ইলিশের ভরা মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলে দেখা দিয়েছে বরফের তীব্র সংকট। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বরফ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বরিশালসহ উপকূলীয় বিভিন্ন মাছের ঘাট ও মজুদকেন্দ্রে চাহিদামতো বরফ মিলছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন হাজারো জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী। বরফের সংকটে অনেক জেলে কাঙ্ক্ষিত সময়ের আগে ঘাটে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কেউ কেউ পর্যাপ্ত বরফ না পাওয়ায় মাছ ধরার ঝুঁকি কমিয়ে দিয়েছেন।
মৎস্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় আড়াইশ মাছের মজুদকেন্দ্র ও ঘাটে বর্তমানে বরফের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটায় বরফ কারখানাগুলো স্বাভাবিক উৎপাদনে যেতে পারছে না। ফলে ৫০ কেজির যে বরফ আগে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হতো, সেটি এখন ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও চাহিদা অনুযায়ী আরও বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বরিশালের মৎস্যবন্দরগুলোতে সাধারণত বড় ট্রলারগুলো ৮ থেকে ১০ দিন সাগরে অবস্থান করে মাছ নিয়ে ঘাটে ফেরে। কিন্তু বরফের সংকটের কারণে অনেক ট্রলার ৪-৫ দিনের মধ্যেই ঘাটে ফিরছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে জেলেদের মাছ ধরার সময় কমে যাচ্ছে এবং বাড়ছে যাতায়াত ও উৎপাদন ব্যয়।
মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, ভোলা, বরিশাল ও হাতিয়াসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় ইলিশের মৌসুমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বরফের প্রয়োজন হয়। বরিশাল মৎস্যবন্দরেই প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৪ হাজার পাট বরফের প্রয়োজন হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় ঘাটগুলোতে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের একটি বরফ কারখানায় আগে দৈনিক প্রায় ২০০ টন উৎপাদনক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ টনে। একইভাবে উপকূলীয় বিভিন্ন কারখানাতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
মহানগর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয় হোসেন বলেন, “ইলিশের মৌসুমে বরফের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী বরফ উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে ব্যবসায়ীদের দূরদূরান্ত থেকে বরফ সংগ্রহ করতে হচ্ছে।”
মৎস্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বরফের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে মাছের বাজারদরেও। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন উপকূলের ছোট ও মাঝারি জেলেরা।
বরিশালের এক জেলে মো. হযরত আলী বলেন, “বরফ উৎপাদনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই-তিন ঘণ্টা থাকে না। এভাবে বরফ কারখানা কীভাবে স্বাভাবিকভাবে চলবে? বরফ না পেলে সাগরে বেশি সময় থাকা সম্ভব হয় না।”
জেলেরা জানান, মাছ ধরার পর দ্রুত বরফ দিয়ে সংরক্ষণ করা না গেলে ইলিশের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রয়োজনের তুলনায় কম বরফ নিয়ে সাগরে গেলে মাছ ধরার পরিমাণও কমিয়ে দিতে হয়। এতে একদিকে জেলেদের আয় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনের ব্যয়।
মৎস্য ব্যবসায়ীদের দাবি, ইলিশের মৌসুম সামনে রেখে বরফ উৎপাদনকারী কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উপকূলীয় মৎস্যবন্দরগুলোতে পর্যাপ্ত বরফ সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা বাড়ানো জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত বরফ সংকটের সমাধান করা না গেলে ইলিশের ভরা মৌসুমে এর প্রভাব পড়বে জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভোক্তা—সব পর্যায়েই।
মতামত