঞ্চলের অসহায় বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের টার্গেট করে এই সিন্ডিকেটের দালালরা। শিল্পনগরী হওয়ায় গাজীপুরে ভাসমান মানুষের আধিক্য এবং শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-বোনাস পাওয়ার কারণে এখানে মানুষের পকেটে টাকা থাকে। এই সুযোগটিই কাজে লাগায় চক্রটি। সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুরে আবুল হোসেন নামের এক মৃত ভিক্ষুকের পকেট থেকে ৭০ হাজার টাকা পাওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে ভিক্ষাবৃত্তি কতটা লাভজনক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

ভিক্ষুকদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেনিং সেন্টার না থাকলেও, সিন্ডিকেটের মূল আস্তানাগুলো গড়ে উঠেছে টঙ্গীর রেললাইন বস্তি, কামরাঙ্গীরচর, কারওয়ান বাজার এবং গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্প এলাকার বস্তিগুলোতে। এই আস্তানাগুলোতে নবাগতদের বিশেষ কিছু কৌশল বা 'অনানুষ্ঠানিক ট্রেনিং' দেওয়া হয়। কীভাবে পঙ্গু না হয়েও পঙ্গু সাজার অভিনয় করতে হবে, হাত-পা বাঁকা করে রাখা বা কৃত্রিম ক্ষত দেখানোর কৌশল শেখানো হয়। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও দয়া আকর্ষণের জন্য কোন কোন ডায়ালগ বা দোয়া পড়তে হবে, তা মুখস্থ করানো হয়। কোন সময়ে কোন বাসে বা কোন পোশাক কারখানার সামনে দাঁড়াতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সিন্ডিকেটের রয়েছে নির্দিষ্ট 'লাইনম্যান' বা জোন ম্যানেজার। প্রতিদিন ভোরে টঙ্গী বা ঢাকার আস্তানা থেকে লেগুনা বা ছোট পিকআপে করে ভিক্ষুকদের গাজীপুরের বিভিন্ন মোড়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। ভিক্ষুকদের দৈনিক আয়ের একটি বড় অংশ (প্রায় ৫০% থেকে ৬০%) নিয়ে নেয় এই লাইনম্যানরা। বিনিময়ে ভিক্ষুকদের থাকার জায়গা, খাবার এবং পুলিশের ঝামেলা থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেয় সিন্ডিকেট। ভিক্ষাবৃত্তির আড়ালে অনেকে অপরাধের সাথেও জড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি গাজীপুরের খাজা মার্কেট এলাকায় ভিক্ষুকের বেশে বাসায় ঢুকে চুরির অভিযোগে এক নারীকে আটকের ঘটনা এর বাস্তব প্রমাণ।

সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকার ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ভিক্ষুক পুনর্বাসনের জন্য লাখ লাখ টাকার বিশেষ বরাদ্দ দিলেও সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ এবং সমন্বয়ের অভাবে এই চক্রকে পুরোপুরি দমন করা যাচ্ছে না। পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে অনেক ভিক্ষুক পালিয়ে আবার সিন্ডিকেটের হাত ধরে রাস্তায় ফিরে আসে, কারণ অভিনব কৌশলে ভিক্ষা করা এখন তাদের কাছে কষ্টের কাজের চেয়ে সহজ উপার্জনের মাধ্যম।

সচেতন মহলের দাবি, এই চক্রের মূল হোতা বা লাইনম্যানদের আইনের আওতায় না আনলে গাজীপুরকে কোনোভাবেই ভিক্ষুকমুক্ত করা সম্ভব নয়।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬


গাজীপুরে ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের অভিনব ফাঁদ

প্রকাশের তারিখ : ২১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

গাজীপুরের চৌরাস্তা, বোর্ডবাজার, টঙ্গী স্টেশন রোড কিংবা কোনাবাড়ী শিল্পাঞ্চল—প্রতিটি মোড়ে মোড়ে এখন ভিক্ষুকদের উপচে পড়া ভিড়। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন, শিল্পনগরী গাজীপুরে এত ভিক্ষুক হঠাৎ কোথা থেকে আসে? অনুসন্ধানে জানা গেছে, এটি কোনো সাধারণ অভাবজনিত ভিক্ষাবৃত্তি নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে একটি সুসংগঠিত ভিক্ষুক সিন্ডিকেট। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসহায় মানুষদের এনে ঢাকায় বিশেষ 'ট্রেনিং' বা কৌশল শিখিয়ে প্রতিদিন গাজীপুরের রাস্তায় নামানো হচ্ছে। এই ভিক্ষা বাণিজ্য থেকে চক্রটি প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

অনুসন্ধানে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, গাজীপুরে আসা ভিক্ষুকদের সিংহভাগই নদীভাঙন ও চরম দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা থেকে আসা। বিশেষ করে রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, শেরপুর এবং খুলনা উপকূলীয় অঞ্চলের অসহায় বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের টার্গেট করে এই সিন্ডিকেটের দালালরা। শিল্পনগরী হওয়ায় গাজীপুরে ভাসমান মানুষের আধিক্য এবং শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-বোনাস পাওয়ার কারণে এখানে মানুষের পকেটে টাকা থাকে। এই সুযোগটিই কাজে লাগায় চক্রটি। সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুরে আবুল হোসেন নামের এক মৃত ভিক্ষুকের পকেট থেকে ৭০ হাজার টাকা পাওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে ভিক্ষাবৃত্তি কতটা লাভজনক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

ভিক্ষুকদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেনিং সেন্টার না থাকলেও, সিন্ডিকেটের মূল আস্তানাগুলো গড়ে উঠেছে টঙ্গীর রেললাইন বস্তি, কামরাঙ্গীরচর, কারওয়ান বাজার এবং গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্প এলাকার বস্তিগুলোতে। এই আস্তানাগুলোতে নবাগতদের বিশেষ কিছু কৌশল বা 'অনানুষ্ঠানিক ট্রেনিং' দেওয়া হয়। কীভাবে পঙ্গু না হয়েও পঙ্গু সাজার অভিনয় করতে হবে, হাত-পা বাঁকা করে রাখা বা কৃত্রিম ক্ষত দেখানোর কৌশল শেখানো হয়। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও দয়া আকর্ষণের জন্য কোন কোন ডায়ালগ বা দোয়া পড়তে হবে, তা মুখস্থ করানো হয়। কোন সময়ে কোন বাসে বা কোন পোশাক কারখানার সামনে দাঁড়াতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সিন্ডিকেটের রয়েছে নির্দিষ্ট 'লাইনম্যান' বা জোন ম্যানেজার। প্রতিদিন ভোরে টঙ্গী বা ঢাকার আস্তানা থেকে লেগুনা বা ছোট পিকআপে করে ভিক্ষুকদের গাজীপুরের বিভিন্ন মোড়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। ভিক্ষুকদের দৈনিক আয়ের একটি বড় অংশ (প্রায় ৫০% থেকে ৬০%) নিয়ে নেয় এই লাইনম্যানরা। বিনিময়ে ভিক্ষুকদের থাকার জায়গা, খাবার এবং পুলিশের ঝামেলা থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেয় সিন্ডিকেট। ভিক্ষাবৃত্তির আড়ালে অনেকে অপরাধের সাথেও জড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি গাজীপুরের খাজা মার্কেট এলাকায় ভিক্ষুকের বেশে বাসায় ঢুকে চুরির অভিযোগে এক নারীকে আটকের ঘটনা এর বাস্তব প্রমাণ।

সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকার ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ভিক্ষুক পুনর্বাসনের জন্য লাখ লাখ টাকার বিশেষ বরাদ্দ দিলেও সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ এবং সমন্বয়ের অভাবে এই চক্রকে পুরোপুরি দমন করা যাচ্ছে না। পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে অনেক ভিক্ষুক পালিয়ে আবার সিন্ডিকেটের হাত ধরে রাস্তায় ফিরে আসে, কারণ অভিনব কৌশলে ভিক্ষা করা এখন তাদের কাছে কষ্টের কাজের চেয়ে সহজ উপার্জনের মাধ্যম।

সচেতন মহলের দাবি, এই চক্রের মূল হোতা বা লাইনম্যানদের আইনের আওতায় না আনলে গাজীপুরকে কোনোভাবেই ভিক্ষুকমুক্ত করা সম্ভব নয়।



Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream