রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের কয়েকটি শহরে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধপ্রবণতা আবারও বেড়েছে। চট্টগ্রাম, খুলনা ও কুমিল্লায় খুন, ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন অপরাধে কিশোর-তরুণদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্যাং সদস্যদের অনেকে গ্রেফতার হলেও এসব চক্রের নেপথ্যে থাকা কথিত ‘বড়ভাই’ বা গডফাদারদের একটি অংশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু কিশোর গ্যাংয়ের আশ্রয়দাতারাও বদলেছে। আগে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যাদের চলাফেরা দেখা যেত, তাদের অনেকে এখন বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন নেতাকর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
খুলনায় পাড়া-মহল্লায় কিশোরদের ছোট ছোট অপরাধী চক্রের তৎপরতা বাড়ছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর আহসান আহমেদ রোডে দুই নারীর ব্যাগ থেকে টাকা নেওয়ার ঘটনায় ১২-১৩ বছর বয়সি এক কিশোরীকে আটক করা হয়। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন কিশোর-কিশোরী ছিল বলে জানা যায়।
এর আগে ১৯ আগস্ট লবণচরায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই তরুণ হত্যার ঘটনায় ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সিদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ। চুরি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধ থেকেই ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে জানা গেছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীতে টিপসি বয়েজ, ডেঞ্জার বয়েজ, গোল্ডেন বয়েজ, কিং অব রূপসা ও টাইগার টিমসহ অন্তত পাঁচটি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক, ছিনতাই, অস্ত্র ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ‘টাইগার টিম’ নামে একটি গোষ্ঠীর প্রকাশ্য মোটরসাইকেল শোডাউন ও অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগও উঠেছে। তবে কেএমপি কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান বলেছেন, ‘টাইগার টিম’ নামে কোনো বাহিনীর তথ্য পুলিশের কাছে নেই। তিনি জানান, নগরীতে একাধিক বাহিনী গড়ে ওঠার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কেএমপির গোয়েন্দা বিভাগ জানিয়েছে, খুলনার অপরাধজগত নিয়ন্ত্রণে নয়টি সিনিয়র গ্রুপের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, ট্যাংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপ রয়েছে। পুলিশের দাবি, এসব সিনিয়র গ্রুপ মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কাজে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের হাতে অস্ত্রও তুলে দেওয়া হয়।
কুমিল্লায়ও কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের সঙ্গে কথিত রাজনৈতিক আশ্রয়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, আগে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘রাও’ ও ‘ক্রাইম সেটআপ’সহ কয়েকটি গ্যাং এখন মহানগর ছাত্রদলের কিছু নেতার ছত্রছায়ায় সক্রিয়।
নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৫০টির বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। এসব দলের ‘বড়ভাই’ বা অভিভাবক হিসেবে পরিচিতদের অনেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন অপরাধে গ্যাং সদস্যদের ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি কক্সবাজারে অভিযান চালিয়ে ‘রাও’ ও ‘ক্রাইম সেটআপ’ গ্যাংয়ের দুই প্রধানসহ চারজনকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। গ্রেফতারদের মধ্যে রাও গ্যাংয়ের প্রধান ইমরান হোসেন রতন ও তার সহযোগী সাইফুল ইসলাম এবং ক্রাইম সেটআপের প্রধান মো. সাব্বির ওরফে ‘পয়েন্ট সাব্বির’ ও সহযোগী রবিউল ইসলাম নবী ওরফে কিং মেকার রয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য, তাদের জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজন ‘অভিভাবকের’ নাম পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সেসব নাম প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে কুমিল্লার ১৮ থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে আরও ৩৬৩ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের হিসাবে, পাঁচ দফার অভিযানে মোট ২ হাজার ৩৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
কুমিল্লা ডিবির ওসি মোহাম্মদ শামছুল আলম শাহ জানিয়েছেন, গ্রেফতারদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। নেপথ্যের গডফাদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি জড়িত থাকলেও ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রামেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আবার বেড়েছে। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধে কিশোরদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়দের অভিযোগ, কথিত ‘বড়ভাইদের’ আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব অপরাধে জড়াচ্ছে কিশোররা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ৩৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। অন্যান্য অপরাধের ঘটনা ছয়শর বেশি। নগরীর অন্তত অর্ধশতাধিক এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
সাম্প্রতিক সময়ে ৫জি, ৭জি, ৭ বয়েজ, কিউট বয়েজ, এমবিএস, কেবি, এনএস, ৯৯৯, এক্স-মার্ক, ব্যাকহোল, ডট গ্যাং, বিসু, পাইথন, সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টারসহ বেশ কয়েকটি গ্যাংয়ের নাম সামনে এসেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সিএমপির ‘অপারেশন এস ড্রাইভ’ শুরু হওয়ার পর কয়েক মাসে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও ইয়াবাও উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ।
এর মধ্যে ৪ এপ্রিল বাকলিয়ার মিয়াখান নগরে দুই কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে ১৩ বছরের শিশু ফাহিমসহ পাঁচজন আহত হয়। ৬ এপ্রিল কোতোয়ালির কারাবানীগঞ্জ বলুয়াদিঘির পাড়ে যুবদল কর্মী মিনহাজকে কুপিয়ে আহত করার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের জড়িত থাকার কথা জানায় পুলিশ। ১২ এপ্রিল চকবাজারে দুই পক্ষের সংঘর্ষে বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আশফাক কবির সাজিদ নিহত হয়। সর্বশেষ খুলশির ওয়্যারলেস গেট এলাকায় ছুরিকাঘাতে হৃদয় নামে এক কিশোর নিহত হওয়ার ঘটনায় ছয় কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সিএমপির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশীদ বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং প্রতিদিনই সদস্যদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। প্রতিটি থানায় গ্রেফতারের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সন্তানদের চলাফেরা ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তিন নগরীর ঘটনাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা গ্রেফতার হলেও তাদের নেপথ্যে থাকা কথিত আশ্রয়দাতা ও বড়ভাইদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতামত