নীলফামারীর সৈয়দপুরে নিষিদ্ধ ক্ষতিকর চায়না দুয়ারী জাল (ম্যাজিক জাল) ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোর দেশীয় জাতের মাছের বীজ (ডিম ও পোনা) ধ্বংস হচ্ছে দেদারসে। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরব ভূমিকার কারণে উপজেলার সর্বত্র এই জাল দিয়ে মাছ ধরার মহোৎসব চলছে। ফলে ছোট বড় সব মাছের পাশাপাশি কাঁকড়াসহ উপকারী জলজ প্রানীও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জানা যায়, চায়না দুয়ারী জাল হলো একটি বিশেষ ধরনের ক্ষতিকর ও ফাঁদযুক্ত মাছ ধরার জাল, যা বর্তমানে বাংলাদেশের জলজ জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় মৎস্য সম্পদের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। এটি মশারি নেটের আদলে তৈরি অত্যন্ত ঘন ও সুক্ষ্ম ফাঁসের জাল। এর ভেতরে ধারাবাহিক রিং বা লোহার ফ্রেম এবং একাধিক প্রবেশপথ বা দুয়ার থাকে। একবার কোনো ছোট বা বড় মাছ বা জলজ প্রাণী এই জালের ভেতরে প্রবেশ করলে আর বের হতে পারে না।
এটি চরম ক্ষতিকর। এই জালের ফাঁসের আকৃতি এতটাই ছোট যে রুই, কাতল, পুঁটিসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছের ডিম ও রেণু পোনা এতে আটকা পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।মাছের পাশাপাশি ছোট চিংড়ি, কাঁকড়া এবং অন্যান্য উপকারী জলজ প্রাণীও নির্বিচারে মারা পড়ে। এর অবাধ ব্যবহারের ফলে দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ আজ বিলুপ্তির পথে। চায়না দুয়ারী জাল আইনগতভাবে নিষিদ্ধ একটি অপরাধমূলক ফাঁদ। এর উৎপাদন, আমদানি, মজুদ, বাজারজাতকরণ, পরিবহন বা ব্যবহার সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ।
সরেজমিনে উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের বসুনিয়াপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হাজারীহাট থেকে দোয়ালীপাড়া হয়ে সৈয়দপুর-রংপুর মহাসড়ক পর্যন্ত বয়ে গেছে (ভাঙ্গা মারির দোলা নালা) খাল। এই নালায় মাত্র আধা কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ডজনখানেক বিশালাকৃতির টনিজাল (ঢেকি) বসানো হয়েছে। সেই সাথে স্থানে স্থানে চায়না দুয়ারী জালে ছেয়ে গেছে জলাশয়টি।
যার ফলে ওই নালায় যেমন দেশীয় মাছগুলো বড় হতে পারছেনা তেমনিভাবে কোন মাছ ডিম দিলেও তা ভ্রুনাবস্থায়ই শিকার হয়ে যাচ্ছে।
এতে নালাটি দিয়ে প্রবাহিত পানিতে বসবাসকারী দেশীয় মাছ ও কাঁকড়াসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীও বংশ বিস্তার করতে পারছেনা। একারণে দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ প্রায় সারাবছরই এই নালায় পানি প্রবাহ থাকে। আর এই সুযোগে মাছ শিকারীরাও সারাবছর জাল পাতে। এজন্য এই জলাশয়ের মাছের প্রাকৃতিক মজুদ কমে গেছে। সম্প্রতি বৃষ্টি হওয়ায় এসব টনি জালের সাথে নতুন করে চায়না দুয়ারী জাল বসানো হচ্ছে কয়েকটি জায়গায়। এতে মাছের এই উৎস সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
তারা আরও বলেন, আমরা আগে প্রায় সবাই এই নালার মাছ ধরে খেতাম। এখন বড় বড় টনি জাল ও মশারীর মত ফাঁদযুক্ত ম্যাজিক জাল দিয়ে মাছ ধরার ফলে কতিপয় মাছ শিকারীর দখলে পুরো খাল। আমাদের আর কোন সুযোগ নাই এখানকার মাছ খাওয়ার। হবি নামে একজন ক্ষতিকর চায়না দুয়ারী জাল ব্যবহার করে মাছ ধরছে। প্রকাশ্যে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ এই জাল দিয়ে মাছ শিকার করা হলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও নির্বিকার।
একইরকম দৃশ্য দেখা গেছে উপজেলার বোতলাগাড়ী ও বাঙালীপুর ইউনিয়নের প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোতে। দিনের আলোতে এভাবে বেআইনি কাজ করা হলেও সৈয়দপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কোন পদক্ষেপই নেয়নি। এমনকি অভিযোগ করা হলেও কোন কর্তৃপক্ষই ভ্রুক্ষেপ করেনি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট একটা সূত্রমতে, সৈয়দপুর শহরেই তৈরি হচ্ছে এই চায়না দুয়ারী জাল। এখানে কয়েকটি জায়গায় ব্যাপক মজুদ আছে এই নিষিদ্ধ পন্যের। হাট বাজারেও প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। আর এর সাথে জড়িত প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতা। যে কারণে এই জাল রোধে কোন উদ্যোগ নাই।
এমন অভিযোগের বিষয়ে কথা হলে, উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোস্তারিনা আফরোজ বলেন, আমরা নিয়মিত তদারকি করি। তবে জনবল কম থাকায় সব জায়গায় পৌঁছা সম্ভব হয়ে উঠেনা। তাছাড়া মৎস্যজীবীদের নিয়ে সচেতনতা মুলক নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতামত