আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব পুনর্প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় ধরনের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সম্প্রতি প্রদত্ত কঠোর বক্তব্য এবং শি জিনপিং বা আন্তর্জাতিক নেতাদের সাথে একাধিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তাঁর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের এক বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের 'শক্তি প্রয়োগের' পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে ইউরোপীয় মিত্র, চীন, ইরান ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর প্রতিরোধমূলক অবস্থান ওয়াশিংটনের কৌশলকে গতিহীন করে তুলছে।
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক চুক্তিতে না আসলে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন। একই সাথে ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে "বিজয়ীরাই লুটের মাল পায়" মন্তব্য করে আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জনে মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহারের জোরালো ইঙ্গিত প্রদান করেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বকে ‘জঙ্গলের আইনে’ না নিয়ে ‘সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজ’ গড়ার তাগিদ দেন।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বা বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর কঠোর সমালোচনা করে নিজস্ব সার্বভৌমত্বের কথা তুলে ধরেন।
জাতিসংঘে শীর্ষ বৈঠকের অংশ হিসেবে ট্রাম্প বেইজিংয়ের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করলেও সেখানে বড় ধরনের কোনো কৌশলগত অগ্রগতি হয়নি।
জাঁকজমকপূর্ণ এই আলোচনার মূল অর্জন ছিল দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্য যুদ্ধের মেয়াদ আরও মাত্র ২ মাসের জন্য স্থগিত রাখা।
বৈঠকে শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্পষ্ট ভাষায় তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানান। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তি ও গাড়িশিল্পে ব্যবহৃত 'রেয়ার আর্থ' বা বিরল খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহ চীনের হাতে থাকায় ট্রাম্প এবার আগের চেয়ে অনেকটাই নমনীয় অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইসরায়েলের সাথে যুক্ত হয়ে ইরানে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ শুরু হয়, যা প্রায় সাত মাস ধরে চললেও সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তায় বড় ধস নামিয়েছে।
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সীমিত মাত্রায় জ্বালানি যুদ্ধবিরতির মার্কিন প্রচেষ্টা খুব একটা সফল হয়নি। অন্যদিকে, গ্রিনল্যান্ড সরাসরি 'কিনে নেওয়ার' ট্রাম্পের আগের দাবি ভেস্তে গিয়ে কেবল সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সীমিত সমঝোতায় ঠেকেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমারের মতে, এক বছর আগেও যে দেশগুলো মার্কিন চাপ মেনে চলত, বর্তমানে কানাডা, ইউরোপ, চীন, রাশিয়া ও ইরান প্রকাশ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে 'না' বলার সাহস দেখাচ্ছে।
সামনে আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন। কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির একক কর্তৃত্ব ঝুঁকিতে পড়ায় ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক রাজনৈতিক ক্ষমতা আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এসব আলোচনাকে নাকচ করে দিয়ে হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে লোক দেখানো সম্পর্কের বদলে আলোচনার টেবিলে বাস্তব ফলাফলে বিশ্বাসী।
মতামত