নীলফামারীর সৈয়দপুরে শহরের প্রাণ কেন্দ্রে রেলওয়ের একটা বাংলোসহ আশপাশের ১ একর ১০ শতক জমি দখলের অপচেষ্টা চালিয়েছে একটা চক্র। কিন্তু তাৎক্ষণিক সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে ভেস্তে গেছে বেআইনি অপতৎপরতা।
সংবাদ কর্মী, রেলওয়ে শ্রমিক নেতাদের উপস্থিতিতে পিছু হটে দখলের জন্য আনা মালামাল ফেলে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত সটকে পড়েছে দখলবাজরা। রোববার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে শহরের পাঁচমাথা মোড় সংলগ্ন শহীদ ক্যাপ্টেন সামসুল মৃধা সড়কে (বিমানবন্দর রোড) এই ঘটনা ঘটেছে।
জানা যায়, এখানে সৈয়দপুর রেলওয়ে ভূসম্পত্তির আওতাধীন ১১০ নং বাংলো অবস্থিত। এই বাংলোর আশে পাশে ১ একর ১০ শতক জমি আছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এই জায়গাটুকুসহ পরিত্যক্ত বাংলোটি রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের নামে অনেক আগে থেকেই লিজ নেওয়া আছে। তারপরও এই সম্পত্তিটি দখলে নিতে বিভিন্ন সময়েই প্রভাবশালীরা একাধিকবার চেষ্টা চালিয়েছে।
বিগত প্রায় ১৭ বছর এটা বিটস্ কোচিং সেন্টারের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দখল করে রেখেছিল আব্দুল হাফিজ হাপ্পু। তিনি সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোখছেদুল মোমিনের ভাই। জুলাই অভ্যুত্থানে পট পরিবর্তনের পর তারা পালিয়ে যায়। এমতাবস্থায় নতুন করে দখলের অপচেষ্টায় নামে বেশ কয়েকটি গ্রুপ।
এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ রোববার দখলে নামে সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আরাফাত রহমান রানার নেতৃত্বে প্রায় অর্ধ শতাধিক যুবক। ভোর থেকেই সেখানে টিনের চালা ও বাঁশের খুটি নিয়ে এসে ফালায় তারা। খবর পেয়ে সংবাদ কর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জানতে চায় কিসের ভিত্তিতে এই জায়গা ঘিরে নেওয়া হচ্ছে।
এতে রানা জানায় রেলওয়ের পাকশী ভূসম্পত্তি বিভাগের কাছ থেকে কমার্শিয়াল লিজ দেওয়া হয়েছে। তাই দখলে নিয়ে এখানে মার্কেট করা হবে। কিন্তু লিজের কাগজ দেখতে চাইলে তা দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করে। এতে বিষয়টি নিশ্চিত হতে স্থানীয় ও পার্বতীপুর এবং পাকশী রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কেউ কিছু জানেনা বলে মন্তব্য করেন।
এর প্রেক্ষিতে রেলওয়ের বিশাল সম্পদ দিনের বেলায় দখল হয়ে যাচ্ছে বলে শহর জুড়ে চাউর হয়ে পড়ে। এমন খবর পেয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার শ্রমিক সংগঠন বিআরইএল সভাপতি খাইরুল বাশার ও শ্রমিক কল্যাণ ট্রাস্টের সদ্য নির্বাচিত প্রতিনিধি আবু হাসান ছুটে এসে ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। পরে তারা অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সৈয়দপুর কারখানার বিভাগীয় তত্বাবধায়ক (ডিএস) কে জানান।
সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে সেখানে শত শত লোকের সমাগম ঘটে। এসময় সৈয়দপুর কারখানার বিভাগীয় তত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সূফী নুর মোহাম্মদ, সৈয়দপুর রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগের প্রকৌশলী (এইএন) তৌহিদুল ইসলাম ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম আসেন। তাদের উপস্থিতি দেখে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ে দখল করতে আসা লোকজন। লিজ দাবিকারী রানার কাছে কাগজ দেখার জন্য তাকে ডেকে আনার চেষ্টা করেও আর পাওয়া যায়নি।
পরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দখলের জন্য আনা টিনের চালা ও বাঁশের খুটি জব্দ করে। সেই সাথে জায়গাটি রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের নামে বহুতল মার্কেট নির্মাণের জন্য বরাদ্দ মর্মে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়। এনিয়ে পুরো শহরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। দখলবাজির বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সর্বস্তরের মানুষ।
সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর ফরহাদ হোসেন বলেন, বৈধ লিজ হলে অবশ্যই রেলওয়ের ম্যাজিস্টেট ও স্থানীয় কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে দখল বুঝিয়ে দিবেন। সেখানে তাদের অনুপস্থিতিতে দলীয় কর্মী ও ব্যক্তিগত সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে এভাবে দখল করতে আসা ঠিক হয়নি। তাছাড়া এই স্থান রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের নামে বরাদ্দ দেওয়া আছে। একই জায়গা কিভাবে আর কাউকে লিজ দিবে?
