ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চলছে। তরুণদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা।
শনিবার আন্দোলন দমনে ব্যাপক ধরপাকড় চালায় পুলিশ। এ সময় সিজেপির নেতা, বিরোধী দলের নেতাসহ হাজারো মানুষকে আটক করা হয়।
পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এসব আটকের ঘটনাকে ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করেন। এরপর রোববার আটক অনেককে মুক্তি দেওয়া হয়।
মুক্তি পাওয়ার পর সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কটাক্ষ করেন। তিনি লেখেন, ভারতের ইতিহাসে মোদির চেয়ে বড় কাপুরুষ ও দাদাগিরি করা নেতা আর আসেননি।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের (এসআইআর) নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী মোদির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সুবিধা হচ্ছে। এ কারণে তাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে মুসলিমরাও রয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় কারিগরি ত্রুটি এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে দুজন সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের নেওয়া একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শনিবারের বিক্ষোভের আগে নয়াদিল্লিকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলে খোদ কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার। বিক্ষোভকারীরা যাতে ভারতের পার্লামেন্টের কাছে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে না পারেন, সে জন্য শহরজুড়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। ট্রেন ও মেট্রো চলাচল বন্ধ রাখা হয়। বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোও আটকে দেওয়া হয়। ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় যন্তর মন্তরও।
এর আগে গত জুলাইয়ে এই যন্তর মন্তরেই সিজেপির বিক্ষোভ হয়েছিল। সেই আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে হওয়া ওই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল নিটসহ একের পর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায়।
এবারের বিক্ষোভ ঠেকাতে ২ কোটি মানুষের শহর নয়াদিল্লির গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। বাসে তল্লাশি চালানো হয়, যানবাহন পরীক্ষা করা হয়। সড়কে ব্যারিকেড ও কংক্রিটের প্রতিবন্ধক বসানোয় যান চলাচল ব্যাহত হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের সরঞ্জামযুক্ত দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যানও মোতায়েন করা হয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শহরজুড়ে ৩০ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। সিজেপি ও অন্যান্য সংগঠন যাতে অনলাইনে লোকজনকে সংগঠিত করতে না পারে, সে জন্য রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট–সেবাও বন্ধ রাখা হয়।
মুম্বাই থেকে নয়াদিল্লিতে পৌঁছানোর পর একটি উড়োজাহাজ থেকেই আটক করা হয় সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা দিপকে এবং তাঁর সহযোগী সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে।
ইনস্টাগ্রামে অভিজিতের পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজটি অবতরণের পর পুলিশের একটি দল ভেতরে ঢুকছে। পুলিশের সদস্যরা তাঁর কাছে এগিয়ে গেলে দিপকে বলেন, ‘আমি গ্রেপ্তার হতে এসেছি। আপনাদের ভয় পাই না।’
রাঙ্কার পোস্ট করা আরেকটি ভিডিওতে দিপকে বলেন, ‘এটা স্বৈরাচারী শাসন।’
দিল্লি পুলিশ জনপ্রিয় ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি এবং বামপন্থী সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) জাতীয় সভাপতি নেহা বোরাকেও আটক করে। সংগঠনটি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) সঙ্গে যুক্ত।
টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিরোধী রাজনীতিকদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকেও আটক করা হয়েছিল।
এত ধরপাকড়ের মধ্যেও দিল্লির কয়েকটি স্থানে ছোট ছোট বিক্ষোভ হয়। এর মধ্যে জনপ্রিয় হস্তশিল্পের বাজার দিল্লি হাটও ছিল। তবে পুলিশ সেসব বিক্ষোভও ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদেরও আটক করা হয়।
মুম্বাইয়েও বিক্ষোভ ঘিরে প্রায় ৬০০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা এএনআই।
গতকাল রোববার পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আটক সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সিজেপির নেতাদের এক বছরের জন্য ‘শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার’ শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
মুক্তির পর গতকাল বিকেলে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করেন সিজেপির নেতা সৌরভ দাস। তিনি পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, পুলিশ ‘মাফিয়া ডনদের মতো’ আচরণ করেছে এবং উড়োজাহাজের ভেতর থেকে তাঁদের অপহরণ করেছে।
মুক্তির পর ধ্রুব রাঠি বলেন, তাঁকে আটক বা গ্রেপ্তার নয়, ‘অপহরণ’ করা হয়েছিল।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কয়েকজন সাংবাদিককেও আটক করা হয়েছিল। পরে তাঁদের সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে নিউজলন্ড্রি জানিয়েছে, আটক করার সময় তাঁদের কয়েকজন প্রতিবেদকের সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছিল।
সাংবাদিকদের সাময়িকভাবে আটক করার খবরে উদ্বেগ জানিয়েছিল সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)।
