ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাড়তে থাকা অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে এখন শুধু জেন–জি নয়, জেন আলফার মন জয় করতেও গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে বিজেপি। দলের নতুন জাতীয় নেতৃত্বের প্রথম বৈঠকে তরুণদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং তাদের অভিযোগ ও প্রত্যাশা শোনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিজেপির নতুন ৬৫ সদস্যের জাতীয় টিমের বৈঠকে নেতাদের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—এখন থেকে শুধু বক্তৃতা বা দলীয় নির্দেশ দেওয়ার রাজনীতি নয়, বরং তরুণদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ করতে হবে। তাদের প্রশ্ন করতে দিতে হবে, সমস্যার কথা বলতে দিতে হবে এবং সেই বক্তব্য মন দিয়ে শুনে দলীয় কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ, ওপর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগকে রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে আনার পরিকল্পনা করছে দলটি।
এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা ক্ষোভ। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা অনিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। সম্প্রতি ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-কে ঘিরে যে যুব আন্দোলন তৈরি হয়েছে, তা সেই ক্ষোভকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে বিজেপির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘও (আরএসএস) তরুণদের মধ্যে তৈরি হওয়া হতাশা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংঘের সাম্প্রতিক সমন্বয় বৈঠকে তরুণদের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে বলে জানা গেছে। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকেও নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়েছে।
তবে তরুণদের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি CJP-র মতো নতুন রাজনৈতিক শক্তির কার্যক্রম ঠেকাতেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিজেপি। বিশেষ করে CJP-র ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ১৫ আগস্ট থেকে সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন সরকারি স্কুল পরিদর্শন করে শিক্ষকসংখ্যা, অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং সরকারের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছেন।
CJP-র এই কর্মসূচি ঘিরে কয়েকটি এলাকায় বাধা ও মামলা দায়েরের ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও সংগঠনটির নেতাদের স্কুলে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে, কোথাও তাদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। মহারাষ্ট্রের লাতুরে CJP নেতা অভিজিৎ দিপকের বিরুদ্ধেও অনুমতি ছাড়া স্কুলে প্রবেশ এবং শিক্ষকদের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে।
বিজেপির একাংশ মনে করছে, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংলাপ জরুরি হলেও CJP-কে রাজনৈতিকভাবে জায়গা করে দেওয়া ঠেকানোও প্রয়োজন। তাদের অভিযোগ, সংগঠনটির কিছু কর্মসূচি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ফলে বিজেপির কৌশলে একদিকে তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা—দুই দিকই গুরুত্ব পাচ্ছে।
এদিকে বিরোধী কংগ্রেসও তরুণদের অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ‘ছাত্র কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বিজেপির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। পুনেতে সাম্প্রতিক এক সমাবেশেও বিপুলসংখ্যক তরুণের উপস্থিতি দেখা গেছে।
এর আগে দিল্লির যন্তর মন্তরে CJP-র বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে আহত ১৯ বছর বয়সী সাহিল লোচাবের অভিযোগ নিয়ে রাহুল গান্ধী সরাসরি পুলিশের বিরুদ্ধে এফআইআর করার দাবিতে থানার সামনে অবস্থান নেন। কয়েক ঘণ্টার অবস্থানের পর পুলিশ এফআইআর গ্রহণ করে। রাহুল এই ঘটনাকে প্রতিবাদের জয় হিসেবে তুলে ধরেন।
বিজেপির নেতারা অবশ্য রাহুলের এমন প্রতিবাদকে ‘নৈরাজ্য সৃষ্টি’র চেষ্টা হিসেবে সমালোচনা করেছেন। কিন্তু রাহুলের কর্মসূচি থামেনি। বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের ছাত্র ও যুব কর্মসূচিতে জেন–জি এবং জেন আলফার অংশগ্রহণ বিজেপির জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আজকের ১৬–১৭ বছর বয়সী অনেক তরুণই তখন প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে। ফলে বিজেপি এখন থেকেই তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে।
এই পরিস্থিতিতে বিজেপির সামনে মূল চ্যালেঞ্জ দুটি—তরুণদের ক্ষোভের কারণগুলো বাস্তবে মোকাবিলা করা এবং একই সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক আস্থাকে ধরে রাখা। শুধু প্রচার বা বক্তৃতার মাধ্যমে সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
মতামত