বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

নয়াদিল্লিতে ভোটাধিকার রক্ষায় রাজপথে তরুণেরা, কঠোর অবস্থানে পুলিশ



নয়াদিল্লিতে ভোটাধিকার রক্ষায় রাজপথে তরুণেরা, কঠোর অবস্থানে পুলিশ
নয়াদিল্লিতে ভোটাধিকার রক্ষায় রাজপথে তরুণেরা, কঠোর অবস্থানে পুলিশ

পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়েই গত শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৌঁছান ২২ বছর বয়সী কশিশ রাওয়াত। অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করা এই তরুণী রাজধানীতে গিয়ে দেখেন, শহরের চেনা চিত্র বদলে গেছে।

রাস্তায় রাস্তায় বসানো হয়েছে ধাতব ব্যারিকেড। আন্দোলনরত তরুণদের ছত্রভঙ্গ করতে কঠোর অবস্থান নেয় পুলিশ। কাউকে লাঠিপেটা করা হয়, কাউকে টেনেহিঁচড়ে পুলিশের বাসে তোলা হয়। আবার অনেককে ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়।

পুলিশের এসব কর্মকাণ্ডের দৃশ্য আন্দোলনকারীরা মুঠোফোনে ধারণ করেন। পরে সেসব ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন ভারতের তরুণেরা। তাঁদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দলকে রাজনৈতিক সুবিধা দিতেই পরিকল্পিতভাবে বিরোধীদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

আন্দোলনকারীদের জমায়েত ঠেকাতে পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ নেয়। তবে এসব বাধা উপেক্ষা করেই রাজপথে অবস্থান চালিয়ে যান কশিশ রাওয়াত ও তাঁর সহযোগীরা।

সারাদিন পুলিশের নজরদারি ও ধাওয়া এড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যান তাঁরা। নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে কশিশ বলেন, “আমরা কোথাও যাচ্ছি না। আমরা আবার আসব এবং আমাদের কথা বিশ্বকে শোনাব।”

চলতি মাসের শুরুর দিকে ভারতের এই আলোচিত 'ককরোচ' বা 'তেলাপোকা' তরুণ আন্দোলনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। মূলত গত বছর থেকে শুরু হওয়া বিতর্কিত ভোটার তালিকা পর্যালোচনার পর এ পর্যন্ত ১৩ কোটি বা ১৩০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এর ফলে কোটি কোটি নাগরিক পুরোপুরি ভোটাধিকার হারানোর চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন। তীব্র ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভকারীরা এখন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি তুলেছেন।

অবশ্য নির্বাচন কমিশনের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা বলছে, ভুয়া ও অযোগ্য ভোটারদের ছাঁটাই করে তালিকা নির্ভুল করার উদ্দেশ্যেই এই জাতীয় পর্যালোচনা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে, এসব বিক্ষোভ এবং তরুণদের রাজপথের আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তার দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অনেক শীর্ষ নেতা এসব আন্দোলনকারীদের সরাসরি 'অরাজকতাবাদী' বলে আখ্যা দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, কোনো ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়াই ক্ষমতাসীন দলের নেতারা দাবি করছেন যে, রাজপথের এই তরুণেরা নাকি কোনো বিদেশি শক্তির উসকানিতে কাজ করছে।

এই সংঘাত এখন সরাসরি আঘাত হেনেছে ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি, নাগরিকের ভোটাধিকারের ওপর। সেই সাথে এটি এখন এক বিশাল পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে পুরো তরুণ প্রজন্মকে। নরেন্দ্র মোদী বিগত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের ক্ষমতায় রয়েছেন। এই দীর্ঘ শাসনামলে যে প্রজন্ম বড় হয়ে উঠেছে, তাদের মনস্তাপ ও চরম হতাশা এখন হিন্দুত্ববাদী মোদী সরকারের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কোনো দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর গণসঙ্কটে রূপ নিতে পারবে কি না; সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে নিজের মনোভাব প্রকাশ করতে গিয়ে রাওয়াত নির্দ্বিধায় বলেন, আমি তাঁকে কোনো সর্বশক্তিমান ঈশ্বর মনে করি না। আমি তাকে শুধুই একজন প্রতিনিধি হিসেবে দেখি, যাকে আমরা নিজেরাই নির্বাচিত করেছি। তাই এই লোকটাকে প্রশ্ন করতে গিয়ে কেন আমাদের এত ভয় পাওয়ার দরকার, তা আমার মাথায় আসে না।

নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ ১২ বছরের শাসনামলে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। সরকারের সমালোচকদের মতে, শাসন বিভাগের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণের সব পথ সংকুচিত করা হয়েছে, ভিন্নমতকে পদ্ধতিগতভাবে দমন করা হচ্ছে এবং সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রতিনিয়ত লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় চাপ সৃষ্টির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ক সংগঠনগুলোও।

যদিও কেন্দ্রীয় সরকার এসব অভিযোগ শুরু থেকেই একবাক্যে অস্বীকার করে আসছে। তাদের বক্তব্য হলো, ভারতের গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কাঠামো সম্পূর্ণ শক্তিশালী রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেবল অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে, কোনো রাজনৈতিক ভিন্নমতের বিরুদ্ধে নয়।

তবে সাধারণ ভারতীয় তরুণদের বড় একটি অংশ আর এই সরকারি ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারছে না। তারা মনে করছে, ছোটবেলা থেকে তারা যেসব প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করতে শিখেছিল, সেগুলো আজ তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে তারা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলে মনে করছে, যেখানে সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা বা প্রশাসনিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার অর্থই নিজের মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকি ডেকে আনা। ভোটার তালিকার সাম্প্রতিক চরম বিতর্ক তরুণদের এই জমতে থাকা ক্ষোভকে যেন এক বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছে এবং পুরো এক প্রজন্মের অসন্তোষকে এনে দিয়েছে এক অভিন্ন আন্দোলনের প্রেক্ষাপট।

উল্লেখ্য, এর আগের গ্রীষ্মে তরুণেরা ব্যাপক রাজপথের আন্দোলন গড়ে তুলে নরেন্দ্র মোদীর শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল, যা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণ রাজপথের চাপের এক অভূতপূর্ব ও বিরল নজির ছিল। আর সেই সফলতার পর থেকে তরুণের এই ধারাবাহিক সংগঠিত রূপ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাম্প্রতিক তরুণ আন্দোলনের রূপরেখাকেই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেখানে জেন-জি সরাসরি পরাক্রমশালী রাজনৈতিক অভিজাতদের কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

১৯ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মায়া রিবেরো মনে করেন, ভোটার তালিকা পর্যালোচনার এই বিবাদ স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেওয়া গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে তাদের মনে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। গত শনিবার বন্ধুদের নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে রিবেরো জানান, তারা ভোটাধিকার নিবন্ধিত করেছিলেন কারণ তারা মনে করেছিলেন যে, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া কেবল একটি নাগরিক অধিকারই নয়, বরং এক বিশাল দায়িত্বও বটে। কিন্তু যেভাবে গণহারে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, তাতে নিজের ভোটাধিকার কতটুকু সুরক্ষিত, তা নিয়ে এখন তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে। রিবেরোর মতে, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে সুসংহত ও স্বচ্ছ করার এই সংগ্রাম তাই এখন তাঁদের কাছে সবচেয়ে জরুরি ও সময়োপযোগী এক লড়াই হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি তুলে ধরে রিবেরো বলেন, আমরা যখন ভোটের মতো কোনো গণতান্ত্রিক কাঠামোর কথা বলি, তখন তা অবশ্যই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটি এমন এক প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো যা এখন দ্রুত পরিশোধিত বা পুঙ্খানুপুঙ্খ সংস্কার করা প্রয়োজন।

বিক্ষোভকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য, সারা দেশজুড়ে পুলিশের এমন নজিরবিহীন দমন-পীড়ন এবং আগ্রাসী মনোভাব আন্দোলনকারী তরুণদের মাঠে নেমে আসার নতুন কারণ তৈরি করে দিয়েছে। সম্পূর্ণ একটি শান্তিপূর্ণ ও পূর্বপরিকল্পিত নাগরিক সমাবেশের ওপর পুলিশ ও প্রশাসনের এ জাতীয় মারমুখী প্রতিক্রিয়াকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ও চরম মাত্রার বলপ্রয়োগ বলেই তারা মনে করছে।

দর্শনশাস্ত্রের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আরিয়ান কাজানিয়া বলেন, বর্তমানের এই বিতর্কটি ভারতের পুরো রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর দেশটির তরুণদের সামগ্রিক অনাগ্রহ ও গভীর মোহভঙ্গেরই এক চাক্ষুষ বহিঃপ্রকাশ। তিনি এবং তার সহপাঠীরা জানান, যখন সাধারণ মানুষের সমাবেশের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় কিংবা প্রতিবাদ করলেই যখন পাইকারি হারে ধরে নিয়ে কারাগারে বা বাসে আটক করে রাখা হয়, তখন রাষ্ট্রপ্রদত্ত বাকস্বাধীনতার মৌলিক অধিকার কীভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব; তা তারা বুঝে উঠতে পারছেন না। কাজানিয়া বলেন, রাজধানীতে কী ঘটছে তা জানার জন্য সারা দেশের তরুণরা প্রতিনিয়ত সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন শহর থেকে মানুষ এই প্রতিবাদে সংহতি প্রকাশ করে যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে আমাদের পুরো ব্যবস্থাটি মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে আমাদের কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়।"

রাজপথের এই আন্দোলনের পরিধি কেবল সশরীরে মিছিল করা বা স্লোগান দেওয়া তরুণের দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আন্দোলনকারী অনেকেরই দাবি, তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, জোট বা একক কোনো ব্যানারের পরিচয়ে এখানে আসেননি; বরং কিছু গভীর ও অভিন্ন নাগরিক উদ্বেগই তাদের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধেছে।

মায়া রিবেরোর মতে, বন্ধুদের আড্ডা, নিজেদের বসার ঘরের রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাগুলোই ধীরে ধীরে সাধারণ ব্যক্তিগত হতাশা ও ব্যক্তিগত ক্ষোভকে এক বিরাট যৌথ নাগরিক পদক্ষেপে রূপান্তরিত করেছে।

দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সম্পূর্ণ অসহায় ও নিরূপায় মনে করার পর, সাম্প্রতিক এসব গণবিক্ষোভ তরুণদের মনে নতুন এক রাজনৈতিক ক্ষমতার বোধ এনে দিয়েছে। চলতি গ্রীষ্মের শুরুতে 'কাকরোচ' আন্দোলন চলাকালেই এর স্পষ্ট ছায়া দেখা গিয়েছিল, যখন বিক্ষোভকারীরা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সমস্ত ভয়-ভীতি ও সামাজিক ট্যাবু ভেঙে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে প্রকাশ্যে কটাক্ষ ও খোলামেলা ব্যঙ্গ শুরু করেছিল। নিজের ও তরুণ প্রজন্মের মানসিক পরিবর্তনের ব্যাখা দিতে গিয়ে রিবেরো জোর দিয়ে বলেন, আমার সত্যিই মনে হয় যে আমরা আজ এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছি যেখানে দীর্ঘদিন ধরে মোহভঙ্গ হতে হতে আমরা নিজেদের সবকিছুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সহনশীল ও প্রতিরোধী করে তুলেছি।

তবে নরেন্দ্র মোদির মতো দীর্ঘ শিকড় পোড়া এক প্রবল প্রতাপশালী রাজনৈতিক নেতাকে শুধুই রাজপথের আন্দোলন দিয়ে কাবু করা একেবারেই সহজ কাজ নয়। তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে নিজের একক আধিপত্য ধরে রেখেছেন। তার হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দেশের ইতিহাসে এক শক্তিশালী নির্বাচনী কলকব্জা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বিরোধী দলগুলোও বহু চেষ্টা করে সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আগের জমানো ক্ষোভগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে জাতীয় পর্যায়ের সুসংগঠিত রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ দিতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।

একইভাবে, এই তরুণদের রাজপথের ক্ষোভও এখনো পর্যন্ত কোনো একক, সুসংগঠিত বা বিকল্প রাজনৈতিক রূপ লাভ করতে পারেনি। তবে অনেক আন্দোলনকারীর কাছেই সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ও কর্তৃত্ববাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার সামর্থ্যটুকু বা একটি গণতান্ত্রিক পরিসর তৈরি করাই এখন নিজেদের মধ্যে এক বিরাট অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই লড়াই তাদের ব্যক্তিগত জীবনে এনে দিয়েছে চরম মূল্য ও পারিবারিক চরম অশান্তি।

