শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যয়ে সহযোগিতার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ‘স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার ইনিশিয়েটিভ’ (এসডব্লিউআই) নামে নতুন একটি উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়েছে। উদ্যোগটির প্রথম ধাপে ১০ শিক্ষার্থীকে চার মাসের আবাসন বৃত্তি দেওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের হাতে সহায়তা তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসনিক) অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম ও উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমিন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক পাঠ করা হয়। এরপর একে একে বক্তারা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
এরপর অনুষ্ঠানে চাকসুর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) আইয়ুবুর রহমান তওফিক বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পরও তাঁদের সেই সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। আজ ১০ জন শিক্ষার্থীকে আবাসন বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। আমার মনে হয়, সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থীরাই এখানে নির্বাচিত হয়েছেন।”
সংগঠনের উপদেষ্টা, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান হলের প্রভোস্ট এ. জি. এম. নিয়াজ উদ্দিন বলেন, “বর্তমানে আবাসিক শিক্ষক ও হল প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হই। কিন্তু প্রশাসনিক বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সব সময় তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা সম্ভব হয় না। তাই প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে বিভিন্নভাবে অনুদান ও সহযোগিতা সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. কামরুল হোসেন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সব শিক্ষার্থীকে আবাসন সুবিধা ও আর্থিক সহায়তার আওতায় আনা সব সময় সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যদি এ ধরনের উদ্যোগ নেয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের আবাসনসহ অন্যান্য সমস্যা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক ও লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক আমির মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, “সরকারি পর্যায়ে নতুন আবাসন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কিন্তু বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা গেলে তুলনামূলক দ্রুত আবাসন সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী এক বছরের মধ্যেও কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্ভব বলে আমি মনে করি।”
এরপর আমন্ত্রিত অতিথিদের বরণ করে নেওয়া হয়। উপাচার্যের হাতে ক্যাকটাস গাছ তুলে দেওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় এই পর্ব। পরে একে একে অন্যান্য অতিথিদের হাতেও ক্যাকটাস গাছ তুলে দেওয়া হয়।
ছাত্র ছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা কার্যালয়ের পরিচালক ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “শুরু থেকেই এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমি গর্বিত। আগামী দিনেও সংগঠনটির যেকোনো ভালো উদ্যোগে আমরা পাশে থাকব। আমার আশা, অচিরেই এই সংগঠনের মাধ্যমে ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করা সম্ভব হবে। আমি সংগঠনটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।”
অনুষ্ঠানের বিশেষ অথিতি উপ-উপাচার্য (প্রশাসনিক) অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের। তাই তাঁদের আবাসন সমস্যার বিষয়টি আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একদিনে আবাসন সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের যারা দাতা ও সামর্থ্যবান ব্যক্তি আছেন, তাঁদের এগিয়ে আসার প্রত্যাশা করছি। একই সঙ্গে আশা করি, ভবিষ্যতে এই সংগঠনের এই উদ্যোগের আওতা আরও বাড়াবেন এবং বৃত্তির সংখ্যা বৃদ্ধি করবেন।”
অনুষ্ঠানের বিশেষ অথিতি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমিন বলেন, “স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার ইনিশিয়েটিভ আসলে বিপদের বন্ধু হয়ে কাজ করছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ, দলগত উদ্যোগ, শ্রেণিভিত্তিক উদ্যোগ এবং শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ—এসবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা যেভাবে এগিয়ে এসেছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়।”
অনুষ্ঠানে সংগঠনের শুভযাত্রা ঘোষণা করে প্রধান অতিথি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান বলেন, “আজ স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার ইনিশিয়েটিভের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। যারা এই উদ্যোগের উদ্যোক্তা, তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি আবারও এই উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সাধুবাদ জানাই। আশা করি, সামনে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত ও বিকশিত হবে।”
তিনি আরও বলেন, “হয়তো আজ ১০ জন শিক্ষার্থীকে দিয়ে বৃত্তি কার্যক্রম শুরু হচ্ছে, কিন্তু একদিন এই উদ্যোগের মাধ্যমে এক হাজার শিক্ষার্থীও উপকৃত হতে পারে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশোনার মূলধারায় থাকতে পারে এবং আর্থিক সমস্যার কারণে তাঁদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত না হয়।”
অনুষ্ঠানে পরে সংগঠনের কার্যক্রম ও পরিকল্পনা নিয়ে একটি স্লাইড উপস্থাপন করা হয়। এরপর প্রথম ধাপে নির্বাচিত ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ১০ শিক্ষার্থীর হাতে আবাসন বৃত্তির অর্থ তুলে দেন উপাচার্যসহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা।
উদ্যোক্তারা জানান, সংগঠনটি চারটি প্রধান প্রকল্প নিয়ে কাজ করবে—আবাসন, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, মেডিকেল সেবা ও প্রাণিসেবা। আবাসন প্রকল্পে প্রথম ধাপে ২০৬টি আবেদনের মধ্য থেকে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ১০ শিক্ষার্থীকে নির্বাচন করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীরা যাতে নিজেদের আবাসনের ব্যবস্থা নিজেরাই করতে পারেন, সে ধরনের সহযোগিতার পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে সিভি লেখা, চাকরির আবেদন, এআই টুলের ব্যবহার ও মৌলিক কম্পিউটার দক্ষতার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিসিএস, আইইএলটিএস ও উচ্চশিক্ষা বিষয়ে সেমিনার আয়োজন করা হবে। মেডিকেল সেবা প্রকল্পে প্রতি মাসে বিনা মূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প এবং আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাণিসেবা প্রকল্পে ক্যাম্পাসের কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর খাবার, পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা করা হবে।
উদ্যোক্তারা বলেন, ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছে। এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন তাঁরা।
মতামত