ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে বলে দাবি মার্কিন প্রেসিডেন্টের; যুদ্ধ বন্ধে সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুতিনের
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে কোনো হামলা চালানো হবে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে। তবে আলোচনার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
ট্রাম্পের এ ঘোষণার আগে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন হামলার পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘আমি সবার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করতে চাই, ইরান অর্থনৈতিক ও সামরিক—উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় থাকলেও এবং অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর থাকলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আমরা কোনো সময়েই ইরানে হামলা চালাব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে আমাদের ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে।’
ইরানে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিবেদন
বুধবার মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিক জানায়, হোয়াইট হাউস পেন্টাগনকে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করতে বলেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেও এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বৃহস্পতিবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস একই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংবাদপত্রটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তহীনতা সত্ত্বেও ইরানে হামলার পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
এদিকে, বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে অব্যাহত উত্তেজনার কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে। পাশাপাশি, ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতও বাজারে প্রভাব ফেলছে।
জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের একটি বড় অংশ অসন্তুষ্ট। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১০৫ দশমিক ৮৮ ডলারে উঠেছিল। পরে তা কমে ১০৪ দশমিক ২৮ ডলারে নেমে আসে।
যুদ্ধ বন্ধে সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুতিনের
এদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে সর্বাত্মক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে রুশ সংবাদমাধ্যম।
আঞ্চলিক সম্মেলনে যোগ দিতে ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী পর্যটনকেন্দ্র আভাজায় পৌঁছানোর পর পুতিন বলেন, ‘পরিস্থিতির নিষ্পত্তিতে অবদান রাখতে আমাদের সাধ্যের মধ্যে যা কিছু আছে, তা করতে আমরা প্রস্তুত।’
শুক্রবার থেকে শুরু হতে যাওয়া স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর কমনওয়েলথের (সিআইএস) সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি তুর্কমেনিস্তানে যান।
রুশ সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে পুতিনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ বন্ধে ‘প্রকৃত প্রচেষ্টা’ চালিয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। দুই দেশই ক্রমশ একে অপরের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন নিয়ে চাপে ট্রাম্প
গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ইরান যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। তবে দেশটিতে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি নিরাপত্তাজনিত হুমকির কারণে ইংল্যান্ডের একটি ঘাঁটি থেকে মার্কিন বোমারু বিমান সরিয়ে নিতে বাধ্য হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ইরান যুদ্ধ শেষ হলেই জ্বালানির দাম কমে যাবে বলে দাবি করে আসছেন ট্রাম্প। তবে তাঁর এ বক্তব্য ভোটারদের মধ্যে এখন পর্যন্ত তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি।
আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে কংগ্রেসে রিপাবলিকান দলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
ট্রাম্প নিজে নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও সম্ভাব্য নির্বাচনী ক্ষতি ঠেকাতে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিজেদের পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে একের পর এক নির্বাচনী সমাবেশ করছেন।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে তাঁর বিরুদ্ধে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ট্রাম্প। এদিকে, হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে একাধিক তদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের হামলার হুমকি নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প চলতি সপ্তাহের শুরুতে একটি নির্বাচনী সমাবেশে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে তৈরি বিতর্ক প্রশমিত করার চেষ্টা করেন। ওই বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ইরান লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগো শহর ‘ধ্বংস করে দিতে পারে’।
৮০ বছর বয়সী ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যার জন্য ‘ভুয়া ও কৃত্রিম সংবাদমাধ্যমকে’ দায়ী করেন। তাঁর মন্তব্যের সমালোচনা করেন ডেমোক্র্যাট নেতারা।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘আসলে, আমি বোঝাতে চেয়েছি, ইরানের হাতে যাতে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে, সে জন্য পেট্রলের দামে সাময়িক বৃদ্ধি মেনে নেওয়া খুবই সামান্য মূল্য। আর বড় মূল্য কী হতে পারে, তা কি আপনারা কল্পনা করতে পারেন—যদি ইরান সান দিয়েগো অথবা লস অ্যাঞ্জেলেসে বোমা হামলা চালায়?’
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা নয়, ঘোষণা ট্রাম্পের
মতামত