ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে হারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কট্টর ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
অর্থ পাচারের একটি মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েস এ নির্দেশ দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক ভিডিওতে ফ্লাভিও নিজেই এ তথ্য জানান।
ফ্লাভিওর দাবি, নির্বাচনে হারলে তাকে ব্রাজিল ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন তার ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারো। গত শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ পরামর্শ দেন। ওই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতেই আদালত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন ফ্লাভিও।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেননি। এর আগে চার বছর আগে লুলার কাছে হেরে তার বাবাও পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
তবে সোমবার রাতে ফ্লাভিওর দল এক বিবৃতিতে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার কথা জানায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনী আদালতের ঘোষিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল তারা স্বীকার করছে। তবে নির্বাচন নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা গণতান্ত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মনে করে দলটি।
বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েস এর আগে ফ্লাভিওর বাবা জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের চেষ্টার মামলার বিচারিক কার্যক্রম তদারক করেছিলেন।
অর্থ পাচারের তদন্তে আদালতের নির্দেশ পাসপোর্ট জব্দের বিষয়ে আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশে অর্থ পাচারের একটি মামলার উল্লেখ রয়েছে। ওই মামলায় ফেডারেল পুলিশ তদন্ত করছে, অর্থ পাচারের একটি চক্রে ফ্লাভিও বলসোনারোর সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না।
আদালত তাকে তার বন্ধু ও আইনজীবী উইলের তোমাজের সঙ্গে কোনও ধরনের যোগাযোগ না রাখার নির্দেশও দিয়েছেন। তোমাজের সঙ্গে বাজি ধরার ব্যবসায় যুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে। পুলিশের সন্দেহ, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৬৮ কোটি পাউন্ড অর্থ পাচার করা হয়ে থাকতে পারে।
আদালতের আদেশে ফ্লাভিওর সব পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে সংসদ সদস্য হিসেবে তার কাছে থাকা কূটনৈতিক পাসপোর্টও রয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব পাসপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে তাকে।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমগুলো বিচারকের সিদ্ধান্তের খবর জানার আগেই বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন ফ্লাভিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি বলেন, ব্রাসিলিয়ায় গৃহবন্দী থাকা বাবার সঙ্গে দেখা করে ফেরার পর তিনি দেখতে পান, “লুলার ফেডারেল পুলিশ তার দরজায় এবং রাস্তার মাঝখানে অপেক্ষা করছে।” এ সময় তাকে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
ফ্লাভিও বলেন, তার ভাই এদুয়ার্দো শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি পডকাস্টে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় নির্বাচনে হারলে তাকে ব্রাজিল ছাড়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তবে ফ্লাভিওর দাবি, “আমি কখনও এমন কথা বলিনি।”
এদুয়ার্দো বলসোনারো বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন।
সিনেটের মেয়াদ শেষ হলে হারাবেন বিশেষ আইনি সুরক্ষা আগামী বছরের শুরুর দিকে সিনেটে ফ্লাভিও বলসোনারোর মেয়াদ শেষ হবে। এরপর ২৪ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তিনি কোনও সরকারি পদে থাকবেন না। ফলে পদাধিকার বলে পাওয়া বিশেষ আইনি সুরক্ষাও হারাবেন তিনি।
অর্থ পাচারের মামলার বাইরেও আরেকটি ফৌজদারি তদন্তের মুখে রয়েছেন ফ্লাভিও। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যাংকারের সঙ্গে তার কথোপকথন রেকর্ড হয়েছিল। সেখানে বাবার জীবন নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ওই ব্যাংকারকে প্রায় ২ কোটি পাউন্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন তিনি। সেই অর্থের পরিণতি কী হয়েছিল, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।
ব্রাজিলের সংবাদপত্র ফোলহা দে সাও পাওলো জানিয়েছে, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর তা বাতিলের যে পরিকল্পনা ফ্লাভিও ঘোষণা করেছিলেন, তা থেকে সরে আসতে তাকে রাজি করিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও আইনজীবীরা।
রবিবার রাতে ফল ঘোষণার পর ফ্লাভিও দাবি করেছিলেন, ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর কারণে নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে। যেসব ভোটার বাধ্যতামূলক বিনা মূল্যের গণপরিবহন ব্যবহার করতে না পেরে ভোট দিতে পারেননি, তাদের সুযোগ দিতেই সময় বাড়ানো হয়েছিল। তবে ফ্লাভিওর নিজের প্রচারশিবিরও ভোটের সময় বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দিয়েছিল।
পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, তার সহযোগী ও আইনজীবীরা তাকে বুঝিয়েছেন যে নির্বাচন বাতিলের পক্ষে তার যুক্তি আইনগতভাবে দুর্বল।
তবে নির্বাচন বাতিলের দাবি থেকে সরে আসার কথা ফ্লাভিও এখনও প্রকাশ্যে ঘোষণা করেননি। বরং ভিডিওতে তিনি জানান, অর্থনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে লুলার নির্বাচনী জোটের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে নতুন মামলা করবেন। নির্বাচনী প্রচারের সময়ও তার আইনি দল এ ধরনের অভিযোগে একাধিক মামলা করেছিল।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মতামত