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ রেলওয়ে এমপ্লয়িজ লীগের সৈয়দপুর কারখানা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সদ্য নির্বাচিত প্রতিনিধি আবু হাসান বলেন, এই জায়গা রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের বহুতল মার্কেট নির্মাণের জন্য বরাদ্দ নেওয়া। দীর্ঘদিন এটা অবৈধভাবে ভোগ দখল করে রেখেছিল একটা গোষ্ঠী। এখন আর কাউকে দখল করতে দেওয়া হবেনা। কারণ এটা রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারীদের বৈধ সম্পদ।
সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রেজওয়ান আক্তার পাপ্পু বলেন, বিএনপি বা এর অঙ্গ সংগঠনের নামে কেউ এমন বেআইনি দখলবাজি করলে তাদের কোনভাবেই ছাড় দেওয়া হবেনা। কারন, দলের চেয়ারপার্সন ও প্রধানমন্ত্রী কোনভাবেই অন্যায় ও অপকর্মকে বরদাস্ত করবেন না। এবিষয়ে তিনি খুবই কঠোর। যার নজির গত কয়েকদিনে দেখেছে দেশবাসী। আজকের এই ঘটনারও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেলা সাড়ে ৩ টার দিকে রানা মুঠোফোনে সাংবাদিকদের বলেন, আমার সাথে প্রতারণা করেছে পাকশী রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা লিজ দেওয়ার সময় বলেছিল এখানে এসে দখল বুঝিয়ে দিবেন। তাদের কথামতেই আমি সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। সে অনুযায়ী পার্বতীপুরে তারা অবস্থান করছেন। কিন্তু সকাল থেকে বার বার কল দেওয়া হলেও তারা উপস্থিত হননি।বৈধভাবে দখলে নিয়ে মার্কেট করতে চেয়েছি। এজন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বলেছি এবং সংবাদকর্মীদেরও আমি নিজেই ডেকে নিয়েছি।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সূফী নুর মোহাম্মদ বলেন, যিনি দখল করতে এসেছিলেন তার লিজ যদি সঠিক হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়ী। কিন্তু তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং ডাকার পরও তাকে পাওয়া যায়নি। এর সাথে জড়িত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর যদি তিনি ভূয়া লিজের মাধ্যমে অপদখল করতে চান তাহলে তার বিরুদ্ধেও প্রতারণা মামলা করা হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবেনা। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, অভিযোগ রয়েছে, পাকশী রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা মোটা অংকের উৎকোচকের বিনিময়ে একই জায়গা একাধিক ব্যক্তির কাছে লিজ দেয়। আর এতে সহযোগিতা করেছে স্থানীয় কিছু দালাল।এমনকি তাদের কাছ থেকে রেলওয়ের পানির পাম্প হাউজও লিজ নিয়ে দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। তাছাড়া রেলওয়ে লিজ নীতি বহির্ভূতভাবে অবৈধ বহুতল মার্কেট নির্মাণ করে অনেকেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন।
মতামত