'জ্ঞান হোক শক্তি,পাঠ হোক সংস্কৃতি' স্লোগানকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিননির্ভরতা কমিয়ে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শুরু হয়েছে ‘বই পড়া উৎসব-২০২৬’। উপজেলা প্রশাসন শ্রীমঙ্গলের আয়োজনে এ উৎসবে উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
সোমবার (১৭ আগষ্ট) সকাল ১০টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত ৪৫ মিনিটব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের প্রথম ধাপ ‘মুকুল’ পর্বের মূল্যায়নী পরীক্ষা। উপজেলার মাধ্যমিক,উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একযোগে এ পরীক্ষায় অংশ নেয়।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে,‘মুকুল’, ‘ফুল’ ও ‘ফল’ এই তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের বই পড়া উৎসব। প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা করবেন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে সমন্বয়ের জন্য একজন শিক্ষককে ‘ফোকাল পারসন’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপ ‘মুকুল’ পর্বে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শ্রেণি থেকে সেরা ১০ জন শিক্ষার্থীকে দ্বিতীয় ধাপের জন্য নির্বাচিত করা হবে। এর আগে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ডিগ্রি (পাস) ও অনার্স পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের ১৪টি বই নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিনের ‘আবিষ্কারের নেশায়’ ও এ. পি. জে. আবদুল কালামের ‘উইংস অব ফায়ার’; সপ্তম শ্রেণির জন্য শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’ ও জুল ভার্নের ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’; অষ্টম শ্রেণির জন্য হুমায়ুন আজাদের ‘লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী’ ও জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ নির্ধারণ করা হয়।
এ ছাড়া নবম শ্রেণির জন্য মুহম্মদ আব্দুল হাইয়ের ‘বিলেতে সাড়ে সাতশ দিন’ ও কাজী নজরুল ইসলামের ‘মরু-ভাস্কর’; দশম শ্রেণির জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাশিয়ার চিঠি’ ও সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’; একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির জন্য জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ ও আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল,রোটি, আওরাত’ এবং ডিগ্রি (পাস)/অনার্স পর্যায়ের জন্য বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ ও কাজী নজরুল ইসলামের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ রাখা হয়েছে।
উৎসবের দ্বিতীয় ধাপ ‘ফুল’ পর্বে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের নতুন একটি বই পড়তে দেওয়া হবে। এ পর্বের পরীক্ষা আগামী ৩০ ও ৩১ আগস্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে প্রতিটি শ্রেণির সেরা তিনজন শিক্ষার্থী চূড়ান্ত ‘ফল’ পর্বে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন,‘বই পড়ি,মন গড়ি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে শ্রীমঙ্গলে বই পড়া উৎসব-২০২৬ শুরু হয়েছে। প্রথম পর্ব ‘মুকুল’-এর মূল্যায়নী পরীক্ষায় উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে সামষ্টিক মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে এ পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন,‘বই পড়া উৎসবটি মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম পর্ব মুকুল,দ্বিতীয় পর্ব ফুল এবং সবশেষে ফল। শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননে বিকশিত করার লক্ষ্যেই পাঠ্যবইয়ের বাইরের গল্প,প্রবন্ধ,উপন্যাস,ভ্রমণকাহিনি ও বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং বই পড়তে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’
শ্রীমঙ্গল উদয়ন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কবিতা রাণী দাশ বলেন,‘শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া এবং তাদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার এমন উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মোবাইল ও বিভিন্ন ডিভাইসে অনেক সময় ব্যয় করে। বই পড়ার মাধ্যমে তারা শুধু জ্ঞান অর্জনই করবে না,তাদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও মূল্যবোধও বিকশিত হবে। শ্রীমঙ্গলের এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষিকা সবিতা দেব বলেন,‘বই মানুষের জ্ঞানের পরিধি বাড়ায় এবং মননশীলতা তৈরি করে। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য ও জ্ঞানভিত্তিক বই পড়ার সুযোগ তৈরি হলে তাদের চিন্তাভাবনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বই পড়া উৎসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠের প্রতি যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে,তা ভবিষ্যতেও ধরে রাখা প্রয়োজন।’
উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ‘জ্ঞান হোক শক্তি,পাঠ হোক সংস্কৃতি’,‘Today a reader, Tomorrow a leader’ এবং ‘বই পড়ি,মন গড়ি’ স্লোগানে আয়োজিত এ উৎসবকে ঘিরে শিক্ষার্থী,শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যেও উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
মতামত