১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের ঠিক পরদিন কলকাতার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত স্মারক সভায় উপস্থিত হয়ে গভীর ক্ষোভ ও বিষাদ প্রকাশ করেছিলেন কবির জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী সব্যসাচী এবং ছোট পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী। ঢাকা থেকে প্রয়াণের খবর পেয়ে তড়িঘড়ি রওনা দিয়েও তারা কবিকে শেষ দেখা দেখতে পাননি। কবির দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পৌঁছান।
সেদিন রবীন্দ্র সদনের সভায় বিষণ্ণ হৃদয়ে কাজী সব্যসাচী বারবার বলছিলেন, "মা রইলেন চুরুলিয়ায় আর বাবা রইলেন ঢাকায়। এ আক্ষেপ সারাজীবন থাকবে। ওরা আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই শেষ দেখা দেখতে পেতাম। দুপুরের প্লেনে আমাদের যাওয়ার খবর জানানোর পরও কীসের এত তাড়াহুড়ো ছিল?"
বর্ষীয়ান নজরুল গবেষক বাঁধন সেনগুপ্তের মতে, কবির মরদেহ চুরুলিয়ার জন্মভিটেয় স্ত্রী প্রমীলা দেবীর কবরের পাশে সমাহিত করার ইচ্ছা ছিল তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের। সঙ্গীতশিল্পী সোনালি কাজীও স্মরণ করেন যে, ১৯৬২ সালে প্রমীলা দেবী মৃত্যুর আগে বারবার বলে গিয়েছিলেন, তাঁকে যেন চুরুলিয়াতে দাফন করা হয় কারণ নজরুলও শেষ পর্যন্ত সেখানেই যাবেন। তবে ভারতের চুরুলিয়ায় মরদেহ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তৎকালীন ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে এবং তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সম্মতিতে কবিকে যখন সাময়িকভাবে ঢাকায় আনা হয়েছিল, তখন কেউ ভাবেনি কবি আর কখনো ভারতে ফিরবেন না। কবির প্রয়াণের পর তাঁকেই স্বাধীন বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সরকার নিজেই নিয়েছিল।
যদিও নজরুলকে আজও ভারত ও বাংলাদেশের মৈত্রীর অনন্য প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে প্রয়াণের পরপরই মরদেহ দাফন ও শেষ দেখার তাড়াহুড়ো কেন্দ্রিক সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাপ্রবাহ দুই দেশের অনুরাগী ও কবিপরিবারের মাঝে গভীর এক আক্ষেপের জন্ম দিয়েছিল।
সুত্র: বিবিসি
মতামত