নদী-খালবেষ্টিত বরিশাল নগরী একসময় পরিচিত ছিল ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ নামে। সেই নগরীর মাটিই এখন ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বরিশাল শহরের ভূমি প্রতিবছর গড়ে ১ দশমিক ৬৬ মিলিমিটার করে দেবে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও এ হার আরও বেশি।
গবেষকদের আশঙ্কা, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বন্যা-জলাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রভাবে নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) ও জার্মানির ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর জিওসাইন্স অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেসের (বিজিআর) যৌথ গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। জার্মান উন্নয়ন সহযোগিতার আওতায় পরিচালিত এ গবেষণায় অর্থায়ন করেছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।
২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত স্যাটেলাইট তথ্য, ভূগর্ভস্থ মাটির নমুনা এবং বিভিন্ন স্থাপনার উল্লম্ব গতিবিধি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বরিশালের ভূমির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন।
গবেষণায় কোনো কোনো বছরে ভূমি দেবে যাওয়ার হার ২৪ দশমিক ১৭ মিলিমিটার পর্যন্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বিপরীতে বছরে গড়ে ৫ দশমিক ৬৩ মিলিমিটার ভূমি উঁচু হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে গবেষকদের মতে, এই উঁচু হওয়ার বিষয়টি প্রাকৃতিক পরিবর্তন নয়; নিচু এলাকা ভরাট ও মাটি ফেলার মতো মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে এমনটি হয়েছে।
গবেষণার সময় নগরীর বৌদ্ধপাড়া, বিএম কলেজ, বটতলা ও করিম কুটির এলাকায় কয়েকটি ভবনের অস্বাভাবিক উল্লম্ব বিচ্যুতি শনাক্ত করা হয়। নতুন নির্মিত একটি বহুতল ভবনের সামনের দিকে হেলে পড়ার প্রমাণও পাওয়া যায়।
গবেষকদের মতে, এসব ঘটনা ভূগর্ভস্থ মাটির স্তর দুর্বল হয়ে যাওয়া ও ধসে পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। নগরীতে অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণের পাশাপাশি এসব ভবনের অতিরিক্ত চাপও ভূমির স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলছে।
বরিশালের মাটির নিচের স্তর মূলত নরম পলিমাটিতে গঠিত। ফলে ভারী স্থাপনা নির্মাণ, পর্যাপ্ত ভূতাত্ত্বিক ও প্রকৌশলগত পরীক্ষা ছাড়া ভবন নির্মাণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদে ভূমির স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভূমি দেবে যাওয়ার সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইমরান বলেন, নিরাপদ পানি সরবরাহের জন্য এখন আগের তুলনায় অনেক গভীরে পাইপ বসাতে হচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামও বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নামছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরীতে জনসংখ্যা ও স্থাপনা বাড়ার সঙ্গে পানির চাহিদাও বাড়ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে পানি উত্তোলন চলতে থাকলে মাটির নিচের বিভিন্ন স্তরে চাপের ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে। এতে ভূমি দেবে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু ভূমি দেবে যাওয়া নয়, বরিশালের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনও বড় উদ্বেগের বিষয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে নদী-খালবেষ্টিত এই নগরের প্লাবন ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বিশুদ্ধ পানির সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পরিবেশ ফেলো মুরাদ আহম্মেদ বলেন, বরিশালের মতো নিচু ও নদীবেষ্টিত নগরীতে দীর্ঘমেয়াদি প্লাবনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এখনই পরিকল্পনা করতে হবে।
জিএসবির উপপরিচালক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প পানির উৎস ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
বরিশাল নগরীর ভূমির এই ধীর পরিবর্তন হয়তো খালি চোখে প্রতিদিন বোঝা যায় না। কিন্তু গবেষণার তথ্য বলছে, মাটির নিচে পরিবর্তন শুরু হয়েছে। নদী-খালের শহর বরিশালের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে তাই নগর উন্নয়ন, ভবন নির্মাণ ও পানি ব্যবস্থাপনায় এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার প্রয়োজন।
মতামত