কশিশ রাওয়াত জানান, রাজপথের রাজনীতি এখন তার নিজের ঘরের ভেতরেই প্রতিনিয়ত চরম মানসিক উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, তার পিতামাতার দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত মূলত মোদী সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল বিভিন্ন ভারতীয় টেলিভিশন খবরের চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে ভীষণভাবে প্রভাবিত। রাজনৈতিক চিন্তার এই বিশাল অমিল ও মতপার্থক্যের কারণে রাওয়াতের সাথে তাঁর নিজের পরিবারের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে, এমনকি অনেক সময় স্বজনদের সাথে তার সব ধরনের কথাবার্তাই সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। নিজের ঘরের এই তিক্ত বাস্তবতার কথা তুলে ধরে রাওয়াত আক্ষেপের সাথে বলেন, আমি এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে তাদের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা যায় বা বিষয়গুলো একটু বোঝানো যায়, কিন্তু সত্যি বলতে এ পর্যন্ত আমি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি।

অপরদিকে মায়া রিবেরোর কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ভারতের ক্ষুব্ধ তরুণ সমাজ কি তাদের এই তাৎক্ষণিক ক্ষোভকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ে পরিণত করতে পারবে কি না। রিবেরোর মতে, সব বাধা সত্ত্বেও এসব বিক্ষোভ তরুণদের অন্তত এটি উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে যে রাষ্ট্র সংস্কারে তাদের কণ্ঠস্বর ফেলে দেওয়ার মতো নয় এবং তাদের কথা আজও গুরুত্ব বহন করে। নিজের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে রিবেরো বলেন, আমার মনে হয় যে দীর্ঘদিন পর... খুব দীর্ঘ একটা সময়ের পর; গণতন্ত্র আদতে দেশের জন্য কী করতে পারে এবং এর আসল শক্তি কতটুকু, সে সম্পর্কে আমি এক নতুন বিশ্বাস ও আস্থা ফেরত পেয়েছি।

বিষয় : মোদি

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬


নয়াদিল্লিতে ভোটাধিকার রক্ষায় রাজপথে তরুণেরা, কঠোর অবস্থানে পুলিশ

প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়েই গত শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৌঁছান ২২ বছর বয়সী কশিশ রাওয়াত। অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করা এই তরুণী রাজধানীতে গিয়ে দেখেন, শহরের চেনা চিত্র বদলে গেছে।

রাস্তায় রাস্তায় বসানো হয়েছে ধাতব ব্যারিকেড। আন্দোলনরত তরুণদের ছত্রভঙ্গ করতে কঠোর অবস্থান নেয় পুলিশ। কাউকে লাঠিপেটা করা হয়, কাউকে টেনেহিঁচড়ে পুলিশের বাসে তোলা হয়। আবার অনেককে ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়।

পুলিশের এসব কর্মকাণ্ডের দৃশ্য আন্দোলনকারীরা মুঠোফোনে ধারণ করেন। পরে সেসব ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন ভারতের তরুণেরা। তাঁদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দলকে রাজনৈতিক সুবিধা দিতেই পরিকল্পিতভাবে বিরোধীদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

আন্দোলনকারীদের জমায়েত ঠেকাতে পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ নেয়। তবে এসব বাধা উপেক্ষা করেই রাজপথে অবস্থান চালিয়ে যান কশিশ রাওয়াত ও তাঁর সহযোগীরা।

সারাদিন পুলিশের নজরদারি ও ধাওয়া এড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যান তাঁরা। নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে কশিশ বলেন, “আমরা কোথাও যাচ্ছি না। আমরা আবার আসব এবং আমাদের কথা বিশ্বকে শোনাব।”

চলতি মাসের শুরুর দিকে ভারতের এই আলোচিত 'ককরোচ' বা 'তেলাপোকা' তরুণ আন্দোলনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। মূলত গত বছর থেকে শুরু হওয়া বিতর্কিত ভোটার তালিকা পর্যালোচনার পর এ পর্যন্ত ১৩ কোটি বা ১৩০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এর ফলে কোটি কোটি নাগরিক পুরোপুরি ভোটাধিকার হারানোর চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন। তীব্র ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভকারীরা এখন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি তুলেছেন।

অবশ্য নির্বাচন কমিশনের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা বলছে, ভুয়া ও অযোগ্য ভোটারদের ছাঁটাই করে তালিকা নির্ভুল করার উদ্দেশ্যেই এই জাতীয় পর্যালোচনা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে, এসব বিক্ষোভ এবং তরুণদের রাজপথের আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তার দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অনেক শীর্ষ নেতা এসব আন্দোলনকারীদের সরাসরি 'অরাজকতাবাদী' বলে আখ্যা দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, কোনো ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়াই ক্ষমতাসীন দলের নেতারা দাবি করছেন যে, রাজপথের এই তরুণেরা নাকি কোনো বিদেশি শক্তির উসকানিতে কাজ করছে।

এই সংঘাত এখন সরাসরি আঘাত হেনেছে ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি, নাগরিকের ভোটাধিকারের ওপর। সেই সাথে এটি এখন এক বিশাল পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে পুরো তরুণ প্রজন্মকে। নরেন্দ্র মোদী বিগত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের ক্ষমতায় রয়েছেন। এই দীর্ঘ শাসনামলে যে প্রজন্ম বড় হয়ে উঠেছে, তাদের মনস্তাপ ও চরম হতাশা এখন হিন্দুত্ববাদী মোদী সরকারের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কোনো দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর গণসঙ্কটে রূপ নিতে পারবে কি না; সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে নিজের মনোভাব প্রকাশ করতে গিয়ে রাওয়াত নির্দ্বিধায় বলেন, আমি তাঁকে কোনো সর্বশক্তিমান ঈশ্বর মনে করি না। আমি তাকে শুধুই একজন প্রতিনিধি হিসেবে দেখি, যাকে আমরা নিজেরাই নির্বাচিত করেছি। তাই এই লোকটাকে প্রশ্ন করতে গিয়ে কেন আমাদের এত ভয় পাওয়ার দরকার, তা আমার মাথায় আসে না।

নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ ১২ বছরের শাসনামলে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। সরকারের সমালোচকদের মতে, শাসন বিভাগের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণের সব পথ সংকুচিত করা হয়েছে, ভিন্নমতকে পদ্ধতিগতভাবে দমন করা হচ্ছে এবং সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রতিনিয়ত লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় চাপ সৃষ্টির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ক সংগঠনগুলোও।

যদিও কেন্দ্রীয় সরকার এসব অভিযোগ শুরু থেকেই একবাক্যে অস্বীকার করে আসছে। তাদের বক্তব্য হলো, ভারতের গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কাঠামো সম্পূর্ণ শক্তিশালী রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেবল অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে, কোনো রাজনৈতিক ভিন্নমতের বিরুদ্ধে নয়।

তবে সাধারণ ভারতীয় তরুণদের বড় একটি অংশ আর এই সরকারি ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারছে না। তারা মনে করছে, ছোটবেলা থেকে তারা যেসব প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করতে শিখেছিল, সেগুলো আজ তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে তারা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলে মনে করছে, যেখানে সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা বা প্রশাসনিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার অর্থই নিজের মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকি ডেকে আনা। ভোটার তালিকার সাম্প্রতিক চরম বিতর্ক তরুণদের এই জমতে থাকা ক্ষোভকে যেন এক বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছে এবং পুরো এক প্রজন্মের অসন্তোষকে এনে দিয়েছে এক অভিন্ন আন্দোলনের প্রেক্ষাপট।

উল্লেখ্য, এর আগের গ্রীষ্মে তরুণেরা ব্যাপক রাজপথের আন্দোলন গড়ে তুলে নরেন্দ্র মোদীর শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল, যা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণ রাজপথের চাপের এক অভূতপূর্ব ও বিরল নজির ছিল। আর সেই সফলতার পর থেকে তরুণের এই ধারাবাহিক সংগঠিত রূপ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাম্প্রতিক তরুণ আন্দোলনের রূপরেখাকেই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেখানে জেন-জি সরাসরি পরাক্রমশালী রাজনৈতিক অভিজাতদের কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

১৯ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মায়া রিবেরো মনে করেন, ভোটার তালিকা পর্যালোচনার এই বিবাদ স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেওয়া গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে তাদের মনে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। গত শনিবার বন্ধুদের নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে রিবেরো জানান, তারা ভোটাধিকার নিবন্ধিত করেছিলেন কারণ তারা মনে করেছিলেন যে, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া কেবল একটি নাগরিক অধিকারই নয়, বরং এক বিশাল দায়িত্বও বটে। কিন্তু যেভাবে গণহারে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, তাতে নিজের ভোটাধিকার কতটুকু সুরক্ষিত, তা নিয়ে এখন তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে। রিবেরোর মতে, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে সুসংহত ও স্বচ্ছ করার এই সংগ্রাম তাই এখন তাঁদের কাছে সবচেয়ে জরুরি ও সময়োপযোগী এক লড়াই হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি তুলে ধরে রিবেরো বলেন, আমরা যখন ভোটের মতো কোনো গণতান্ত্রিক কাঠামোর কথা বলি, তখন তা অবশ্যই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটি এমন এক প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো যা এখন দ্রুত পরিশোধিত বা পুঙ্খানুপুঙ্খ সংস্কার করা প্রয়োজন।

বিক্ষোভকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য, সারা দেশজুড়ে পুলিশের এমন নজিরবিহীন দমন-পীড়ন এবং আগ্রাসী মনোভাব আন্দোলনকারী তরুণদের মাঠে নেমে আসার নতুন কারণ তৈরি করে দিয়েছে। সম্পূর্ণ একটি শান্তিপূর্ণ ও পূর্বপরিকল্পিত নাগরিক সমাবেশের ওপর পুলিশ ও প্রশাসনের এ জাতীয় মারমুখী প্রতিক্রিয়াকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ও চরম মাত্রার বলপ্রয়োগ বলেই তারা মনে করছে।

দর্শনশাস্ত্রের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আরিয়ান কাজানিয়া বলেন, বর্তমানের এই বিতর্কটি ভারতের পুরো রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর দেশটির তরুণদের সামগ্রিক অনাগ্রহ ও গভীর মোহভঙ্গেরই এক চাক্ষুষ বহিঃপ্রকাশ। তিনি এবং তার সহপাঠীরা জানান, যখন সাধারণ মানুষের সমাবেশের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় কিংবা প্রতিবাদ করলেই যখন পাইকারি হারে ধরে নিয়ে কারাগারে বা বাসে আটক করে রাখা হয়, তখন রাষ্ট্রপ্রদত্ত বাকস্বাধীনতার মৌলিক অধিকার কীভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব; তা তারা বুঝে উঠতে পারছেন না। কাজানিয়া বলেন, রাজধানীতে কী ঘটছে তা জানার জন্য সারা দেশের তরুণরা প্রতিনিয়ত সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন শহর থেকে মানুষ এই প্রতিবাদে সংহতি প্রকাশ করে যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে আমাদের পুরো ব্যবস্থাটি মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে আমাদের কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়।"

রাজপথের এই আন্দোলনের পরিধি কেবল সশরীরে মিছিল করা বা স্লোগান দেওয়া তরুণের দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আন্দোলনকারী অনেকেরই দাবি, তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, জোট বা একক কোনো ব্যানারের পরিচয়ে এখানে আসেননি; বরং কিছু গভীর ও অভিন্ন নাগরিক উদ্বেগই তাদের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধেছে।

মায়া রিবেরোর মতে, বন্ধুদের আড্ডা, নিজেদের বসার ঘরের রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাগুলোই ধীরে ধীরে সাধারণ ব্যক্তিগত হতাশা ও ব্যক্তিগত ক্ষোভকে এক বিরাট যৌথ নাগরিক পদক্ষেপে রূপান্তরিত করেছে।

দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সম্পূর্ণ অসহায় ও নিরূপায় মনে করার পর, সাম্প্রতিক এসব গণবিক্ষোভ তরুণদের মনে নতুন এক রাজনৈতিক ক্ষমতার বোধ এনে দিয়েছে। চলতি গ্রীষ্মের শুরুতে 'কাকরোচ' আন্দোলন চলাকালেই এর স্পষ্ট ছায়া দেখা গিয়েছিল, যখন বিক্ষোভকারীরা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সমস্ত ভয়-ভীতি ও সামাজিক ট্যাবু ভেঙে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে প্রকাশ্যে কটাক্ষ ও খোলামেলা ব্যঙ্গ শুরু করেছিল। নিজের ও তরুণ প্রজন্মের মানসিক পরিবর্তনের ব্যাখা দিতে গিয়ে রিবেরো জোর দিয়ে বলেন, আমার সত্যিই মনে হয় যে আমরা আজ এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছি যেখানে দীর্ঘদিন ধরে মোহভঙ্গ হতে হতে আমরা নিজেদের সবকিছুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সহনশীল ও প্রতিরোধী করে তুলেছি।

তবে নরেন্দ্র মোদির মতো দীর্ঘ শিকড় পোড়া এক প্রবল প্রতাপশালী রাজনৈতিক নেতাকে শুধুই রাজপথের আন্দোলন দিয়ে কাবু করা একেবারেই সহজ কাজ নয়। তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে নিজের একক আধিপত্য ধরে রেখেছেন। তার হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দেশের ইতিহাসে এক শক্তিশালী নির্বাচনী কলকব্জা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বিরোধী দলগুলোও বহু চেষ্টা করে সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আগের জমানো ক্ষোভগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে জাতীয় পর্যায়ের সুসংগঠিত রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ দিতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।

একইভাবে, এই তরুণদের রাজপথের ক্ষোভও এখনো পর্যন্ত কোনো একক, সুসংগঠিত বা বিকল্প রাজনৈতিক রূপ লাভ করতে পারেনি। তবে অনেক আন্দোলনকারীর কাছেই সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ও কর্তৃত্ববাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার সামর্থ্যটুকু বা একটি গণতান্ত্রিক পরিসর তৈরি করাই এখন নিজেদের মধ্যে এক বিরাট অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই লড়াই তাদের ব্যক্তিগত জীবনে এনে দিয়েছে চরম মূল্য ও পারিবারিক চরম অশান্তি।

কশিশ রাওয়াত জানান, রাজপথের রাজনীতি এখন তার নিজের ঘরের ভেতরেই প্রতিনিয়ত চরম মানসিক উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, তার পিতামাতার দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত মূলত মোদী সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল বিভিন্ন ভারতীয় টেলিভিশন খবরের চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে ভীষণভাবে প্রভাবিত। রাজনৈতিক চিন্তার এই বিশাল অমিল ও মতপার্থক্যের কারণে রাওয়াতের সাথে তাঁর নিজের পরিবারের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে, এমনকি অনেক সময় স্বজনদের সাথে তার সব ধরনের কথাবার্তাই সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। নিজের ঘরের এই তিক্ত বাস্তবতার কথা তুলে ধরে রাওয়াত আক্ষেপের সাথে বলেন, আমি এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে তাদের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা যায় বা বিষয়গুলো একটু বোঝানো যায়, কিন্তু সত্যি বলতে এ পর্যন্ত আমি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি।

অপরদিকে মায়া রিবেরোর কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ভারতের ক্ষুব্ধ তরুণ সমাজ কি তাদের এই তাৎক্ষণিক ক্ষোভকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ে পরিণত করতে পারবে কি না। রিবেরোর মতে, সব বাধা সত্ত্বেও এসব বিক্ষোভ তরুণদের অন্তত এটি উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে যে রাষ্ট্র সংস্কারে তাদের কণ্ঠস্বর ফেলে দেওয়ার মতো নয় এবং তাদের কথা আজও গুরুত্ব বহন করে। নিজের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে রিবেরো বলেন, আমার মনে হয় যে দীর্ঘদিন পর... খুব দীর্ঘ একটা সময়ের পর; গণতন্ত্র আদতে দেশের জন্য কী করতে পারে এবং এর আসল শক্তি কতটুকু, সে সম্পর্কে আমি এক নতুন বিশ্বাস ও আস্থা ফেরত পেয়েছি।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream