ফেনী জেলা জুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত জেলায় মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৯৭১ জন ছাড়িয়েছে। বিগত সেপ্টেম্বর মাস থেকে আক্রান্তের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ এখন রীতিমতো বিপৎসংকেত দিচ্ছে। অক্টোবর মাসের প্রথম ১১ দিনেই নতুন করে ২২৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ এবং হাসপাতালের চিত্র বলছে, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও আরও বেশি।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে ফেনী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। জেলায় বর্তমানে ৪৩ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, যার মধ্যে শুধু ফেনী সদর হাসপাতালেই ভর্তি আছেন ৩৫ জন। বাকি রোগীরা দাগনভূঞা, সোনাগাজী ও পরশুরাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।
হাসপাতালের পুরুষ ও মহিলা ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলো ঘুরে দেখা যায়, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী আসায় মেঝেতেও অনেককে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। জ্বর ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা নিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ বহির্বিভাগে ভিড় করছেন, যাদের একটি বড় অংশেরই পরীক্ষার পর ডেঙ্গু পজিটিভ আসছে। বিশেষ করে ফেনী পৌরসভার রামপুর এবং পুলিশ কোয়ার্টার এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসাধীন রামপুর এলাকার বাসিন্দা রফিকুলের ভাই সাইফুল ইসলাম জানান, "আমার ভাইয়ের টানা চার দিন ধরে তীব্র জ্বর। প্লাটিলেট দ্রুত নেমে যাওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে আসি। এসে দেখি কোনো বেড খালি নেই। নিরুপায় হয়ে মেঝেতেই চাদর বিছিয়ে স্যালাইন দিয়ে রেখেছি। রামপুর এলাকায় মশার অত্যাচারে টেকা দায়, অথচ পৌরসভা থেকে মশা মারার কোনো কার্যকর ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না।"
ডেঙ্গু ওয়ার্ডে কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, "গত বছরের তুলনায় এবার রোগীর চাপ চার গুণেরও বেশি। আমরা আমাদের সাধ্যমতো সেবা দিচ্ছি, কিন্তু প্রতিদিন যেভাবে নতুন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে, তাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। রোগীদের প্রতি আমাদের পরামর্শ—জ্বর হলেই যেন অবহেলা না করে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা (NS1) করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ সেবন না করেন।"
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যান
মোট আক্রান্ত চলতি বছর ৯৭১+ জন
সেপ্টেম্বর মাসের মোট আক্রান্ত ৪৯৭ জন বছরের সর্বোচ্চ, অক্টোবরের প্রথম ১১ দিনের আক্রান্ত ২২৮ জন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গত ২৪ ঘণ্টা ৪৩ জন সদরে ৩৫ জন, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ফেনী শহরের রামপুর ও পুলিশ কোয়ার্টার এলাকা, বিগত বছরের তুলনা ২০২৫ সালে মোট আক্রান্ত ছিল ২০১ জন, সে তুলনায় এবার আক্রান্ত চার গুণ বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ফেনী পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের মশক নিধন কার্যক্রম কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। ড্রেন ও পরিত্যক্ত জলাশয়গুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এডিস মশার লার্ভা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। সচেতন মহল মনে করছেন, এখনই ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করে মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা না হলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
মতামত