শারদীয় দুর্গাপূজা সামনে রেখে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা তৈরির কারিগররা। খড়, বাঁশ ও মাটির কাঠামোর ওপর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার অবয়ব। পূজার উৎসব শুরু হওয়ার আগেই কারিগরদের ঘাম ও শ্রমে পূর্ণতা পাচ্ছে প্রতিমাগুলো।
উপজেলার প্রতিমা কারিগর শ্রী তপন চন্দ্র মালি এ বছর তৈরি করেছেন ১০টি প্রতিমা। প্রতিটি প্রতিমা ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করছেন তিনি। একটি প্রতিমা তৈরিতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। প্রতিটি প্রতিমা তৈরির কাজে ১৫ থেকে ১৬ জন শ্রমিক যুক্ত থাকেন।
তপন চন্দ্র মালি বলেন, “প্রতিমা তৈরির কাজটা মৌসুমি। পূজার সময় কাজের চাপ থাকে। কাজ শেষ হলে আবার কৃষিকাজে যুক্ত হই।”
একইভাবে উপজেলার আরেক প্রতিমা কারিগর শ্রী শ্যামল চন্দ্র এ বছর তৈরি করেছেন ৯টি প্রতিমা। তাঁর ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতিমা তৈরির প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে।
শ্যামল চন্দ্র বলেন, “প্রতিমা তৈরির মাটি ভালো ও শক্ত হতে হয়। সাধারণত ভালো পুকুর বা ক্ষেতের শক্ত মাটি কিনে নিয়ে প্রতিমা তৈরি করি। গত বছরের তুলনায় এবার সবকিছুর দাম বেড়েছে। তারপরও কাজ ধরে রাখতে হচ্ছে।”
তিনি জানান, একটি প্রতিমা তৈরি করতে প্রায় ১২ দিন সময় লাগে। একজন কারিগর একটানা ১২ দিন কাজ করেই একটি প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করতে পারেন। সব ধরনের খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি প্রতিমায় তাঁদের প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা লাভ থাকে।
তবে এই পেশা সারা বছরের জীবিকা নয়। শ্যামল চন্দ্র জানান, সাধারণত প্রায় তিন মাস প্রতিমা তৈরির কাজ চলে। এরপর বাকি সময় তিনি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। অনেক সময় অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।
তিনি বলেন, “প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হলে আবার কৃষিকাজে চলে যাই। বছরের বাকি সময় অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালাতে হয়। তবে চাই, আমাদের সন্তানরাও এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকুক। নতুন প্রজন্ম এ কাজ ধরে রাখলে আমাদের ঐতিহ্যটাও টিকে থাকবে।”
কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিমা তৈরির কাজে শুধু কারিগররাই নন, তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন স্থানীয় শ্রমিকরাও। ফলে পূজার মৌসুমে কয়েক মাসের জন্য হলেও তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু বছরের বাকি সময়ে অনেক কারিগরকে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়।
মাটির তৈরি প্রতিমার আড়ালে তাই শুধু উৎসবের গল্প নয়, রয়েছে গ্রামীণ মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থান, কৃষিনির্ভর জীবন ও বংশপরম্পরায় চলে আসা একটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম। পূজার মণ্ডপে যখন আলো জ্বলবে, তখন সেই আলোর পেছনে থেকে যাবে কারিগরদের দিনের পর দিন পরিশ্রমের গল্প।
মতামত