আফ্রিকার ৬টি দেশে যৌনাঙ্গ চুরি হওয়ার অলৌকিক ও ভিত্তিহীন গুজবকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এই গুজবের জেরে সৃষ্ট গণপিটুনি ও সহিংসতায় ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বিশ্লেষণ করে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ‘বিবিসি গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইউনিট’।
গুজবে দাবি করা হয়—অপরিচিত কেউ কোনো পুরুষের পিঠে বা শরীরে আলতো স্পর্শ বা টোকা দিলেই তাঁর যৌনাঙ্গ অদৃশ্য বা সংকুচিত হয়ে যায়। প্রাচীন কুসংস্কার, জাদুটোনায় বিশ্বাস এবং আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভিউ ও এনগেজমেন্ট পাওয়ার আশায় এই আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। উত্তেজিত জনতা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক করে শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং কথিত ‘চুরি হওয়া’ যৌনাঙ্গ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে গণপিটুনি দেয়।
মোজাম্বিক (নিহত ৫৫): গুজবের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোজাম্বিকে। দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, মাত্র ছয় সপ্তাহের ব্যবধানে এক পুলিশ কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী ও সরকারি কর্মচারীসহ অন্তত ৫৫ জন নিহত হয়েছেন। মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল চাপো এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, এর পেছনে কোনো চিকিৎসাগত বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
দেশটির সীমান্ত শহর তুন্দুমায় মেকানিক বনিফাস এমগালা ও তাঁর বন্ধু এক রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে উত্তেজিত জনতার আক্রমণের শিকার হন। হামলায় এমগালার দাঁত ভেঙে যায় ও তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাঁর বন্ধু মারা যান। একই এলাকায় অন্য এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করার ভিডিও টিকটক ও ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
কেনিয়ার উপকূলীয় কাউন্টিগুলোতে একই গুজবে অন্তত ৫ জন নিহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এক বাবা-ছেলেসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড দিয়েছে। অন্যদিকে মালাউইতে উসকানিমূলক গুজবের জেরে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সরকারি ও স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের এই অলৌকিক আতঙ্কের পেছনে বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যার নাম ‘কোরো সিনড্রোম’ (Koro Syndrome)। এটি একটি বিরল মানসিক অবস্থা বা মনস্তাত্ত্বিক ভ্রান্তি, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি তীব্র মানসিক উদ্বেগের কারণে ভুল বিশ্বাস করেন যে তাঁর যৌনাঙ্গ শরীরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে বা ছোট হয়ে যাচ্ছে।
নৃতত্ত্ববিদ ও গবেষকদের মতে, স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে এ ধরনের স্পর্শকাতর গুজব দ্রুত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, যা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে চরম বেগ পেতে হচ্ছে।
মতামত