ডিজিটাল যুগে মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো মনোযোগ। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনবরত নোটিফিকেশন, রিলস, শর্ট ভিডিও এবং অ্যালগরিদম-নির্ভর কনটেন্টের কারণে প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে সেই মনোযোগ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল আসক্তি দিন দিন বাড়ছে, যা তাদের পড়াশোনা, কর্মদক্ষতা এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষা বর্ষের আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থী ইফতেখার নাহিম তৈরি করেছেন সেল্ফগার্ড নামের একটি ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং অ্যাপ। অ্যাপটির নির্মাতার দাবি, এটি শুধু একটি অ্যাপ-ব্লকার নয়; বরং ব্যবহারকারীদের সময় ব্যবস্থাপনা, মনোযোগ বৃদ্ধি এবং সুস্থ ডিজিটাল জীবনযাপন নিশ্চিত করার একটি কার্যকর উদ্যোগ।
সেল্ফগার্ড-এর প্রতিষ্ঠাতা জানান, ব্যক্তিগতভাবে কাজ কিংবা কোডিংয়ের সময় বারবার ফোনের নোটিফিকেশন এসে মনোযোগ নষ্ট হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই অ্যাপটি তৈরির চিন্তা শুরু হয়। পরে তিনি উপলব্ধি করেন, এই সমস্যা কেবল তার একার নয়; বরং বর্তমান প্রজন্মের অসংখ্য মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা।
বাজারে বিভিন্ন ধরনের ফোকাস ও স্ক্রিনটাইম নিয়ন্ত্রণকারী অ্যাপ থাকলেও সেগুলোর অনেকগুলোতেই ব্যবহারকারীরা সহজে নিয়ম ভাঙতে পারেন। সেল্ফগার্ডের ক্ষেত্রে 'নো বাইপাস সিকিউরিটির' ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর নির্ধারিত সীমাবদ্ধতা কার্যকরভাবে বজায় রাখার চেষ্টা করে। নির্মাতার মতে, এটি ব্যবহারকারীদের আচরণগত ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়তা করবে।
অ্যাপটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রাইভেসি ফার্স্ট নীতি। নির্মাতা জানান, বর্তমানে অনেক অ্যাপ বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারকারী তথ্য সংগ্রহ করে ক্লাউড সার্ভারে সংরক্ষণ করে। তবে সেল্ফগার্ড এর ক্ষেত্রে ব্লক ফিল্টারিংসহ প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম ব্যবহারকারীর নিজস্ব ডিভাইসেই সম্পন্ন হয়।
তার দাবি অনুযায়ী, অ্যাপটির অ্যাক্সেসিবিলিটি সার্ভিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য শুধুমাত্র ডিভাইসের ভেতরে রিয়েল-টাইমে প্রক্রিয়াজাত হয় এবং কোনো রিমোট সার্ভারে সংরক্ষণ বা প্রেরণ করা হয় না। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীর ব্লক রুলস, কী-ওয়ার্ড, ফোকাস সেশন, স্ট্রিক এবং অন্যান্য তথ্য এসকিউএল সিফার এনক্রিপশনের মাধ্যমে সুরক্ষিত রাখা হয়। এছাড়া অ্যাপটিতে কোনো থার্ড-পার্টি বিজ্ঞাপন বা ট্র্যাকিং অ্যানালিটিক্স সংযুক্ত করা হয়নি।
ইফতেখার নাহিম জানান, তিনি অ্যাপটির সাফল্য কেবল ডাউনলোড বা ইনস্টলের সংখ্যায় মূল্যায়ন করে না। বরং ব্যবহারকারীর স্ক্রিনটাইম কমানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করাকেই প্রকৃত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গুগল প্লে স্টোরেও অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। একাধিক রিভিউতে ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, অ্যাপটি মনোযোগ ধরে রাখতে এবং অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি এড়াতে সাহায্য করছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের ২০তম ব্যাচের একজন শিক্ষার্থীও অ্যাপটিকে উপকারী বলে মন্তব্য করেছেন। একজন ব্যবহারকারী উল্লেখ করেন, তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট থেকে দূরে থেকে মনোযোগ ধরে রাখতে বিশেষভাবে কার্যকর। এ ছাড়া আরেকজন ব্যবহারকারী জানান, ডিভাইসে অনাকাঙ্ক্ষিত কনটেন্ট ব্লক করতেও অ্যাপটি কার্যকরভাবে কাজ করছে। অ্যাপটির নির্মাতা প্রতিটি রিভিউয়ের জবাবে ব্যবহারকারীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং প্রতিক্রিয়াগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন। আগ্রহীরা চাইলে গুগল প্লে স্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করতে পারবেন: https://play.google.com/store/
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সেল্ফগার্ডের প্রতিষ্ঠাতা ইফতেখার নাহিম বলেন, 'নিজের গোপনীয়তা শতভাগ সুরক্ষিত রেখে অ্যালগরিদমের হাত থেকে নিজের সময় ও স্বপ্নের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যই সেল্ফগার্ড।'
তিনি আরও জানান, আগামী পাঁচ বছরে সেল্ফগার্ড-কে একটি সাধারণ মোবাইল অ্যাপের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ের 'ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং মুভমেন্ট' এ পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
মতামত