সংগঠনটির এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার আল–জাজিরাকে বলেন, ‘পুলিশের সদস্যরা যেমন তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন, সাংবাদিকেরাও তেমনি তাঁদের কাজ করছেন। গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম অপরিহার্য।’
সিজেপির নেতারা দিল্লিতে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গতকালও সংগঠনটির কয়েকজন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচির অনুমতির জন্য আজ সোমবার তাঁরা পুলিশের সঙ্গে দেখা করে অনুমতি চেয়েছেন। কিন্তু পুলিশ তাঁদের সেখানে সমাবেশের অনুমতি দেয়নি। এখন তাঁরা নতুন করে জ্ঞানেশবিরোধী বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে।
এর আগে মুক্তি পাওয়ার পর সৌরভ দাস এক্সে দেওয়া পোস্টে লেখেন, অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদি দিল্লিকে দুর্গে পরিণত করেছেন এবং নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন।
সৌরভ দাস আরও লিখেছেন, তরুণ প্রজন্ম জবাবদিহি দাবি করে যাবে। ভয় দেখিয়ে বা কণ্ঠ রোধ করে তাদের থামানো যাবে না। তারা আরও শক্তি নিয়ে ফিরে আসবে।
সিজেপি গতকাল সন্ধ্যায় মুম্বাইসহ ভারতের অন্য শহরগুলোতেও বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় সভাপতি নেহা বোরা গতকাল বিকেলে দিল্লির কেন্দ্রস্থলে কে আশ্রমে বিক্ষোভ শুরু করেছেন। পরে তাঁকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে ভারতের বিরোধী দলগুলোর জোট ইন্ডিয়া ব্লক। এই জোটের নেতৃত্বে রয়েছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপাল শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, বিক্ষোভ মিছিলের প্রস্তুতি নিতে আগের দিন বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে বিস্তারিত বৈঠক করেছেন তাঁরা। তিনি বলেন, ‘জ্ঞানেশকে বিদায় নিতেই হবে। আমরা পিছু হটব না।’
বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী কয়েক মাস ধরে নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছেন। গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে নির্বাচনসংক্রান্ত বিক্ষোভের ঘটনায় তাঁকেও অল্প সময়ের জন্য আটক করা হয়েছিল।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, আটক, গ্রেপ্তার, কারাগার, লাঠিপেটা কিংবা ছররা গুলি ভারতের মানুষকে দমাতে পারবে না। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকেই তরুণেরা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন।
গত মাসে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে জ্ঞানেশ কুমারের সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে দুজন প্রশ্ন তুলেছিলেন। এরপরই বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়।
বিজেপির দাবি, বাদ পড়া ১৩ কোটি নামের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ব্যক্তির, ৬ কোটি ৩০ লাখ অন্যত্র চলে গেছেন, ১ কোটি নাম একাধিকবার রয়েছে এবং ৩ কোটি ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ক্ষমতাসীন দলটির বক্তব্য, নির্বাচনে তাদের সাফল্যের পেছনে মোদির জনপ্রিয়তা ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও করেছে বিজেপি।
তবে বিক্ষোভ এখন শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মোদি সরকারের আমলে গণতন্ত্র, ভিন্নমত প্রকাশ এবং প্রতিবাদের অধিকার নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি করেছে।
এর আগে জুলাইয়ের বিক্ষোভের সময় সরকার তরুণ সংগঠনগুলোর সঙ্গে সাময়িকভাবে আলোচনায় বসেছিল। কিন্তু এবার সাংবিধানিক ও নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের পদত্যাগের দাবির মুখে সরকার অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
বিজেপির নেতারা বিক্ষোভ ও অনলাইনে সরকারের সমালোচনাকে জনসাধারণের বৈধ ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে না দেখে সরকারকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পিত রাজনৈতিক চেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছেন।
শনিবার বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বিক্ষোভকারীদের ‘নৈরাজ্যবাদী’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, তাঁদের ‘ব্যর্থ প্রদর্শনী পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে’।
সম্বিত পাত্র আরও বলেন, যন্তর মন্তরে যা ঘটছে, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যা দেখানো হচ্ছে, তা ভারতের সামগ্রিক চিত্র নয়। তাঁর দাবি, ভারতের পরিস্থিতি শান্ত।
তবে আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলা সমালোচক ও বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি মেনে নিলে ভোট চুরির বিষয়ে বিরোধীদের অভিযোগকে কার্যত স্বীকৃতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নিয়ে সচেতন প্রধানমন্ত্রীর দুর্বলতাও প্রকাশ পাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও হার্ড নিউজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক সঞ্জয় কাপুর বলেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষই চান না, মোদির বিজেপি ক্ষমতায় থাকুক। তাঁর ভাষায়, মোদি সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন অনেকটাই কমতে শুরু করেছে।
সঞ্জয় কাপুরের মতে, বিজেপি ভয় পাচ্ছে, জনমত দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় ফিরে আসা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
মতামত