ফরিদপুরের সালথায় নিখোঁজের আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেলেনি ১৩ বছর বয়সী ইমরান খানের। ছেলে জীবিত থাকুক কিংবা মৃত—অন্তত তাঁর সন্ধান চান বাবা-মা। সন্তানের অপেক্ষায় দিন কাটছে তাঁদের।
ইমরান সালথা উপজেলার ভাওয়াল ইউনিয়নের ইউসুফদিয়া ভদ্রপাড়া গ্রামের চুন্নু খানের বড় ছেলে। সংসারের অভাবের কারণে মাঝেমধ্যে বাবার ব্যাটারিচালিত ভ্যান নিয়ে বের হতো সে। গত ১৪ জুন প্রতিবেশী শামীম মোল্যা (২১) ধান ভাঙানোর কথা বলে চুন্নুর কাছ থেকে ভ্যানটি নিয়ে বের হন। ওই ভ্যানে ইমরানও ছিল। এরপর থেকে ইমরানের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজের তিন দিন পর ১৭ জুন বিকেলে পাশের মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কুমারপট্টি গ্রামে শামীমের আত্মীয় এলিনা বেগমের বাড়ি থেকে ইমরানের ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে একটি পাটখেত থেকে ইমরানের ব্যবহৃত জুতা ও একটি কোদাল উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন জামিনে রয়েছেন। দুজন বর্তমানে কারাগারে আছেন। তবে মামলার প্রধান অভিযুক্ত শামীম মোল্যা এখনো পলাতক।
বৃহস্পতিবার ইমরানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছে পরিবারটি। সন্তানের ছবি হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইমরানের মা-বাবা। তাঁরা জানান, আড়াই মাস ধরে ছেলের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও কোনো তথ্য পাননি।
ইমরানের বাবা চুন্নু খান বলেন, ‘আমার ছেলে বেঁচে আছে না মইরা গেছে, কিছুই জানি না। আড়াই মাস ধইরা খুঁইজ্যা খুঁইজ্যা আর পারতেছি না। আমার ছেলের হাড্ডি-গুড্ডি হইলেও খুঁইজ্যা দ্যান। অন্তত জানি, আমার ছেলে কোথায় আছে।’
ইমরানের মা হাজেরা বেগম বলেন, ‘ভ্যানটা পাওয়া গেছে, কিন্তু আমার ছেলেটারে পাই নাই। ফরিদপুর হাসপাতাল, মুকসুদপুর হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেছি। কোথাও পাইনি।’
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ১৪ জুন বেলা ১১টার দিকে বাজারে গিয়ে ইমরানকে না পেয়ে তাঁরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে প্রতিবেশী শামীম মোল্যার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ইমরান কোথায় জানতে চাইলে শামীম বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের কথা বলেছেন বলে অভিযোগ পরিবারের।
সালথা থানার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ১৭ জুন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে থানায় মামলা করেন ইমরানের বাবা। ওই দিনই মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কুমারপট্টি গ্রাম থেকে এনায়েত শেখের স্ত্রী এলিনা বেগমকে (৩২) আটক করা হয়। তাঁর বাড়ি থেকে ইমরানের ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, ওই দিনই শামীম মোল্যা পালিয়ে যান। একই দিন তাঁর বাবা টুকু মোল্যা (৬৫) ও স্ত্রী সাথী বেগমকে (২১) আটক করা হয়। পরে তদন্তকালে মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মুরুটিয়া গ্রাম থেকে রাসেল মাতুব্বর (২১) নামের আরও একজনকে আটক করা হয়। পরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবলুর রহমান খান বলেন, ‘মামলাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কয়েকজন জামিনে আছেন, দুজন কারাগারে রয়েছেন। মামলার প্রধান অভিযুক্ত শামীম পলাতক। তাঁকে গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। শামীমকে গ্রেপ্তার করতে পারলে ঘটনার জট খুলবে বলে আশা করছি।’
আড়াই মাস ধরে ছেলের অপেক্ষায় থাকা চুন্নু খান ও হাজেরা বেগমের এখন একটাই চাওয়া—ইমরান জীবিত থাকলে তাঁকে ফিরে পেতে চান তাঁরা। আর যদি কোনো অঘটন ঘটে থাকে, তাহলে অন্তত সন্তানের সন্ধান চান এই অসহায় বাবা-মা।
মতামত