‘সুবর্ণ সময় এখন দোলার চলছে। নাটক, সিনেমার প্লেব্যাক থেকে শুরু করে অডিও-ভিডিওর জন্য একক, দ্বৈত যে ধরনের গানই গাইছেন, সবই জয় করে নিচ্ছে শ্রোতা হৃদয়।’ না, এই মন্তব্য সংগীতপ্রেমীদের, যারা দোলা রহমানের এই সময়ের গানগুলো শুনে এভাবেই নিজেদের ভালো লাগা ও মতপ্রকাশ করে চলেছেন। তাদের কারও মতে, দোলা শুধু ভার্সেটাইল কণ্ঠশিল্পী নন, একই সঙ্গে দুর্দান্ত একজন পারফরমার। যিনি গান ও নাচের মেলবন্ধনে দর্শক-শ্রোতাকে সম্মোহিত করে রাখার জাদু জানেন। অবশ্য দর্শক-শ্রোতার এই কথা যে একেবারে ভুল নয়, আরও একবার তার প্রমাণ মিলেছে গানচিল মিউজিকের ব্যানারে সদ্য প্রকাশিত ‘কিসমত’ গানে। যার গায়কি এবং ড্যান্স পারফরম্যান্স দিন দিন বাড়িয়ে চলেছে ভক্ত-শ্রোতার সংখ্যা। দোলা।
তাই দোলার কাছে শুরুতেই জানতে চাওয়া হয়েছিল, প্রিয় দুটি বিষয়– গান ও নাচের পারফরম্যান্স তুলে ধরার প্রস্তাব পাওয়ায় তাঁর ভাবনাটা কী ছিল? এর উত্তরে দোলা বলেন, সুরকার আদিবের কাছে ‘কিসমত’ গানের প্রস্তাব পাওয়ার পর থেকে দারুণ উচ্ছ্বসিত ছিলাম। কারণ ‘কিসমত’ গানের সূত্রে প্রিয় গীতিকবি আসিফ ইকবালের লেখা ও আদিবের সুর-সংগীতে গাইতে পারা, তানিম রহমান অংশুর পরিচালনায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে পারফরম্যান্সের সুযোগ, বহুদিন পর নিলয় আহমেদের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গানচিলের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারা– সব মিলিয়ে এটি আমার কাঙ্ক্ষিত আয়োজন বলে মনে হয়েছিল। তাই ‘কিসমত’ গানের রেকর্ডিং থেকে শুরু মিউজিক ভিডিওর মহড়ায় অংশ নেওয়া, পরিকল্পনামাফিক শুটিং শেষ করে গানের প্রকাশনা পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তই ছিল রোমাঞ্চকর।
‘আমি দোলা’ গানের পর গান ও নাচের এমন সমন্বিত আয়োজন কয়েক বছরে আর হয়ে উঠেনি। যদিও ‘আমি দোলা’ গানের ভিডিও নির্মাণ দেশের বাইরে হয়েছিল, সেদিক থেকে ‘কিসমত’ পুরোপুরি আমাদের নিজেদের কাজ। যেখানে সময়ের চাহিদা পূরণে যার যার জায়গা থেকে সবাই তাদের সেরাটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।’ দোলার এ থেকে বোঝা গেল, যে সুরে চলে তাঁর স্বপ্নের বুনন, ‘কিসমত’ তেমনই একটি আয়োজন।
‘কিসমত’ গানটি নিয়ে দোলা যেমন একদিকে উচ্ছ্বসিত, তেমনি দর্শক-শ্রোতার মুখের হাসি প্রসারিত হয়েছে এই আয়োজন নিয়ে। গানের কমেন্ট বক্সে চোখ রাখতেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক সময়ে দোলার প্রতিটি আয়োজন শ্রোতা হৃদয় আন্দোলিত করছে এবং তাকে নিয়ে গেছে শীর্ষ তারকাদের কাতারে। তারপরও অবাক হতে হয় নিজের সম্পর্কে দোলার মন্তব্য নিয়ে। কারণ নিজের বিষয়ে ‘শীর্ষ তারকা’, ‘তুমুল জনপ্রিয় শিল্পী’ এই বিশেষণগুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন।
তিনি বলেন, ‘১৭ বছর ধরে গান করছি ঠিকই, তবু এই সময়কে আমি সংগীত সফরের শুরু বলতে চাই। কেননা, আমার আরও অনেক কিছু দেওয়ার বাকি। তাই গানের ভুবনে পাড়ি দিতে হবে অনেকটা পথ।’
এ কথার পাশাপাশি দোলা এও স্বীকার করেছেন, জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে যে কোনো কাজ করার ইচ্ছা তাঁর নেই; বরং যে সৃষ্টিতে চ্যালেঞ্জ আছে, আছে নতুন ও ভিন্ন রকম আয়োজন তুলে ধরার সুযোগ– সেই কাজগুলো বেছে নিতে চান। আর সেটি দোলা যে পারবেন, তার খানিকটা আভাস পাওয়া যায় এই শিল্পীর পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকালে। যেখানে আমরা দেখি, শৈশবেই সাত সুরের ভালোবাসায় বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছিলেন দোলা। সেই সূত্রে তাঁর ভাগ্যলিপি শৈশবেই রচিত হয়েছে– যখন তিনি নানি ও খালার সংগীতার্চচার মুহূর্তগুলোয় ছিলেন কেবলই শ্রোতা।
দোলার বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে মনে রোপিত হয়ে গিয়েছিল সংগীতের বীজ। তাই গানের সঙ্গে যে একদিন তাঁর সখ্য গড়ে উঠবে– তা অনুমেয় ছিল। বাস্তবেও সেটিই হয়েছে। বড় ভাই সংগীতায়োজক অদিত রহমানকে গাইড হিসেবে পাওয়ায় স্বপ্ন পূরণের পথও খানিকটা মসৃণ হয়ে উঠেছিল। বাবা আশির দশকের আলোচিত চলচ্চিত্র প্রযোজক সাইদুর রহমান মানিকও একজন সংগীত পূজারি। তাই সংগীত বলয়ের মাঝেই দোলার বেড়ে ওঠা এবং এক পর্যায়ে সৃষ্টিচর নেশায় ওঠা।
এরপর একে একে ভিন্ন ধাঁচের গান গেয়ে শ্রোতা মনোযোগ কেড়ে নিতেও সময় লাগেনি। এভাবেই ‘বরবাদ’ সিনেমায় গাওয়া ‘চাঁদমামা’ কিংবা তারও আগে প্রকাশিত ‘মুক্তি’ সিনেমার রয়েছে ‘আগুনের গান গাই’, ‘অমানুষ’ ওয়েব ছবির ‘রাধা’, ‘মিশন এক্সট্রিম’ সিনেমার ‘জানি তুমি ছিলে’; ‘টাকাটা কই’ নাটকের ‘মন করলা তুমি চুরি’সহ একক গান ‘জোছনা’, ‘আমি দোলা’, পাপনের সঙ্গে গাওয়া দ্বৈত গান ‘মন দরিয়া’, মাহতিম সাকিবের সঙ্গে গাওয়া ‘অনুভবে’সহ আরও বেশ কিছু গান তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে সংগীতপ্রেমীদের মাঝে।
তবে অন্যান্য ভার্সেটাইল শিল্পীর সঙ্গে দোলার পার্থক্য এখানেই যে, গান এবং নাচ– এ দুইয়ের সমন্বয়ে তাঁর অভিনব পারফরম্যান্স তুলে ধরেন তিনি। যার সর্বশেষ উদাহরণ নিলয় আহমেদের সঙ্গে গাওয়া তাঁর দ্বৈত গান ‘কিসমত’। বিশ্বাস করা কঠিন, দিনভর যাঁকে আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়, নানাজনের নানা আইনি সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত থাকতে, সেই দোলা আবার আইন পেশার খোলস ছেড়ে যখন-তখন উঠে পড়ছেন গানের মঞ্চে। প্রমাণ করছেন, দোলা রহমান নামে মানুষটি একের ভেতর অনেক।
মতামত