মৌলভীবাজারের বড়লেখায় গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার মুন্নিকে নির্যাতন করে হত্যার পর তাঁর মরদেহ বাথরুমের কাঠের বীমের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার। পরিবারের দাবি,ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে একটি প্রভাবশালী মহল ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং তাদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন মুন্নির পরিবারের সদস্যরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন তাঁর বাবা হাজী মকবুল আলী ও মা রেনু বেগম। পরিবারের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মুন্নির খালাতো ভাই মাছুম আহমদ।
সংবাদ সম্মেলনে মুন্নির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত,মামলা গ্রহণ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে পরিবার জানায়,২০২৩ সালে বড়লেখা উপজেলার মুড়িরগুল গ্রামের সৌদি আরবপ্রবাসী মামুনুর রশিদ লাভলুর সঙ্গে পারিবারিকভাবে মরিয়ম আক্তার মুন্নির বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা তাঁকে গালিগালাজসহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ করা হয়। এসব বিষয় মুন্নি নিয়মিত তাঁর বাবা-মা ও স্বজনদের জানাতেন।
দাম্পত্য জীবনে তাঁদের এক বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মুন্নি নির্যাতন সহ্য করেই সংসার করছিলেন বলে পরিবারের দাবি। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ,সম্প্রতি মুন্নির ননদ, ভাসুর,জা ও শাশুড়ি তাঁর বাবার বাড়ি থেকে পাঁচ লাখ টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। স্বামীর জন্য সৌদি আরবে গাড়ি কেনার কথা বলে ওই টাকা চাওয়া হয় বলে দাবি পরিবারের। পরে একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হলেও নির্যাতন ও চাপ বন্ধ হয়নি। বরং ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য আরও টাকা এনে দেওয়ার চাপ দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়,একপর্যায়ে মুন্নি তাঁর বাবা-মাকে জানান,শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন সদস্য তাঁকে যেকোনো সময় হত্যা করতে পারেন। গত ২১ আগস্ট তাঁদের সঙ্গে বিরোধের একপর্যায়ে মুন্নির ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলে পরিবারের দাবি। এ সময় তিনি ভিডিও ও খুদে বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি বাবা-মাকে জানান।
খবর পেয়ে মুন্নির বাবা স্থানীয় কয়েকজন মুরব্বির সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি সমাধানের অনুরোধ করেন। পরে একজন মুরব্বি ফোন করে বিষয়টি সমাধান হয়েছে বলে তাঁকে জানান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি পরিচয়ে একজন ব্যক্তি মুন্নির বাবাকে ফোন করে শ্বশুরবাড়িতে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি বাথরুমের কাঠের বীমের সঙ্গে মুন্নির মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। বাথরুমের দরজাও খোলা ছিল। উপস্থিত লোকজন তাঁকে জানান, মুন্নি আত্মহত্যা করেছেন।
তবে পরিবারের দাবি,মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও মুন্নি বাবা-মাকে নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন। তাই হঠাৎ তাঁর আত্মহত্যার বিষয়টি তাদের কাছে সন্দেহজনক বলে মনে হচ্ছে। মরদেহ নামানোর পর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে বলেও দাবি করেন পরিবারের সদস্যরা। এসব আঘাতের ছবি ও ভিডিও তাঁদের কাছে রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
পরিবারের অভিযোগ, মুন্নির মোবাইল ফোন এখনো উদ্ধার হয়নি। ওই ফোনে নির্যাতনের ভিডিও,খুদে বার্তা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। ফোনটি উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সহায়ক হবে বলে তারা মনে করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, মুন্নির মরদেহ থানায় নেওয়ার পর কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি ময়নাতদন্ত না করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে পরিবারের দাবির পর শেষ পর্যন্ত ময়নাতদন্ত করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন যাতে কোনো ধরনের প্রভাবে প্রভাবিত না হয়,তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
একই সঙ্গে সুরতহাল প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও, মুন্নির মোবাইল ফোন,ভিডিও,খুদে বার্তা এবং কলের তথ্যসহ সব ধরনের আলামত সংরক্ষণ ও ফরেনসিক পরীক্ষার দাবি জানানো হয়।
মুন্নির বাবা-মা বলেন,ঘটনার পর থেকে তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ন্যায়বিচারের আশায় বিভিন্নজনের কাছে যাচ্ছেন তাঁরা। মুন্নির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান পরিবারের সদস্যরা।
এ বিষয়ে বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান খান শনিবার বিকেলে মুঠোফোনে বলেন, লাশ উদ্ধারের পর একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। গৃহবধূর মৃত্যুর আলামত দেখে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতামত